মৎস্যসম্পদের গৌরব কি অতীত হতে চলেছে?

বিশ্বম্ভরপুরে ৫০ হাজার টাকা মূল্যমানের কারেন্ট জাল পুড়ানো নিয়ে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে শেষ পৃষ্ঠায় ছোট্ট একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয় মৎস্য বিভাগ এই কারেন্ট জাল পুড়ানোর কর্মযজ্ঞটি সম্পাদন করেছেন। বলাবাহুল্য বিভিন্ন উপজেলায় কালেভদ্রে এরকম কারেন্ট জাল পুড়ানোর খবর সংবাদমাধ্যমসূত্রে আমরা জানতে পারি। আর জানতে পারি মৎস্য অধিদপ্তরের স্থানীয় অফিসগুলো হাত পা গুটিয়ে বসে নেই, তারা মাঝে মধ্যে এরকম কিছু কাজকর্ম করে নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ দিয়ে থাকেন। তবে মোদ্দা কথা হলো এমন কারেন্ট জালের অগ্নিযজ্ঞ সম্পাদনের পরও কোনও জলাশয়ে খুনা বা কারেন্ট জালের ব্যবহার কমে গেছে, এমন কথা বোধ করি কেউই বলবেন না। তাহলে এই কারেন্ট জাল পুড়ানোর মাজেজটা আসলে কী? আমরা যতটুকু বুঝতে পারি সেটি হল, মাঝে মধ্যে নিজেদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কিংবা দাপ্তরিক অস্তিত্ব জাহিরের জন্যই এরকম কারেন্ট জাল পুড়ানোর ঘটনা ঘটানো হয়। বাস্তবিক অর্থে একটি কর্মসূচী হিসাবে বিল জলাশয় থেকে এরকম সবংশে মৎস্য নিধনকারী জাল একেবারে বিলুপ্তির জন্য মূলত কোন কর্মযজ্ঞই নেই আমাদের দেশে। যদি থাকত তাহলে কোন মৎস্যজীবীর সাহস হত না হাওর জলাশয়ে এরকম জাল দিয়ে পোনা মাছ সমেত মাছের বংশ ধ্বংস করে দেয়ার। তাই বিশ্বম্ভরপুরে কারেন্ট জাল পুড়ানোর খবরটিকে আমরা সেই অর্থে বাহবা দিতে পারছি না।
অভিযোগ রয়েছে, যেসব মৎস্যজীবী হাওরে খুনা বা কারেন্ট জাল অবাধে ব্যবহার করেন তারা কোন না কোন মহলের পরোক্ষ প্রশ্রয় নিয়েই এরকমটি করে থাকেন। আইন না মানার জন্য আইনে যেসব কঠিন সাজার ব্যবস্থা রয়েছে সেসব প্রযুক্ত না হওয়ার কারণেই আমাদের মৎস্যসমৃদ্ধ হাওরের জেলাটি আজ মৎস্যশূন্য জেলায় পরিণত হতে চলেছে। শুধুই কি খুনা বা কারেন্ট জাল? না, আরও আছে। বিল জলাশয় শুকিয়ে মাছ ধরা, শুকানোর পর রাসায়নিক ব্যবহার করে পাঁকের ভিতর থেকে বাইম, শোল, শিং, কৈ প্রভৃতি মাছ তোলে আনার মত নির্মমতার খবরও আমাদের জানা। এসবই ঘটছে দেশে বহু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থাকার পরও। তাই বলি, শুধুমাত্র দাপ্তরিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণের তাগিদ নয়, প্রতিবেদনে নিজেদের কর্মতৎপরতা প্রদর্শনের জন্য নয়, একেবারে মনের গহীন থেকে প্রচণ্ড দেশপ্রেম আর দায়িত্ববোধ নিয়ে যদি প্রতিষ্ঠানগুলো মাছ রক্ষায় এগিয়ে আসত, তাহলে দুই বছরের মধ্যে জেলায় মাছের সুদিন ফিরে আসত, কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু কবে আমাদের মধ্যে জাগ্রত হবে সেই বোধ?
মাছের দেশে মাছ নেই, এমন নির্মম বাস্তবতা আমাদের চোখের সামনে ভাসছে। এই মাছ চাষের মাছ নয়। চাষের মাছ হয়ত থাকবে, কিন্তু এই চাষের মাছ তো বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের সাথে মানানসই ছিল না কখনও, আসলে মিঠা পানির বহু বিচিত্র প্রজাতির নানা স্বাদের দেশীয় মাছগুলো একসময় এদেশের জলাশয় থেকে হারিয়ে যাবে। প্রজন্মকে আমরা মাছের গৌরবময় গল্প বলে হয়ত অতীতের স্বর্ণালী দিনের কথা জানাব। খুনা জাল যে খুনা চরিত্র নিয়ে হাজির হয়েছে, নিশ্চিত সেরকম এক ভবিষ্যৎ পানেই ছুটে চলেছি আমরা। অথচ এরকম নির্মম বাস্তবতার সন্মুখীন হওয়ার কোন কথা ছিল না আমাদের। দেশীয় মাছ সংরক্ষণের জন্য সামান্য কিছু নিয়ম কানুন মেনে চললেই আর বিদ্যমান আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ ঘটালেই আমরা ফিরিয়ে আনতে পারি অতীতের স্বর্ণালী মৎস্য ইতিহাসের গৌরবগাঁথা।