যন্ত্রণা জর্জর মানবাত্মাকে রক্ষায় প্রয়োজন মানবিকতার সচেতন উদ্ভাসন

সাধারণ ছুটি প্রত্যাহারের পর রবিবার অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অভ্যাস দেখা যায়নি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা দূরে থাক, রাস্তায় চলাচলকারী বিপুল সংখ্যক লোককে মাস্ক ছাড়াই অবাধে চলাফেরা করতে দেখা গেছে। সরকার মাস্ক ছাড়া চলাফেরা করলে ৬ মাসের জেল ও ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান করলেও কেউই এই শাস্তির তোয়াক্কা করছেন না। স্বল্পপাল্লার যানবাহন, যেমন-সিএনজি, অটোরিক্সা, লেগুনা ইত্যাদিকে যথেচ্ছভাবে যাত্রী পরিবহন করতে দেখা গেছে। সবকিছু মিলিয়ে দেখলে বুঝার কোনো উপায় থাকে না যে, দেশে এবং সারা বিশ্বে করোনার মতো এক ভয়ংকর মহামারী প্রতিনিয়ত অজস্র্র মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। সরকার অর্থনৈতিক কর্মকা-ের যে যুক্তি সামনে এনে সবকিছু স্বাভাবিক করে দিয়েছেন, প্রথম দিনের অবস্থায় সেই স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্তটি প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠল। আগামীকাল বা তার পরদিন অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে এমন আশা কোনো বোকার মুখ থেকেও উচ্চারিত হবে না। সচেতনতার যে প্রচ- অভাব আমাদের জনসাধারণ দেখিয়ে চলেছেন তাতে পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে নিয়ম না মানা জাতি হিসাবে আমাদের নাম পয়লা সারিতেই থাকবে। অবশ্য এজন্য কম খেসারত দিতে হবে না এই জাতিকে। আমরা হয়তো অচিরেই নিজেদের পরিচিত বলয়ের মধ্যে বহু কোভিড আক্রান্ত ও মৃত্যু প্রত্যক্ষ করব। সেদিন এই অসচেতন, বেপরোয়া, অপরিনামদর্শী জাতি কোনো সরকারি নির্দেশনা ছাড়াই ভয়-আতংকে ঘর থেকে বেরোবে না। সেদিন বিশাল ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে থাকবার কোন উপায়ই আর আমাদের হাতে থাকবে না। নিরবে প্রিয় ও পরিচিতজনদের খারাপ অবস্থা দেখতে দেখতে নিজেই কখন সেই পরিণতিতে পতিত হবে কেউ আন্দাজ করতে পারবে না। অর্থনৈতিক কর্মকা- বিনা নোটিশেই তখন বন্ধ হয়ে যাবে। জীবন ও জীবিকাকে এমন অন্ধকূপে নিক্ষেপ করার আগে এখনও যদি সকলেই একটু যুক্তিনিষ্ঠ হয়ে উঠতে পারেন তাহলে হয়তো ক্ষতি কমানোর কিছু উপায় করতে পারেন। কেউ কি যুক্তি ও বাস্তবতার উপর একটু বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করবেন?
অবস্থা দেখে মনে হতে পারে, আম পাবলিক করোনাকে ভয় পাচ্ছে না বা পাত্তা দিচ্ছে না। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই বুঝা যায়, কেউই আসলে বাহাদুরি দেখাচ্ছে না বরং যা করছে তাকে পাগলামি, বোকামি বা উন্মাদনা বলা যায়। মানুষ কতোটা ভয় পাচ্ছে বুঝা যায়, যাদের কোনো নিকটজন করোনা পজিটিভ বা উপসর্গ রয়েছে তাদের প্রতি চরম নিষ্ঠুর আচরণ থেকে। সংবাদমাধ্যমসূত্রে অনেক খবর পাওয়া যাচ্ছে যেখানে করোনাক্রান্ত মানুষটির পাশে যাচ্ছে না আদরের সন্তান বা প্রিয়তমা স্ত্রী। যন্ত্রণা জর্জর হয়ে অসহায়ভাবে মারা যাচ্ছে হতভাগ্য মানুষটি। মারা গেলে লাশের কাছেও যাচ্ছে না এরা। সরকারি উদ্যোগে স্বজনহীন একাকিত্বে কবরস্থ বা দাহ করা হচ্ছে এই লোকগুলোকে। এ থেকে মানুষের করোনার প্রতি কেবল চরম ভয় পাওয়ার দিকটিই উন্মোচিত হচ্ছে না বরং মানুষ কতোটা স্বার্থপর ও ব্যক্তিতান্ত্রিক তাও প্রকাশ হচ্ছে।
মানুষের ভিতর জমে থাকা দুর্গন্ধ ও জীবাণুযুক্ত এই পুঁজ পুরো মানব প্রজাতির জন্য অতিশয় লজ্জাজনক। আসুন সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মানুষের এই কুৎসিৎ চেহারার পরিবর্তে মানবিক আলোকময় চেহারার ব্যাপক উদ্ভাসন ঘটাই। নিজেকে রক্ষা করার সাথে পীড়িতদের পাশে মমতা ভরা হৃদয় নিয়ে দাঁড়াই এবং একটি মহাদুর্যোগ থেকে সম্মিলিতভাবে রক্ষা পাই।