রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব-১৭
আবেগঘন হুদয়বিদারক চিঠিটি মানিব্যাগে দশ বৎসরের মতো সংরক্ষণ ছিল। প্রতিদিনই একবার করে দেখতাম। যা পড়লে মনের মাঝে নতুন প্রাণের সঞ্চার হতো। কল্পনার মোহে শরণার্থী শিবিরটা ঘুরে বেড়াতাম। একদিন পকেটমারের হাতে মানিব্যাগটি খোয়া যায়। জীবনের অনেক কিছুই কালের আবর্তে ও বয়সের ভারে স্মৃতি থেকে মুছে গেছে। কিন্তু চিঠির কথাগুলো আজও স্মৃতির পাতায় অম্লান। মেয়েগুলের সাথে সামান্য পরিচয়, ওদের মা বাবার মতোই দুঃস্বপ্ন ভেবে মর্ম বেদনা ঝেরে ফেলে বালাটে চলে এলাম। আর অশান্তির মধ্যেই শান্তির পরশ খুঁজা। একটি আশ্চর্য ঘটনা হঠাৎ মনে পড়ে গেল, আমরা যখন বেরিগাও ডিফেন্সে ছিলাম সম্ভবত সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়ে গেছিল। বঙ্গবন্ধু নাকি পাকিস্তান কারাগারে বসে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তান স্বীকার করে কারগার থেকে মুক্তি নিয়েছেন। তাই যুদ্ধ এখন থেমে যাবে। এমন গুজবে আমাদের মনোবল অনেকটা হ্রাস পেয়ে গেছে। তাই এই ভুয়া সংবাদটি সম্পূর্ণ মিথ্যায় রূপান্তর করতে প্রতিটা ব্যাঙ্কারে মেজর মোতালিব সাহেব সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এসে আমাদের মন থেকে গুজবটি সরানোর জন্য কয়েক দিন আপ্রাণ চেষ্টা অব্যাহত রাখায় আমাদের ভ্রান্ত ধারণা মন থেকে মুছে যায়। রণাঙ্গনে হতাহত বা বিশেষ অপারেশন ছাড়া সাধারণ যুদ্ধের কোন ঘটনায় উল্লেখ করি নাই। এই দিকে উত্তর সুনামগঞ্জের পুরো এলাকা পাক সেনাদের দখলে চলে যাওয়ায় মেজর ডি স্যুজার আগের প্রাণচাঞ্চল্য ও উগ্র বদমেজাজ অনেকটাই শিথিল হয়ে গেছে। কারণ পাক সেনাদের কাছে আমরা পরাভূত হয়ে প্রাণ বাঁচাতে পাহাড়ে এসে আশ্রয় নিলেও কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয়নি। কিন্তু মেজর ডি স্যুজা বালাট সেক্টরের ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হিসাবে জবাবদিহিতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তার উপরওয়ালা অফিসারদের কাছে। তবে মেজর মহোদয়ের ভালো মন্দ আচরণ সবটাই আমাদের প্রাণে সয়ে গেছে। দেশ স্বাধীন করাটাই আমাদের মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাতে খাবার খেয়ে আমরা জয়নাল ভাইয়ের নেতৃত্বে মঙ্গলকাটার দিকে এ্যাম্বুস করতে রওনা হয়ে যাই। ওখানে পৌঁছে ত্রিমুখী একটি রাস্তার মোড়ে একটি আড়ার পাড়ে কচু গাছের ফাঁকে ফাঁকে ওৎ পেতে বসে থাকি। খবর অনুযায়ী পাক সেনারা ঐ রাস্তা দিয়ে টহল করতে আসে। সারা রাত চিনাজুকের কামড় খেয়ে বসে থেকেও শত্রু পক্ষের কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে ফেরত আসার মনস্ত করি। ভোর হয়ে গেলে ওখান থেকে ফেরত আসা কঠিন হয়ে যাবে। এরই মধ্যে উত্তর দিকে ভোরের আজানের ক্ষীণ শব্দ শোনা যায়। তখনই দেখা যায় পাক সেনাদের দশ বার জনের একটি দল রাইফেল হাতে টহল দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আমাদের থেকে প্রায় পঁচিশ গজ দূরে থাকতেই এক সাথে ফায়ার করি। আমাদের ধারণা সবকটি লাশ হয়ে পড়ে গেছে। ফায়ারের আওয়াজ শোনে ওদের পিছন থেকেও মোষলধারে গুলি আসছে, বোমাও পড়ছে। আমাদের আর পায় কোথায়। এক দৌঁড়ে নিরাপদ স্থানে চলে আসি। আর এই প্রথম আমরা হতাহত ছাড়াই হায়েনাদের হত্যা করতে পেরেছি। তবে আটচল্লিশ বছর পরেও জনশ্রুতি আছে মুক্তিযোদ্ধারা নাকি পাক সেনাদের টিকিটিও দেখেনি। তাই আজ এই লেখাটি লিখতে ঠোটে যেন একটু হাসির রেখা ফুটে ওঠছে। এমন নির্ভেজাল হত্যাকান্ড আমাদের ওপরে পাকসেনারাও করতে পারেনি। ওদের অতর্কিতে হত্যাকন্ডের সংবাদটি পরদিন রাত্রে আকাশবাণী কলকাতা থেকে ফলাও করে প্রচার করায় আমাদের মনোবল আকাশচুম্বি হয়ে গেছে। এতো দিন আমরা রণাঙ্গনে অপারেশন করতে মেজর ডি স্যুজার নির্দেশনা শাস্তি বলে মনে করতাম। আর এই অপারেশনের পর থেকে ঝুকিপূর্ণ অপারেশনগুলোতেও মৃত্যু ভয় বায়ে ফেলে হানাদারদের মৃত্যু রচনায় গেরিলা যুদ্ধে পুরোদমে ঝাঁপিয়ে পড়ি। পাক সেনাদের আচমকা ধরার খবর সারা এলাকায় ছেয়ে গেছে। স্থানীয় জনগণ বালাটে এসে আমাদেরকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানিয়েছেন। যে এলাকায় ছল চাতুরির মাধ্যমে গুলি করে খাসি খেয়েছি, সেই এলাকার মানুষ আজ নিমন্ত্রণ করে বাড়িতে নিয়ে খাসির পোলাও বিরানী খাইয়ে দিয়েছেন। এর চেয়ে বড় তৃপ্তি আর কি হতে পারে। এরই মধ্যে খবর পেলম আমার মা বাবা ভাই বোন আত্মীয় স্বজনরা মইলাম শরাণার্থী শিবিরে এসে গেছেন। উনারা আট নম্বর ক্যাম্পে ঠাই নিয়েছেন। সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নদী পার হয়ে মইলাম শরাণার্থী শিবিরে চলে যাই। বাসার সামনে যেতেই মা বাবা ভাই বোনেরা আমাকে জড়িয়ে ধরে কি কান্না। দেখতে দেখতে শতাধিক মানুষ জমে গেছে। কান্নার মাঝেও যে এতো আনন্দ এই প্রথম অনুভব করলাম। মরা মানুষকে ফিরে পাওয়ার কান্নার রেশটাই আলাদা। উনারা নিশ্চিত জেনে ছিলেন রাজাকাররা আমাকে ধরে মেরে ফেলেছে। আজ সজীব ছেলেকে দেখে কান্নার আর বাঁধ মানছে না। দুঃখ ভারাক্রান্ত শরণার্থীরা জড়ো হয়ে সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেছে। আমি ঐদিন বালাটে না এসে স্বজনদের পাশেই রয়ে গেলাম। তবে রাতে আর ঘুমাতে পারিনি। সবার মাঝে বসে বিভিন্ন রণাঙ্গনের ঘটনা প্রবাহ বলতে বলতেই রাত অতিক্রান্ত তারপরও আংশিক বর্ননা করেছি মাত্র। তাই বাকিটা আরেকদিন বলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সকালের নাস্তা খেয়ে পুরো শরাণার্থী শিবিরটা ঘুরে বেড়ালাম। মহামারি কলেরায় প্রতিটা পরিবারকে তছনছ করে ফেলছে। আরো নানাবিধ সমস্যাতো আছেই। কলেরার সুচিকিৎসা নাই বললেই চলে, অকাল মৃত্যুর আহাজারিতে মানুষ হতভম্ব হয়ে পড়েছে। কে কাকে শান্তনা দিবে, সবাই আগাম বিপদের আশংকায় শঙ্কিত। (চলবে)