মেধাবীদের লালন করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের

বস্তুত প্রতিবছরই জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় দরিদ্র পরিবারের মেধাবী সন্তানদের লেখাপড়ার ভবিষ্যৎ শঙ্কা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়। এইসব মেধাবীরা এসএসসি, এইচএসসি বা জেএসসি পরীক্ষায় খুব ভাল রেজাল্ট করে। কিন্তু অর্থাভাবে উ”্চ শিক্ষার সুযোগ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কায় ভোগে। সংবাদ দেখে কখনও-সখনও কারও কারও ভাগ্যে কিছু বদান্যতা জোটে। দয়ার্দ্র ব্যক্তিবিশেষ বা প্রতিষ্ঠান বিশেষ এদের সহায়তায় এগিয়ে আসে। যে সমাজে অস্বচ্ছল পরিবারের মেধাবী সন্তানদের মেধা বিকাশের অবারিত সুযোগ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে সেই সমাজে এমন দাক্ষিণ্য প্রশংসাযোগ্যই বটে। জনসমক্ষে দারিদ্রতার কাহিনী উন্মোচন করে এমন দাক্ষিণ্য প্রাপ্তদের চাইতে অন্তরালে থেকে যায় আরও অনেক মেধাবীর কষ্টের কথা। বাংলাদেশের মানুুষের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার যে চিত্র, সেখানে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই প্রান্তিক পরিবারের সদস্য। বাড়ির কাছের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এরা লেখাপড়া করে। ভাল ফলাফল করার প্রচলিত অধিক অর্থব্যয়ী উপকরণ ব্যতীত এদের একটি বড় অংশ ভাল ফলাফলও করে। কিন্তু যখনই শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য এলাকার বাইরে যেতে হয়, প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়, তখনই এই শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। এরা হারিযে যায়। এই হারিয়ে যাওয়া মেধাবীদের মিছিল কতটা বড় তা নিয়ে কোন গবেষণা হয়নি কখনও। হলে দেখা যেত সংখ্যাটা নেহায়েৎ কম নয়।
রাষ্ট্রের শিক্ষা দর্শনে মেধাবীদের মেধা লালনের পরিষ্কার দিক নির্দেশনরা থাকাটা অতীব প্রয়োজনীয় বলে আমরা মনে করি। দয়া-সাহায্য নিয়ে কেন লেখাপড়া করতে হবে কাউকে? উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে যে জ্ঞান অর্জিত হবে তা তো ব্যয়িত হবে রাষ্ট্রেরই কল্যাণে। তাহলে রাষ্ট্রেরই তো দায়িত্ব মেধাবীদের মেধা বিকাশের সর্বোচ্চ সুযোগ নিশ্চিত করে দেয়া। সেটি নেই, গণমাধ্যম ব্যতিবস্ত হয়ে উঠে দারিদ্রতার কাহিনি প্রকাশের জন্য। মেধাবীদের এমন হীন মানসিক অবস্থানে রেখে দেয়াটা অন্যায্য, ভীষণ রকমের অনভিপ্রেত। এই অন্যায্যতার অবসান হবে কবে?
এর আগেও স্বল্প পরিসরে আমরা রাষ্ট্রের শিক্ষা নীতি নিয়ে অল্প বিস্তর মতামত প্রকাশ করেছিলাম। সেখানে একটিই আর্তি ফুটে উঠেছিল, শিক্ষাকে গণমুখী চরিত্রে ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্তত টাকার জন্য সত্যিকার মেধাবীরা ঝরে পড়বে না সেই অবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
আজ যখন এক দুইজন মেধাবীকে কোনো কোনো বিত্তবান ব্যক্তি যৎসামান্য সহায়তা দিয়ে আত্মশ্লাঘায় ভোগেন তখন তার অর্থ উপার্জনের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ কমে যায়। আমরা জানি আমাদের বিত্তবানদের বড় অংশই লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন। এখন এর ছিটেফোটা দান খয়রাৎ করে এরা মহৎ ব্যক্তিরূপে পরিচিত হচ্ছেন, লুণ্ঠন প্রক্রিয়াকে মুছে দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এই ধরনের অবস্থা থেকে মুক্ত হওয়ার আকাক্সক্ষা সকলের। মহত্ত্ব মানুষের সর্বোত্তম মানবিক গুণ। মহত্ত্ব সর্বাবস্থায় নির্মল ও স্বচ্ছ। বর্তমান আগ্রাসী অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই ধরনের মহত্ত্ব দেখানো খুবই কঠিন। বরং দুর্বৃত্তদের নানা কায়দা কানুন করে মহৎ তকমা ধারণ করাটা সহজ। শিক্ষার্থীদের সমাজের ভিতরকার এই অন্যায্যতা ও বৈষম্যের চিত্রটা বুঝানো উচিৎ। কারণ শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই এগিয়ে যাবে আমাদের দেশ। তাদের ভাল-মন্দ বুঝতে দিতে হবে। তবেই না এক আলোকিত দেশ নির্মাণের নিঃস্বার্থ সৈনিক হবে তারা।
আমরা আবারও পুনরুক্তি করছি যে, মেধাবীদের লালন করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র কীভাবে এই দায়িত্ব পালনে কর্তব্যপরায়ণ হয়ে উঠে সেটি নিশ্চিত করাই সকলের কর্তব্য। আসুন আমরা একটি সুন্দর স্বদেশ নির্মাণের চিন্তা শুরু করার মধ্য দিয়ে মেধাবীদের লালনের পরিবেশ নিশ্চিত করি।