রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব-১৫
বালাট থেকে গেরিলা যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে শরণার্থী শিবিরেরও খোঁজ খবর নেই। মইলাম শরণার্থী শিবিরের নেতৃবৃন্দও আমাদের হাইকমান্ডের কাছে রাজাকারদের অভিযোগ অনুযোগ নিয়ে আসেন। শরণার্থীরা ভারতে আসার পথে বিশ^ম্ভরপুর ও তাহিরপুর এলাকায় রাজাকারদের অত্যাচার ছাড়াও স্থানীয় লম্পটরা বিভিন্ন সংগঠনের নামে চাঁদা আদায় করত। বিশেষ করে মাছ ব্যবসায়ীরা সংগঠনের নামে চাঁদা দিতে দিতে সর্বশ্বান্ত। যুদ্ধের কারণে দেশের আইন কানুন কিছুই নেই। তাই বালাটে অবস্থানরত রাজনৈতিক নেতা ও শরণার্থী নেতৃবৃন্দের একান্ত অনুরোধে শরণার্থীদের দুঃখ কষ্ট বিবেচনা পূর্বক সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত সাহেব মুক্তিযোদ্ধাদের একটি চৌকস দল উক্ত এলাকার অরাজকতা সামাল দিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। আনসার নায়েক ইমান আলী ও রাজেন্দ্র দাসের নেতৃত্বে আমরা আঠারো জনকে ওই এলাকায় যাওয়ার নিদের্শ দেন। আমরা রওনা দিয়ে চিনাকান্দি গ্রামের সদ্যপ্রয়াত রহিম বক্স হাবিলদারের বাংলো ঘরে দুই দিন থেকে ঐ এলাকার চাঁদাবাজি ও হয়রানি সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ করে দেই। রহিম বক্স হাবিলদারের পনের ষোল বছরের একটি ছেলে আমাদেরকে সার্বিক সহযোগিতা করেছে। ছেলেটির নামটাও ভুলে গেছি। এমন সৎ ছেলে খুবই কম দেখা যায়। এরপর বিশ^ম্ভরপুর এলাকার বাজারে আসি। ওখানে রাজাকারদের নড়াচড়া না পাওয়া গেলেও স্থানীয় বখাটেদের দৌড়াত্ম লক্ষ্য করার মতো। তবে এখানকার অরাজকতা থামাতে কাউকে শাস্তি দিতে হয়নি। বন্দুকের নল দেখেই দুর্বৃত্তরা সুবোধ বালক হয়ে গেছে। চিনাকান্দি থেকে বিশ^ম্ভরপুর পর্যন্ত শরণার্থীদের চলাচলের রাস্তাটিও স্বাধীন বাংলায় রূপ নিয়েছে। আর এই ঝোট ঝামেলা সারাতে বন্দুকের একটি গুলিও ব্যবহার করতে হয়নি। বিশ^ম্ভরপুর বাজারে কয়েকটি দোকান মাত্র, এরই একটি ফাঁকা ঘরে কোনক্রমে রাত্রিটা কাটালাম। দেশের মানুষের ভালোবাসা আছে বলেই খানাপিনার কোন সমস্যা হয়নি। তবে জামালগঞ্জের দিকে সামান্য গুলির আওয়াজ শুনা গেছে। গৌরারং থেকে জামালগঞ্জের রাস্তায় রাজাকারদের আনাগোনা আছে বলে খবর পাই। পাক সেনারা এই রাস্তায় আসে না বলে রাজাকারদেরই অভয়ারণ্য। এরপর নিয়ামতপুর দুলভারচর এসে জানতে পাই জামালগঞ্জের হালির হাওরের মুখ থেকে সহোদরা তিনটি মেয়েকে রাজাকাররা শরণার্থীর নৌকা থেকে জোরে ধরে এনেছে। মেয়েগুলিকে প্রথমে সাচনা বাজারের শশীপাল এর দালানে আটকে রেখে রাজাকারদের কামনা বাসনার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে বাজারের পোস্টঅফিস ও আখড়ার ব্যাঙ্কারে পাক সেনাদের হাতে তুলে দেয়। হানাদারদের পাশবিক অত্যাচারের ফলে বড় দুইটি মেয়ে অত্যধিক রক্তক্ষরণে তিন চারদিনেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ছোট মেয়েটির দৈহিক জোর থাকায় জ্যান্তমরা হয়ে বেঁচে আছে। সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। আমরা তাকে বিবস্ত্র অবস্থায় কচুখালি গ্রাম থেকে উদ্ধার করি। লিখতে বিবেক বাঁধে, মেয়েটির স্তনের বোটা ছিল না। আমাদের অদম্য চেষ্টা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে হিন্দু শূন্য শালমারা ও কচুখালি গ্রামের রাজাকারদের বিভিন্ন ডেরা থেকে আরো পাঁচ জন মেয়েকে উদ্ধার করি। মোবাইল ফোনের যুগ থাকলে এই টুকুও সম্ভব হতো না। পাক সেনাদের সাথে ফোনের মাধ্যমে রাজাকাররা যোগাযোগ করে আমাদেরকে বেকায়দায় ফেলে দিতো। রাজাকারদের আস্তানায় হানা দিতে আমাদের সাত পাঁচ ভাবতে হয়নি। কারণ সকল রাজাকারদের রাইফেল দেওয়া হয় না। শুধু বেতনভোগী রাজাকাররাই রাইফেল পেয়েছে। বাকীরা বেতনধারীদের সহযোগী মাত্র। দেশের মানুষের কাছে রাজাকার নামে পরিচয় পেলেও পাকিস্তান সরকারের রাজাকারের তালিকায় তাদের নাম নেই। কেবল অস্ত্রধারী রাজাকাররা পাক সেনাদের আদেশ নির্দেশ এর অপেক্ষায় থাকত। আর রাত বিরাতে আকাম কুকাম করতে দু’একটা অস্ত্রধারী রাজাকার চুরি চামারী করে মেয়েদেরকে নিয়ে সময় কাটাত। আমরা দুটি বাড়িতে হানা দিয়ে রাইফেলধারী দুই রাজাকারকে ধরতে পেরেছি। অস্ত্রহীন রাজাকাররা পালিয়ে যায়। সাচনা বাজারের আশে পাশেই পাক সেনাদের ব্যাঙ্কার বাদেও রাজাকারদের কব্জায় থাকা আরো কয়েকটি মেয়ের তথ্য পাই। তবে সাচনা বাজারের পাকসেনারা শক্ত পজিশনে থাকায় আমাদের দুর্বল অস্ত্রবলের কারণে সামনে আর এগোইনি। রাত্রিও প্রায় শেষ। দুই রাজাকারের পেছন দিকে হাত বেঁধে একটি নৌকায় করে রওয়ানা দেই। রাস্তায় দুই রাজাকার কান্নাকাটি করে অনেক কিরা কসম করে বলেছে, ওরা এখন থেকে আমাদের সঙ্গে থেকেই পাক সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। কিন্তু তাদের মায়াকান্নায় আমাদের মন টলেনি। তাই কান্নাকাটি থামিয়ে দিতে দুই লম্পটকে হাত পা বেঁধে আবুয়া নদীতে ফেলে দিলাম। সকাল বেলায় নৌকায় করে বিশ^ম্ভরপুর বাজারে এসে পৌঁছলাম। বাজারে চায়ের ব্যবস্থা না থাকায় এক বাড়ি থেকে চা বানিয়ে এনে লোফ দিয়ে খেলাম। সাথে যুবতী মেয়েদেরকে দেখে স্থানীয় মানুষদের ভিড় জমে গেছে। তাই দেরি না করে পায়ে হেঁটে বালাটের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। মান মর্যাদা শ্রেণি বিন্যাসের ক্ষেত্রে একটু হলেও লিখতে হয়। রাজাকারদের দুইটা রাইফেল কাঁধে বয়ে আনতে গিয়ে দেখলাম আমাদের রাইফেল ও ওদের রাইফেলের মধ্যে গুণগত মান বা নমুনায় কোনো ব্যবধান নেই। যদিও পাক সেনারা অত্যাধুনিক চাইনিজ রাইফেল ব্যবহার করে আসছে। এদিকে ভারতীয় আর্মিদের রাইফেলও উন্নত মানের। হয়তো ভারত ও পাকসেনা কর্মকর্তারা মনের বেখেয়ালেই মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারদেরকে একই নমুনার রাইফেল ইস্যু করেছেন।