মেলায় লটারি-জুয়া, এদের সাহসের উৎস কোথায়?

খোদ জেলা শহরে সকল ক্ষতাধরদের নাকের ডগায় এবং চোখের সামনে তথাকথিত পণ্য মেলার নামে আয়োজিত লটারি বাণিজ্য যেখানে আটকানো যায়নি সেখানে জগন্নাথপুরে ওই ধরনের আয়োজন থামানোর আকাক্সক্ষা নিতান্তই কল্পনাবিলাস বৈকি। তবে ‘ডাকার মত ডাকলে ভবে তারে পাওয়া যায়’ এর মত আকাক্সক্ষার তীব্রতা থাকলে সেটি অর্জন করা যায় না এমন কথাও হাস্যকরই বটে। জগন্নাথপুর উপজেলা ও থানা প্রশাসন তিন তিনবার বন্ধ করে দিয়েছেন ওই উপজেলা সদরের স্বরূপচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক মাস ব্যাপী অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পণ্য মেলায় আয়োজিত লটারি-জুয়া। কিন্তু প্রতিবারই বন্ধের পর পুনরায় সগৌরবে ওই জুয়ার পুনরুত্থান ঘটেছে। লটারি জুয়া কী? জেলাবাসী হিসাবে আমরা সেটি জানি। টিকেট বিক্রি করা হয়, বিক্রীত টিকেটের বিপরীতে কয়েকটি পুরস্কার খয়রাত করা হয়। ওই পুরস্কারের লোভে পঙ্গপালের মত হুমড়ি খেয়ে টিকেট কিনে লোভাতুর কিছু নি¤œবিত্ত ও স্বল্প মধ্যবিত্ত মানুষ। এরা নিজেরা উপার্জন করে কোন মোটর সাইকেলের মালিক বনতে পারবে না জানে। তাই ভাগ্যের উপর ভরসা করে কিনে নেয় ১০ বা ২০ টাকার টিকেট। একটি নয়, একসাথে অনেকগুলো, ট্যাঁকে যত টাকা আছে উজাড় করে কিনে এই টিকেট। লোভাতুর এই মানুষগুলোর লোভকে উসকে দিতে জুয়ার পা-ারা জৌলুসপূর্ণ প্রচার-প্রচারণা চালায়। ক্যাবল নেটওয়ার্কে দেখায় লটারি শো। বিজয়ী মোটরসাইকেল চালকের সহাস্য চেহারাও দেখায়। এই দেখে অন্যরা ভাবতে শুরু করে, আরে! কালকে আমিও তো মাত করে দিতে পারি কেল্লা। লোভের এই আগুন উসকে দিয়ে কাড়ি কাড়ি টাকা কেড়ে নেয় জুয়ার পা-ারা। দশ লাখের টিকেট বেচলে হয়তো পুরস্কার দেয় ১ লাখ টাকার কোন মানহীন সামগ্রী। লাভের ৯ লাখ বিভিন্ন বখরায় ভাগ হয়। গুন্ডা থেকে শুরু করে নেতা এবং কর্তা কার পকেটে যায় না ওই টাকা? যায় বলেই তো আটকায় না তাদের খেলা। একবার বন্ধ হলেও আরেকবার চালানো যায়। সুতরাং ওই যে বললাম, যারা বন্ধ করছেন তাদের ইচ্ছার জোর বুঝতে হবে আমাদের। আদতেই কি তারা চাইছেন এই সর্বনাশের মেলা বন্ধ হোক? নাকি পাবলিকের চোখে ধুলো দিতে বন্ধ বন্ধ খেলার আয়োজন?
মেলা নামক একটি ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গকে কলুষিত করছে কতিপয় বেনিয়া দুর্বৃত্ত। বাঙালি মনে মেলার নামে যে নাচন শুরু হয়, সেই প্রাণের মেলা আজ আর নেই। যেখানেই মেলা সেখানেই জুয়া, সেখানেই নেশা, সেখানেই অশ্লীলতা। মেলাকে বিনাশকারী এই সাংস্কৃতিক দুর্বৃত্তদের নির্মূল করার মত যথেষ্ট শক্তিশালী উদ্যোগ নেই কোথাও। সুনামগঞ্জ জেলা শহরে পণ্যমেলার নামে জুয়ার কেমন পসার বসেছিল গণমাধ্যমের বদৌলতে তা কারও অজানা ছিল না। তারপরেও আয়োজকরা জগন্নাথপুরে এমন মেলার প্রশাসনিক অনুমোদন আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছে। এই ফাঁকে বলে রাখা ভাল, গতবার জেলা সদরে আয়োজিত মেলার জুয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা থাকার পরও এবার তারা আশ্চর্য কৌশলে পুনরায় একই ধরনের মেলার আয়োজন করতে সক্ষম হয় । কত ক্ষমতাধর তারা। ক্ষমতার এই দম্ভকে চূর্ণ করতে না পারলে মেলাকে কলুষমুক্ত করাও কিছুতেই সম্ভব নয়।
বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যসমৃদ্ধ মেলাকে প্রাণময় করতে হলে এবং মেলার মাধ্যমে পণ্যের প্রসার ঘটাতে চাইলে অবশ্যই মূল্য উদ্দেশ্যকেই প্রাধান্য দিতে হবে আয়োজকদের। মূল উদ্দেশ্যকে পাশ কাটিয়ে জুয়া, সার্কাস, অশ্লীল গান-বাজনা ইত্যাদিকে প্রাধান্য দিলে প্রাণের মেলা মরণ খেলায়ই পরিণত হবে। অনুমোদনকারী প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে এই বিষয়টি বুঝতে হবে হৃদয় দিয়ে।