রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব- ১৮
শরণার্থীদের একই আশা আকাঙ্খা দেশটা কবে স্বাধীন হবে ? আমি বুক টান করে সবাইকে আশ^স্ত করেছি, ঈশ^রের কৃপায় মাস দুয়েকের মধ্যেই দেশ শত্রু মুক্ত হবে। তাদেরকে দেয়া কথা ঈশ^র হয়তো মন দিয়েই শোনে ছিলেন। মানুষ কয়েক জনমের পাপ কর্মের ফলে হয়তো নিজের দেশ ফেলে ভিনদেশে গিয়ে শরণার্থী হয়। তবু কেন জানি মনে টানে সেই বয়সে আবার যদি মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারতাম, আর শরণার্থী শিবিরটাও একাত্তরের মতো থাকতো, আরে তা না না তা কল্পনা করাই পাপ, থাক ওসব। ঐদিনই সন্ধায় বালাট ফিরে আসি। নতুন কোন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে। এরপর থেকে কয়েক দিন পরপর শরণার্থী শিবিরে আসতাম। এই জন্য কারো কাছ থেকে কোন রকম অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পরত না। মেজর ডি স্যুাজ ও আমাদের ব্যাপারে অহেতুক নাক গলাতেন না। ঐ দিন যারা মঙ্গলকাটা অপারেশনে গিয়েছিলাম তারা সবাই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বীর শ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত হয়ে গেছি। তবে যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে আমাদের উপর কর্তৃপক্ষের জোর তাগিদ না থাকলেও পরের দিনই শত্রুদের খবরাখবর জানতে টহল দিতে ডলুরার দিকে বাহির হয়ে পড়লাম। ঐ এলাকা থেকেই আমাদের দেলোয়ার হোসেন নিখোঁজ হয়ে ছিলেন। কিছু দুরে এগোনোর পর জানতে পারি ওখানে পাকসেনারা আগের মতোই ঘাঁটি মেরে বসে আছে। তারা সংখ্যায় পঞ্চাশ ষাট জনের মতো আছে। ওদের কাছে এল এমজি ও টুইন্স মর্টারের উপরে কোন অস্ত্র নেই। ছোট ছোট পাহাড়ের টিলার আড়ালেই ছোট ছোট ব্যাঙ্কার করে এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অবস্থান করছে। মুক্তিযোদ্ধাদের গতিবিধি সর্বক্ষণ লক্ষ্য রাখছে। আমরা খবরাখবরও নিয়ে ফেরার পথে নদীর পাড় ছেড়ে একটু উপর দিয়ে হেঁটে আসছি। কিছুক্ষণ হাঁটার পরই দেখলাম আট নয়টি জন বসতি ঘরও আছে। একটি বাচ্চাকে ডেকে এনে কয়েক জনে পানি খেলাম। আর দেখি কয়েকটি মোরগ দৌড়াঁদৌঁড়ি করছে। এরই মধ্যে একটি খাসি মোরগও আছে। তাই খাওয়ার রসনাটা আর আটকাতে পারলাম না। ভারতীয় বোটের ডাল খেতে খেতেই জিহ্বাটা একেবারে পানসে হয়ে গেছে। সিদ্ধান্ত নিলাম দুপুর বেলায় মোরগ ভাত খেয়েই যাব। ঘরের মহিলাও খাওয়াতে রাজি হয়ে গেলেন। বন্দুক যেখানে আমাদের কাঁধে তখন অমতের আর কারণ নাই। কিন্তু কয়েক জন মিলে শত চেষ্টা করেও খাসি মোরগটা ধরতে পারলাম না। শেষান্তে রাইফেলের গুলি দিয়েই মোরগ বাবাজিকে ধরাশায়ি করলাম। আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল পাক সেনাদের চাইনিজ রাইফেলের বৃষ্টির মতো গুলি। আমরা রাইফেল কাঁধে ফেলে দৌঁড় কি দৌঁড়, কে কার আগে পালাবে। আমাদের প্রতি ঈশ^রের কৃপা ছিল বলেই কারো গায়ে গুলি লাগেনি। শরীরের এপাশ ওপাশ দিয়ে ফুস ফাস করে গুলি গুলো চলে গেছে। নিরাপদ স্থানে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলছি মোরগের মালিক মহিলা হয়তো মুখ টিপে হাসছে আর বলছে ওরে বান্দির পুতাইন যাযগা কেনে ? মোরগ ভাত খাইয়া যা। আমরা মাথা মোটা বলেই মোরগের উপর ফায়ার করে মহা বিপদ ডেকে আনলাম। আর ওরাও মাথা মোটায় পিছিয়ে নেই। আমাদের ফায়ারের শব্দে মাথা মোটারা ভেবেছিল আমরা ওদেরকে আক্রমন করেছি। কিন্তু একটু সুক্ষ মাথায় যাচাই করলে খাওয়ার সময়তো আমাদেরকে হাতে নাতে ধরে মোরগের মতো জবাই করতে পারতো বা খাওয়াতে বসিয়েই মোরগের মালিক পাক সেনাদের খবর দিয়ে আনতে পারত। যাক কাকতালীয় ভাবে বেচে গেলাম। তবে এরপর থেকে কারো বাড়িতে খাওয়া দাওয়া একবারে বন্ধ করে দিয়াছিলাম। বালাট ফেরার পর সাথী বন্ধুরা মুরগ খাওয়া নিয়ে হেসে লুটুপুটি। তবে এ কয়দিনে পাক সেনাদের ভয়ে প্রাণ বাঁচতে দৌঁড়ে পালানোও কঠিন হয়ে গেছে। উত্তর সুনামগঞ্জে এখন গেরিলা যুদ্ধ থেকে সম্মুখ যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। পাক সেনারা হতাহত হয়েছে অনেক। আমাদের ‘এ’ কোম্পানী এক অপরেশনে এক পাক সেনারকে ধরে এনেছিল। পরে জানতে পারি ঐ কুখ্যাত হানাদারকে সু চিকিৎসার জন্য শিলং পাঠানো হয়েছে। অনেক রাজাকারকেও আমরা হত্যা না করে বালাটে হস্তান্তর করেছি। পরে জানা যায় প্রায় রাজাকারই বেকসুর খালাস পেয়ে দেশে ফিরে এসেছে। উচ্চ পদস্ত কর্তব্যক্তিরা আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন বোধ করেননি। এই জ¦ালা রাখবো কোথায় ? বালাট এবং বড়চড়া থেকে আমার জানামতে কয়েক জন রাজাকার সৎ ও মুক্তিকামী জনদরদী হিসাবে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু আমরা জানি ওই কুলাঙ্গাররা কতো বিভৎস্য কুকর্ম করেছে। আর আমাদের দূর্ভাগ্য এখানেই, আমরা পুনঃর্বার আর এইসব রাজাকারদের এলাকায় অপারেশনে যেতে পারছিনা। আর মুক্ত হওয়া রাজাকাররা আগের মতোই কুকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে মুক্তি পাওয়া রাজাকারদের খেসারত অন্য এলাকার রাজাকারদের কাছ থেকে উসুল করেছি। তবে এই পর্যন্ত আমাদের যে কয়জন মুক্তিযোদ্ধা পাক সেনাও রাজাকাদের হাতে ধরা পরেছে কেউই তাদের হাত থেকে মুক্তি পাননি। আর কাউকে মুক্তি দিলেও দুটি চোখ উপড়ে ফেলে ছেড়ে দিয়েছে। আমাদের হাতে ধৃত হওয়া কুখ্যাত রাজাকারও আমাদের উপরওয়ালা অফিসারদের সদয় করুনায় ছাড়া পেয়েছে। কিন্তু নয় মাসের যুদ্ধে পাকসেনারদের হাতে আটক হওয়া মুক্তিযোদ্ধা অগণিত শর্তের বিনিময়েও তাদের নির্মম হাত থেকে ছাড়া পেয়েছেন বলে আমার জানা নেই। তবে শান্তনায় এই টুকু বলা যায়, আমাদের উদার মানবতা ছিল বলেই দেশমাতৃকাকে অতিদ্রুত মুক্ত করতে পেরেছি।