যুদ্ধাপরাধের চিহ্নযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে কেন এমপিওভুক্তি?

স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি দাপুটে অবস্থানে থাকবে, এ বোধ করি ছিল কল্পনারও অতীত। কিন্তু মানুষের ভাবনা আর বাস্তবতা সবসময় সমান্তরাল অবস্থানে থাকে না। স্বাধীনতা লাভের সাড়ে তিন বছরের মাথায়ই আমরা দেখতে পাই এক অদ্ভুত বাস্তবতা স্বাধীন এই ভূখণ্ডে। যারা জীবন পণ করে স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিলেন, সংগঠিত করেছিলেন, স্বাধীনতার পক্ষের সেইসব ব্যক্তি হঠাৎ করেই ব্রাত্য হয়ে পড়লেন আর সাংঘাতিকভাবে দাপুটে অবস্থানে চলে গেল সেইসব ব্যক্তি যারা প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেইসব স্বাধীনতা বিরোধীরা রাষ্ট্রীয় মদদে ১৯৭৫ সনের ১৫ আগস্টের পর স্বাধীন এই ভূখ-ের দ-মু-ের মালিক বনে গেলেন। তারা রাষ্ট্রের মন্ত্রী পদে আসীন হলেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে তারা শক্তিশালী অবস্থান নিলেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্তা হয়ে প্রভূত অর্থ-বিত্তের মালিক বনে গেলেন। আর সেই অন্ধকার সময়ে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি লজ্জা আর আতংকে মুখ লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হলেন। বোধ করি লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনকারী পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমন পশ্চাদপসরণ ঘটেনি। এ থেকে একটি জিনিস সুষ্পষ্ট যে, ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি ভৌগোলিকভাবে স্বাধীন হলেও একটি শক্ত আদর্শিক বিজয় সাধন করতে পারেনি। নতুবা মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় পরাজিত শক্তি এমন ক্ষমতা অর্জন করতে পারত না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অর্ধ শতক অতিক্রান্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে আমাদের অবস্থান। কিন্তু এই সময়েও আমাদের লড়াই করতে হয় স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি নিয়ে। এখনও এই দেশে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলোর চাইতে স্বাধীনতা বিরোধী পরিবারগুলোর ক্ষমতা বেশি। এরা সমাজ-রাষ্ট্র-প্রশাসন কিংবা প্রতিষ্ঠান সর্বত্র প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর ইতিহাসের সেই পশ্চাদপসরণকে দূর করতে একটি শক্ত রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক লড়াই চালু হয়েছে সত্য, কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধীদের অবস্থান এতটাই শক্ত যে সেই পাথরে চিড় ধরানো কঠিনতর হয়ে পড়েছে। এরা এখন ভেক ধরেছে। এরা দলে দলে নিজেদের আসল চেহারা আড়াল করে সাময়িক ভান ধরে আছে অনুকূল সময়ের অপেক্ষায়। শক্তি সঞ্চয় ও সংহতকরণে কিছু অদূরদর্শীর সহায়তাও পাচ্ছে তারা।
উপরের এত কথা বলার অর্থ হল, গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, জেলার যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্ত হয়েছে সেখানে সরাসরি জামায়াত পরিচালিত একটি মাদ্রাসা ও জনৈক চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর নামে প্রতিষ্ঠিত স্কুলও এমপিওভুক্ত হয়েছে। অথচ এর চাইতে ভাল আরও কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির বাইরে রয়ে গেছে। জামালগঞ্জে একটি বিদ্যালয়ের নামে যে যুদ্ধাপরাধীর নাম যুক্ত তার বিরুদ্ধে রয়েছে সুনির্দিষ্ট যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ। তার পিতা জেলার নামকরা দালালদের অন্যতম। একটি স্বাধীন দেশে এমন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর নামে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হতে পারে না। এই নামকরণের বিরুদ্ধে এর আগেও জামালগঞ্জসহ জেলায় প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়েছে। কিন্তু নাম পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। দায়িত্বশীলদের এই নির্বিকার মনোভাব তাদের প্রশ্রয় দেয়ার নামান্তর। বলাবাহুল্য স্বাধীনতা বিরোধীরা এমন প্রশ্রয় পেয়ে আসছে স্বাধীনতার পর থেকেই।
জেলার স্বাধীনতা বিরোধিতার চিহ্ন রয়েছে যে দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিওভুক্তির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। অন্তত এমপিওভুক্তির পর যাতে জামালগঞ্জের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির নাম থেকে যুদ্ধাপরাধীর নাম বিযুক্ত হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে আর জামায়াত পরিচালিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কী করে এমপিও পায় সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার দায় যারা এই প্রতিষ্ঠানটির নাম সুপারিশ করেছেন তাদের। মনে রাখতে হবে দৃঢ় অবস্থান ব্যতীত আদর্শিক বিজয় অর্জন করা কখনও সম্ভব নয়।