মোল্লাপাড়ায় সরকারি চাল জব্দ- পরে ফেরৎ

স্টাফ রিপোর্টার
সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের আব্দুল্লাপুর গ্রামে ৭৮ বস্তা সরকারি ও ভিজিএফের চাল ও ১৩০ টি খালি বস্তা উদ্ধার করা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বুধবার গভীর রাতে গ্রামের লোকজন এসব চালের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অবগত করলে পুলিশ গ্রামের অরুণ দাসের বাড়ি থেকে চাল ও বস্তা জব্দ করে এবং রাতেই অরুণ দাসকে থানায় ডাকা হয়।
পরে বৃহস্পতিবার সকালে চালগুলো পুলিশ বিভাগের কাছ থেকে ক্রয় করেছে এমন দাবির প্রেক্ষিতে অরুণ দাসকে
চাল ফেরত দেয়া হয়। এদিকে স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ আব্দুল্লাপুর গ্রামের অরুণ দাসের কাছ থেকে উদ্ধার করা চালগুলো কালবাজারীর। সঠিকভাবে তদন্ত করলে প্রকৃত রহস্য বের হয়ে আসবে।
মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের সরকারি ওএমএস ডিলার কে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযুক্ত অরুণ দাস পুলিশকে জানিয়েছেন তিনি ওএমএস ডিলার, তার লাইসেন্স আছে। খাদ্য বিভাগও পুলিশকে বলেছেন, অরুণ দাস সরকারি ডিলার।
কিন্তু স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল হক জানিয়েছেন অরুণ দাস ডিলার নয়। খাদ্য পরিদর্শক প্রথমে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের কাছে এই ইউনিয়নের ডিলারের নাম শামীম জানালেও, পরে আবার বলেন অরুণ দাস ডিলারের প্রতিনিধি।
জানা যায়, বুধবার রাতে মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দরিয়াবাজ গ্রামের আরশ আলী বাজার থেকে আব্দুল্লাপুর গ্রাম দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। এসময় তিনি দেখতে পান অরুণ দাস তার ঘরে সরকারি বস্তা থেকে সাধারণ বস্তায় চাল ভরছেন। বিষয়টি তিনি গ্রামের অমরচাঁদ দাস কটন ও রিন্টু দাসকে অবগত করেন। গ্রামের বিদ্যাধর দাসও ঘটনা দেখেন। পরে ঘটনাটি উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অবগত করা হয়। খবর পেয়ে রাত প্রায় ২ টায় অরুণ দাসের বাড়ি থেকে পুলিশ ৭৮ বস্তা চাল ও সরকারি ১৩০টি খালি বস্তা জব্দ করে। এসময় অরুণ দাস চালের উপযুক্ত কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেন নি। পুলিশ ৭৮ বস্তা চাল জব্দ করে স্থানীয় ইউপি সদস্য জহুর আলীর জিম্মায় দেন ও অরুণ দাসকে থানায় ডাকা হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সদর উপজেলা খাদ্য কার্যালয়ের পরিদর্শক রকিবুল হাসান ও সদর থানার ওসি (অপারেশন) আতিকুল ইসলাম। এসময় অভিযুক্ত অরুণ দাস চালগুলো পুলিশ লাইন থেকে ক্রয় করেছে জানিয়ে কাগজ দেখালে জব্দ করা চাল অরুণ দাসকে ফেরত দেয়া হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশের জব্দ করা চালগুলো কালোবাজারীর। এসব চাল ভিজিএফ, ভিজিডি বা ওএমএসের চাল হতে পারে। কারণ এলাকার লিটন দাস বুধবার রাত ও বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত স্থানীয় অনেককে অনুরোধ করেছেন ঘটনা থেকে তাকে রক্ষা করার জন্য।
আব্দুল্লাপুর গ্রামের বাসিন্দা অমর চাঁদ দাস টকন ও রিন্টু দাস বলেন,‘ দরিয়াবাজ গ্রামের আরশ আলী রাতে আমাদের জানিয়েছেন অরুণ তার ঘরে সরকারি বস্তা থেকে অন্য বস্তায় চাল ভরছে। আমরা বিষয়টি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেছি। এরপর উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অবগত করলে তিনি পুলিশ পাঠিয়েছেন। পুলিশ আসলে অরুণ দাস চালের কোন কাগজপত্র রাতে দেখাতে পারেনি। অরুণ দাস বলেছিলেন বস্তা বাজারে আছে, কিন্তু পুলিশ তার ঘর থেকেই বস্তা উদ্ধার করে। ’
অমরচাঁদ দাস কটন বলেন,‘ চাল জব্দের পর ইউনিয়নের সাব ডিলার লিটন দাস বুধরাত রাতেই এসে আমাকে ও এলাকার জহুর আলী মেম্বার সাবকে অনুরোধ করে বলে তাকে বাঁচানোর জন্য। বৃহস্পতিবার সকালেও এসে অনেক মানুষের সামনে অনুরোধ করে বলেছে তাকে এই ঘটনা থেকে বাঁচানোর জন্য। নিজের সম্পৃক্তি না থাকলে কেন এসে অনুরোধ করবে। পরে খাদ্য বিভাগ ও পুলিশ এসে বলল, তারা নাকি তদন্ত করে দেখছে চালগুলো ৩ তারিখ পুলিশের কাছ থেকে কিনেছে। ’
ইউনিয়নের জলালপুর গ্রামের বাসিন্দা আজাদ মিয়া বলেন,‘ আমাদের ধারণা আব্দুল্লাপুর গ্রামে আটক করা চালগুলো ভিজিএফের। চালগুলো কালোবাজারীতে বিক্রি করা হয়েছিল। না হলে এত রাতে কেন চালের বস্তা পরিবর্তন করা হয়েছিল। সরকারি সিল মারা বস্তা থেকে সাধারণ বস্তায় চাল ভরা হয়েছিল বলে গ্রামের লোকজন জানিয়েছেন। চালসহ যাকে আটক করা হয়েছিল রহস্যজনক কারণে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত করা হোক।’
খাগুড়া গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মনির উদ্দিন বলেন,‘ সরকারি ত্রাণের চাল নিয়ে চালবাজী বন্ধ করা হোক। গরিব মানুষের চাল নিয়ে ব্যবসা করবে এটা মানা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে একটা সিন্ডিকেট সরকারি চাল নিয়ে এসব কাজ করছে।’
তবে আব্দুল্লাপুর গ্রামের অভিযুক্ত অরুণ দাস বলেন, ‘আমি সহকারি ডিলার ছিলাম। চৈত মাসে ডিলারী বাদ দিয়েছি। পুলিশ লাইন থেকে ৪ টন চাল কিনেছি। পুলিশ থানায় ডেকেছিল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখানোর জন্য। পুলিশ ও ফুড অফিসারকে আমি চালের কাগজ দেখিয়েছি। যেসব চাল সরকারি বলা হয়েছিল তা আমার ক্রয় করা ও বস্তাগুলো সেই চালেরই। হয়রানী করার জন্য সরকারি চাল বলে প্রচার করা হয়েছিল। পূর্ব বিরোধের জের ধরে আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করা হয়েছিল। ’
ইছাগড়ি গ্রামের লিটন দাস বলেন,‘ আমি ডিলার বা সাব ডিলার নই। অরুণ দাস আমার মামা। তাই খবর পেয়ে গিয়েছিলাম ও তাদেরকে অনুরোধ করেছিলাম বিষয়টি গ্রামেই শেষ করে দিতে। তিনি ডিলার বা সাব ডিলার নয়। ডিলারের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি কাজ করতেন। মামার বিরোধীপক্ষ হয়রানী করার জন্য সরকারি চাল বলে পুলিশ ও ইউএনওকে জানিয়েছিল। মামা পুলিশকে জানিয়েছেন, তিনি পুলিশের কাছ থেকে চাল কিনেছেন। রাতে চালের কাগজ দেখাতে পারেননি, সকালে কাগজ দেখিয়েছেন।’
মোল্লাপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল হক বলেন,‘আমাদের ভিজিএফ-ভিজিডির চাল অনেক আগেই উপকারভোগীদের কাছে বিতরণ শেষ করেছি। আমাদের কোন চাল বিতরণের বাকী নেই। চাল জব্দের বিষয়টি আমার জানা নেই।’
সদর থানার ওসি (অপারেশন) আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘খবর পেয়ে অরুণ দাসের কাছ থেকে চাল জব্দ করে একজন ইউপি সদস্যের কাছে জিম্মা দেয়া হয়েছিল। তার বাড়ি থেকে সরকারি চালের খালি বস্তা উদ্ধার করা হয়। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করার জন্য তাকে থানায় ডাকা হয়েছিল। তিনি দাবি করেছেন, চালগুলো পুলিশ লাইন থেকে কিনেছেন। পুলিশ লাইনের ম্যাচ ম্যানেজারও এসে জানিয়েছেন অরুণ দাসের কাছে তিনি চাল বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি খাদ্য বিভাগের উপস্থিতিতে অরুণ দাস বলেছেন, তিনি ইউনিয়নের ওএমএস ডিলার এবং চাল কেনা-বেচা করেন। ক্রেতা-বিক্রেতার তথ্যে মিল থাকায় চালগুলো তাকে ফেরত দেয়া হয়।’
সদর উপজেলা খাদ্য কার্যালয়ের পরিদর্শক রকিবুল হাসান প্রথমে বলেন, ‘ মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের ডিলার শামীম, সাব ডিলার নেই। গত ১ তারিখ থেকে ওএমএস বন্ধ হয়েছে। অরুণ দাস বলেছেন এসব চাল পুলিশের কাছ থেকে ক্রয় করেছেন, পুলিশও জানিয়েছেন তাঁরা অরুণ দাসের কাছে চাল বিক্রি করেছেন।’
সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রদীপ সিংহ বলেন,‘ প্রাথমিক তদন্তে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা জানিয়েছেন চালগুলো অরুণ দাস পুলিশের কাছ থেকে কিনেছিল। তাই পুলিশ তাকে ছেড়ে দিয়েছে এবং চালগুলো তাকে ফেরত দেয়া হয়েছে। তবে কেউ লিখিত অভিযোগ করলে তদন্ত সাপেক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’



আরো খবর