যাচাই শুরু করেছে দুদক’র অনুসন্ধানকারী দল

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৩৩ কর্মচারী নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে দাবি করে এক নিয়োগ প্রার্থী দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদকে) আবেদন করেছেন। দুদক দরখাস্তকারী’র আবেদনের অনুসন্ধান শুরু করেছে। গত ১২ দিন হয় দুদকের সিলেট জেলা কার্যালয়ের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা (টিম লিডার) মোস্তফা বোরহান উদ্দিন আহম্মদ এই অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছেন। গত ২৪ অক্টোবর দুদকে আবেদনকারী নিয়োগ প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনকে সিলেট কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে তার আবেদনে উল্লেখিত নানা বিষয় যাচাই করেছেন এই কর্মকর্তা। এরপর অনুসন্ধানকারীদল গত কয়েকদিন এই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য সুনামগঞ্জে এসে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে। এই নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রীট পিটিশন (নম্বর ৫১০৮/ ২০১৮) দায়ের করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার শরীফপুর গ্রামের মো. নুরুল আমিন ও মোছাম্মৎ জাহানারা বেগমের ছেলে দেলোয়ার হোসেন গেল বছরের ১০ এপ্রিল দুদকে দায়ের করা আবেদনে উল্লেখ করেন, সুনামগঞ্জ জেলার বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ কার্যালয়ের অধীন বিজ্ঞ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নিয়োগ কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন তৎকালীন চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. রহিবুল ইসলাম, সদস্য ছিলেন সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শহীদুল আমিন এবং সহকারী জজ মো. খালেদ মিয়া।
২০১৬ সালের ৭ জুন জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায় এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। আবেদন গ্রহণ শেষে কয়েক হাজার নিয়োগ প্রার্থী গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেয়। সুনামগঞ্জের কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সকাল ৯ টায়, ১১ টায় এবং বিকাল ৩ টায় পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়।
লিখিত আবেদনে উল্লেখ করা হয়, পরীক্ষা গ্রহণকালে চাকুরি প্রার্থীদের আসন বিন্যাস ছিল না। কোন প্রকার লিখিত প্রশ্নপত্র ছিল না। অংকের প্রশ্নটি মুখে বলে দেওয়া হয়েছিল।
বিকাল ৩ টায় লিখিত পরীক্ষা গ্রহণের কিছু সময়ের মধ্যেই ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি মৌখিক পরীক্ষা দেখানো হয় এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি তড়িঘড়ি করে ২৫ জনের নিয়োগপত্র প্রদান করা হয়। যাদের নিয়োগপত্র প্রদান করা হয়। এরা হলেন- ঝিনাইদহ্ জেলার শৈলকূপা উপজেলার বেড়বাড়ি গ্রামের মো. আমির হোসেন ও মোছাম্মৎ নাছিমা খাতুনের ছেলে মো. ইমরান হোসেন। একই জেলার হরিণাকু- উপজেলার ফসলী গ্রামের মো. নজরুল ইসলাম ও বীনা খাতুনের মেয়ে শামীমা ইসলাম, একই গ্রামের সাইদুর রহমান ও লিপি খাতুনের মেয়ে সুমি আক্তার রিতু, একই জেলা ও উপজেলার পার্বতীপুরের উসমান গণি ও রেখা খাতুনের ছেলে শহীদুল ইসলাম, মাগুরা জেলার মাগুরা সদর উপজেলার বেলনগর গ্রামের মো. নজরুল ইসলাম ও মোছাম্মৎ সালেহা বেগমের মেয়ে মোছাম্মৎ ফারজানা ইয়াছমিন, চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার কেজনা গ্রামের শফিকুল আলম ও সাজেদা বেগমের ছেলে মুজাহিদুল আলম, একই জেলার বোয়ালখালী উপজেলার ধোরলা গ্রামের আহম্মদ কবির ও খাইরুন নাহারের ছেলে তারেক আহম্মদ তুহিন, একই জেলার পটিয়া পৌর এলাকার তালুকদার বাড়ী’র নূর মুহাম্মদ ও নার্গিস আক্তারের ছেলে মু: শাহেদুল ইসলাম, একই জেলার চন্দনাইশ উপজেলার কেওয়া গ্রামের সফিউর রহমান ও জয়নাব বেগমের ছেলে সোলাইমান হোসেন বাবু, ময়মনসিংহ জেলার দাদুনিয় হারগুজির পাড় গ্রামের মো. লাল মিয়া ও রানোয়ারা বেগমের ছেলে মো. দুলাল মিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার শাহ্পুর গ্রামের বজলু মিয়া ও রেনুয়ারা বেগমের ছেলে রুবেল মিয়া, একই উপজেলার আকিছিনা গ্রামের আবুল কালাম ভুইয়া ও আরশেদা বেগমের ছেলে মো. আরিফুল ইসলাম ভুইয়া, নারায়ণগঞ্জের রপগঞ্জ উপজেলার কান্দাপাড়া গ্রামের আব্দুল বাতেন ও খাদিজা বেগমের ছেলে মো. জাহাদুল ইসলাম, একই জেলার সদরগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর গ্রামের মো. আব্দুল লতিফ সরকার ও মোছাম্মৎ নাছিমা বেগম’এর মেয়ে মোছাম্মৎ লাবনী খাতুন, মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার চকের গ্রামের মো. বজলুর রশীদ ও পিয়ারা বেগমের ছেলে মো. আব্দুল্লা আল মামুন, কুষ্টিয়া জেলার ইসলামী বিশ^বিদ্যালয় উপজেলার রাবানগর গ্রামের সাদ আহম্মেদ ও কোহিনুর বেগমের ছেলে সোহেল আহম্মেদ, যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার বল্লভপুর গ্রামের মো. নিয়ামত আলী ও মোছাম্মৎ তাহমিনা খাতুনের ছেলে মো. শাহাবুদ্দিন, ময়মনসিংহ জেলার মধ্য দাপুরিয়া গ্রামের সিরাজুল ইসলাম ও উম্মে কুলসুম’এর ছেলে গোলাম সামদানী, কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার আন্দিকুট গ্রামের মো. লস্কর আলী ও রাফিয়া খাতুনের ছেলে মো. জাকির হোসেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার রিচি গ্রামের মো. শওকত আলী ও মোছাম্মৎ মমতা বেগমের ছেলে মো. সেলিম মিয়া, কুমিল্লা জেলার আদর্শ সদর উপজেলার জামবাড়ী গ্রামের মো. আব্দুল মান্নান ও মোছাম্মৎ সাজেদা বেগমের ছেলে মো. কিরণ মিয়া, চুয়াডাঙা জেলার আলমডাঙা উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের মো. ইজাল উদ্দিন বিশ^াস ও মোছাম্মৎ মরিয়মনেছার ছেলে আলীম হোসেন, ময়মনসিংহ জেলার মধ্য দাপুনিয়া গ্রামের মো. জাফর আলী ও জোলেখা খাতুনের ছেলে মো. রাশেদুল ইসলাম, একই গ্রামের মো. দানেশ আলী ও মোছাম্মৎ সালেহা খাতুনের ছেলে দেলোয়ার হোসেন। এই ২৫ জনকে মৌখিক পরীক্ষার ৫ দিন পর ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে কাজে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
দেলোয়ার হোসেনের আবেদনে এই নিয়োগ পরীক্ষায় ৩০ জনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়। এরমধ্যে ৬ থেকে ৩০ ক্রমিকে নম্বরে অভিযুক্ত নিয়োগপ্রাপ্ত ওই ২৫ জন। অন্য ৫ জন হলেন সুনামগঞ্জের তৎকালীন জেলা জজ শহীদুল আলম ঝিনুক, নিয়োগ কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত ৩ কর্মকর্তা ও তৎকালীন যুগ্ম জেলা জজ মোছাম্মৎ শেখ রাজিয়া সুলতানা।
অভিযোকারী আবেদনে উল্লেখ করেন- এই নিয়োগে মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের নিয়োগ সম্পর্কিত সার্কুলার অমান্য করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ের কার্যালয় সমূহে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা হচ্ছে জেলায় স্থায়ীভাবে বসবাসকারী প্রার্থীকে চাকুরিতে নিয়োগ দেওয়া। যদি কোন জেলায় উপযুক্ত প্রার্থী না পাওয়া যায়, সেই ক্ষেত্রে অন্য জেলার প্রার্থী নিয়োগের বিধান আছে।
আবেদনকারী ৩৩ জন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী’র ২৫ জনের ক্ষেত্রেই অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে দাবি করেছেন। নিয়োগপ্রাপ্ত অন্য ৮ জন সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। তিনি দাবি করেন, এরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিকট আত্মীয়-স্বজন। নিয়োগপ্রাপ্তদের সঙ্গে নিয়োগদাতাদের আত্মীয়তার সম্পর্কের বিবরণও উল্লেখ করা হয়েছে আবেদনে। এরমধ্যে বোন, শালিকা, ভাই, ভাতিজাসহ নানা সম্পর্কের কথা উল্লেখ রয়েছে।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির উল্লেখিত পদ এবং নিয়োগদানের পদেও গড়মিল রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটাও মানা হয় নি।
আবেদনকারী দাবি করেন, সুমি আক্তার রিতু আবেদন দাখিলের সময় এইচএসসি (সমমান) পাস হিসাবে আবেদন করেন। অথচ. এর পরে ২০১৭ সালে এইচএসসি পাস করেছেন তিনি। এটি বড় রকমের জালিয়াতি বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দেলোয়ার হোসেন’এর দুদকে করা আবেদনে সাক্ষী হিসাবে সুনামগঞ্জ জেলা আইনহীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সালেহ আহমদ, মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক জেলা কমান্ডার নুরুল মোমেন, সাবেক সদর উপজেলা কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদসহ নিয়োগ প্রার্থী অনেককেই সাক্ষী হিসাবে নাম দেওয়া হয়।
আবেদনকারী দেলোয়ার হোসেন জানান, দুদকের সিলেট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ও অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা মোস্তফা বোরহান উদ্দিন আহম্মদ’এর নোটিশ পেয়ে গত ২৪ অক্টোবর তিনি সিলেট অফিসে গিয়ে সাক্ষ্য দেন। সেখানে তারা তার কাছ থেকে বিস্তারিত জানেন এবং সকল অনিয়মের লিখিত প্রমাণাদিও তিনি তাদের তুলে দেন। এসময় তিনি, দুদকের কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, লিখিত পরীক্ষায় মেধা তালিকায় থাকার পরও তার চাকুরি হয় নি।
বুধভার বিকালে দুদকের সিলেট অফিসের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা (টিম লিডার) মোস্তফা বোরহান উদ্দিন আহম্মদ এ প্রতিবেদককে বলেন, সুনামগঞ্জ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৩৩ কর্মচারী নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে দাবি করে নিয়োগ বঞ্চিত আবেদনকারী দেলোয়ার হোসেনের অভিযোগের অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এর অংশ হিসাবে অভিযোগকারী’র বক্তব্য শোনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা কথা বলা হচ্ছে।