রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব- ১০
আমরা রাতেই খবর পেলাম কাঠাল বাড়িতে গ্রেনেড হামলায় তিন জন পাক সেনা নিহত ও চারজন আহত হয়েছে। এমন সংবাদের ভিত্তিতে কালা মেজর আমাদেরকে মিষ্টি মুখ করিয়েছেন। আর এই প্রথম উনার পা-ুলিপিতে আমাদেরকে প্রশংসা করে লিপিবদ্ধ হয় এবং খুশি মনে আমাদেরকে তিন দিন বিশ্রামের অনুমতি দেন। এই বয়সে কি বিশ্রাম গায়ে সয় ? হাফ প্যান্ট আর গেঞ্জি পরে বালাট নদী পার হয়ে মইলাম শরণার্থী শিবিরে চলে যাই। নদী পার হওয়ার সময় দেখতে পাই শিবিরের আট ও নয় নম্বার ক্যাম্পে আগুনের লেলিহান শিখা, মানুষের হুলুস্থুলে আমরা প্রায় দৌঁড়েই আট নম্বর ক্যাম্পে পৌঁছি। দুটি ক্যাম্পের প্রায় আট শত ঘর পুড়ে গেছে। শাল পাতার ছাউনি দেওয়া একটি ঘরে আগুন লাগলেই দুই তিন সারির ঘরে আগুন ধরে নিমিষেই শত শত ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এই এক অবাক কান্ড। শুকনো পাতলা বাঁশে আগুন ধরলে নিভতেও বেশি সময় নেয়না। আমরা গায়ে খেটে ঘর পুড়া মানুষদের অনেক সায় সাহায্য করেছি। তৃপ্তিও পেয়েছি বেশ, অনেক সিরিয়াস কলেরা রোগীকে স্থানীয় ডাক্তারের পরামর্শে পাঁজাকোলা করে শিলং হাসপাতালে নেওয়ার জন্য গাড়িতে তুলে দিয়েছি। এসব কাজ করতে গিয়ে পেটে ক্ষুধা ও ক্লান্তি অনুভব হয়নি। তাই কবির ভাষায় মনে মনে আউড়িয়েছি পরের কারণে স্বার্থ দিয়ে বলি, এ জীবন মন সকলেই দাও, তার চেয়ে সুখ আছে কি কোথাও, আপনারে ভুলিয়া যাও। ঐ পরোপকারী কথা মনে হলে শত ঝামেলা থাকলেও মনটা একটু হালকা লাগে। প্রশান্তির ছোঁয়ায় প্রাণটা ভরে উঠে। জীবনের সকল পাপ কর্মের দায় থেকে মুক্তি পেতে অসহায় শরণার্থীদের সাহায্য সেবার জন্য তাদের আত্মার আর্শিবাদ যেন আমার উপর বর্ষিত হয়। যদিও আমরা প্রতিদানের আশায় ওদের দুর্দিনে এগিয়ে যাইনি, আর সে সব অনুভব করার মত মেধা ও প্রজ্ঞা তখন আমাদের ছিল না। সুতরাং জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ওগুলো অবসাদ অবসরে অনুভবে অনুভূত হয়। পরোপকারীর উপরে আর কোন পূন্য নেই। তিন দিন বাদেই কালা মেজরের নতুন হুকুম, বালাটের প্রায় কাছে অবস্থিত ডলুড়া গ্রামের মাঠ হতে রাজাকাররা একটি গরু ও একটি মেয়েকে ধরে নিয়ে গেছে। যে ভাবেই হউক রাজাকারদের শায়েস্তা করে গরু ও মানুষকে উদ্ধার করতে হবে। আমাদের ধারণা গরু তো খেয়েই ফেলেছে, এখন গরু বের করতে হবে ওদের পেট চিড়ে। আমরা ডলুরা নদীর পাড় দিয়ে হাঁটছি আর হাঁটছি, পাক সেনা ও রাজাকারদের পাত্তাও নেই। একটার পর একটা চারমিনার সিগারেট টানছি, যদিও আগে নাসির উদ্দিন বিড়ির ভক্ত ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধে এসেই সিগেরেটে দীক্ষা নিয়েছি। প্রায় তিন মাইল হাঁটার পর হঠাৎ চাইজিন রাইফেলের গুলি শুরু হয় বৃষ্টির মতো। শরীরের এপাশ ওপাশ দিয়ে গুলির ফিসফাস শব্দ, কয়েকটা মর্টারের বোমাও পড়ল, আমরা যেদিক দিয়ে আসছি সেই দিক থেকেও গুলি আসছে। পালানোর পথ রুদ্ধ। নদীতে ঝাঁপ দেওয়া ছাড়া বিকল্প পথ নেই। আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ডলুরা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। বিলম্ব করলে আমাদেরও গরুর
হাল হবে। নদীর প্রবল ¯্রােতে অস্ত্র নিয়ে সাঁতরানোও সম্ভব হচ্ছে না। এই দেখে হানাদাররা নদীর পাড়ে এসে আমাদের লক্ষ করে গুলি ছুঁড়ছে, প্রাণ বাচাঁতে পাঁচ জনে পানিতে রাইফেল ছেড়ে দিয়ে সাঁতরাতে থাকি। ওদের গুলি শরীরের পাশ দিয়ে টপটপ করে পানিতে পড়ছে, কিন্তু শরীরে লাগছে না। ঈশ^রের ইচ্ছায় পাড়ে ওঠে প্রাণে বাঁচি। ওরা পূর্ব পরিকল্পনা করেই রাজাকার দিয়ে গরু ও মানুষকে নিয়েছে। তারা জানতো ওইখানে এই কুকর্মটা করালে মাথা মোটা মুক্তিযোদ্ধারা রেজাকারের খুঁেজ ঠিকই আসবে। এবং আমাদের আগ থেকেই ওৎ পেতে বসে আছে। আমরা যখন পুরোপুরি ওদের রেঞ্জের ভিতরে চলে আসি, তখনই গুলি ছুঁড়ে। আমরা নদীর পাড়ে ওঠে বীরত্ব প্রকাশের জন্য পজিশন নিয়ে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুঁড়ি। কিছুক্ষণ পর ওদের গোলাগুলি থেমে যায়। আমরা ওখান থেকে রওনা দেওয়ার আগে মাথা গুনতি দিয়ে দেখা যায় এক জন মানুষ কম। সেই হতভাগার নাম দেলোয়ার হোসেন। তার বাড়ির ঠিকানাটা মনে করতে পারছি না। তার সন্ধান পেতে আমরা প্রায় দুই মাইল হেঁটেছি নদীর ভাটির দিকে। তার আর দেখা মিলল না। সে গুলি খেয়ে পানিতে ডুবে গেছে। চিৎকার দেওয়ারও সময় পায়নি। সম্ভবত গুলিটা মাথায় লেগেছে। সাথের বন্ধু একজন হরালাম। পাচঁটি রাইফেল নদীতে ফেলে আসায় মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ি। তাই তাকে খোঁজাখুঁজি না করে হাঁটতে হাঁটতে চিনাকান্দি বাজারে এসে পৌঁছি। হালকা চা নাস্তা খেয়ে বাজারের একজনের দেয়া মাদুর বিছিয়ে সামান্য বিশ্রাম করছি। এরই মধ্যে অনেক লোকের ভিড় লেগে গেছে। সবার অভিযোগ চিনাকান্দির মিশ্রির বাপের উপর। সে নাকি পাক সেনা ও রাজাকারদের মদদদাতা। এবং সে রাজাকারদের নিয়ে শরণার্থিদের লুটপাট ধর্ষণ হত্যায় লিপ্ত। আমরা অন্তত চল্লিশ জনের কাছ থেকে মিশ্রির বাপের অপকর্মের বর্ণনা শুনে ধর্য্য ধরা মুশকিল হয়ে পরে। তবুও অভিযোগকারীদের এই বলে শান্তনা দেই যে, আমাদের উর্ধতন কর্মকর্তাগণকে অবহিত করার পর তার কুৎসিত কাজের বিচর করা হবে। আমরা এই বলে ওখান থেকে বিদায় নিয়ে বালাট চলে আসি। বালাট আসার ঘন্টা তিনেক পরে খবর পাই মুক্তিযোদ্ধারা নাকি প্রকাশ্য দিবালোকে দৌঁড়ে পালানোর সময় মিশ্রির বাপকে গুলি করে হত্যা করেছে। (চলবে)