রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব-১৯
বালাটে একবার হৈ চৈ কান্ড ঘটে গেল। আমাদের লোকেরা খাইয়ারগাঁও গ্রাম থেকে এক রাজাকারকে তার রাইফেল গোলাবারুদ সহ ধরে এনেছিলেন। হাত বাঁধা অবস্থায় তাকে কয়েদখানায় বন্দী করে রাখা হয়। রাতে কোন খাওয়া খাদ্য দেওয়া হয়নি। কারণ আমাদের কর্তৃপক্ষরা এই কুখ্যাত লম্পটের কাছ থেকে পাক সেনাদের কোন গোপন তথ্য আদায় করতে পারেনি। ভোর রাতে কয়েদখানায় পাহারারত এক মুক্তিযোদ্ধার চিল্লাচিল্লিতে আমাদের ঘুম ভাঙ্গে। সবাই ওঠে গিয়ে দেখি অবাক কান্ড। রাজাকারটা কয়েদখানা থেকে পালিয়ে গেছে। ডিউটিতে থাকা মুক্তিযোদ্ধা ভাইটি হায় হুতাস করে বলছে ঐ রাজাকার নাকি পায়খানা করার জন্য অনেক অনুরোধ অনুনয় করায় তার হাতের বাঁধন খোলে দিয়ে পায়খানা কারাতে নিয়ে যায়। আর এই ফাঁকেই সে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। তাই সে কাঁদো কাঁদো ভাবে সবাইকে চিৎকার দিয়ে ডাকছে। পরে মেজর ডি স্যুজা ও অন্যান্য কমান্ডের জেরার মুখে প্রহরী মুক্তিযোদ্ধা ভাইটি সত্য কথা প্রকাশ করে। ঐ রাজাকার নাকি তার নিকট আত্মীয়। রাজাকারের কান্নাকাটিতে সে আর স্থির থাকতে পারেনি। পলাতক রাজাকারের বাড়ি ছিল দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পাগলার চিকারকান্দি গ্রামে। মেজর ডি স্যুজা তার রাইফেল কেড়ে নিয়ে কয়েদখানায় ঢুকিয়ে দেন এবং ঐদিন থেকে সাত দিন তার পিঠে দশটা ইট বেঁধে প্রতিদিন চার ঘন্টা দৌঁড়ানোর শাস্তি দেন। পরে সবার অনুরোধে তিন দিন শাস্তি দেওয়ার পরেই তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। একাত্তরে আরো দেখেছি, দেশের ভিতরে রাজাকারদের শলাপরামর্শে পাকসেনারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে নিরীহ মানুষদেরকে জোর করে রাজাকার হতে বাধ্য করেছে। তবে জোর করে রাজাকার বানানো অনেকেই সুযোগ খোঁজে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে বা মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধক্ষেত্রে সার্বিক ভাবে সহযোগীতা করেছে। আমি কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাদেরকে দেখেছি যারা প্রথমে পাকসেনাদের সাথে রাজাকারে যোগ দিয়েছিল, পরে তারা সুবিধা বঞ্চিত হওয়ার কষ্টে রাজাকারের খেতাব পরিহার করে মুক্তিযোদ্ধের ট্রেনিং দিয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের কর্মদক্ষতায় প্রথম সারির মুক্তিযোদ্ধা বলে মনে হয়েছে। আমি ওদের মধ্যে একজনকে দেশ স্বাধীনের পর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার হতে দেখেছি। মানুষের সদইচ্ছার প্রতিফলন ঘটলে পিছনের অপকর্মের ভোগান্তি আর পোহাতে হয়না। তবে মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করেছে তাদের মধ্য থেকে কেউই রাজাকারের খাতায় নাম লিখাতে যাননি। জীবনের সবুজ সময়টাকেই হেলায় অবহেলায় কাটিয়ে দিলাম। বার্ধক্যে এসে এইটুকু প্রতিয়মান হয়েছে সকল সুখ শান্তি যেন একাত্তরের রণাঙ্গনেই বিসর্জন দিয়ে এসেছি। যুদ্ধক্ষেত্র যতই কন্ঠকময় প্রাণঘাতি হউক না কেন, সেরা বন্ধুত্ব, সেরা আনন্দ যুদ্ধক্ষেত্রেই বিরাজমান। রণাঙ্গনেই মানবতার আত্মপ্রকাশ ঘটে। যুদ্ধক্ষেত্রেই জাতপাত ধর্মীয় বিভাজন থাকে না। রণাঙ্গনই হচ্ছে ভ্রাতৃত্ববোধের অটুট বন্ধনের আস্তানা। রণাঙ্গনই মানুষকে মানুষ হতে শেখায়। যুদ্ধ যদিও প্রাণ সংহার ঘটায় তবে নতুন আঙ্গিকে বাঁচার প্রেরণ যোগায়। মুক্তিযুদ্ধে না গেলে জীবনটাই হয়তো অপূর্ণ থেকে যেত। কয়েদখানা থেকে রাজাকারটা
পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে আমাদের ব্যারাকে কেবল রাজাকারদের কুৎসিত কান্ডকারখানা নিয়েই আলোচনার আসর। অসৎ কাজগুলোতে রাজাকারদের আশকারা না পেলে হানাদাররা নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য কাজের দিকে এতটা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠতো না। আমাদের উৎসাহী মনের জোর ও রেডিওর খবর অনুযায়ী দেশ অচিরেই স্বাধীন হবে। এটা নিশ্চিত হয়ে গেছি। তবে এর আগে রাজাকারদের একটা হেস্তন্যাস্ত করতেই হবে। পরদিনই আমরা পঁচিশ জনের একটা দল গেরিলা যুদ্ধে বেড়িয়ে পরি। ঝিনারপুর গ্রামের পাশে ওৎপেতে বসে থাকি রাতের বেলায় যুদ্ধক্ষেত্রে সিগেরেট খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কারণ শত্রু পক্ষ আগুনের রেশ ধরে প্রতিপক্ষের অবস্থান চিহ্নিত করতে সহজ হয়। বিপদের আশঙ্কা থাকা সত্তেও আমার এক মাথা মোটা সাথী বিড়ি ধরানোর জন্য কেরোসিন লাগানো সলতার ম্যাচে কয়েকটা টিপ দিয়েদিলেন। আর এই আগুনের সূত্রধরে পাক সেনাদের রাইফেলের একটি গুলি তার পাশে বসা জুনাব আলীর কাঁধে এসে লাগে। জুনাব আলী বুদ্ধিমান বিদায় কোন চিৎকার চেচামেচি করেননি। আমাদের সাথের আরো দুই জন ওনাকে ধরাধরি করে বালাটের হাসপাতালে নিয়ে যান। আমাদের কোন প্রকার নড়াচড়া বা সায়শব্দ না থাকায় পাকসেনারা বুঝে গিয়েছে ওখানে কোন মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতি নাই। প্রায় আধঘন্টা নিশ্চুপ থাকার পর আমরাই শত্রুদের নড়াচড়ার শব্দ পাই। ভোরের সামান্য আলোতে ওদেরকে দেখাও যাচ্ছে। মূলত আমাদেরকে ধরার জন্যই ওরা ওৎ পেতে বসেছিল। শত্রুই যখন এলোনা তাদের আর বসে থেকে লাভ কি ? সবাই যখন গা ঝারা দিয়ে ওঠে দাঁড়াল তখনি আমাদের দুটি এলএমজির ব্রাশ ফায়ার শুরু হলো। আমরাও ফায়ার চলমান রেখে ব্যাক করতে শুরু করলাম। শত্রুদের অন্য গ্রুপের সৈন্যরাও প্রচুর পরিমাণে গুলি ছুড়তে থাকে। ততক্ষণে আমরা একেবারে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে এসেছি। তবে ঐ দিন পাকসেনারা একটু হলেও টের পেয়েছে মুক্তিযোদ্ধা কাকে বলে? এই দিনের যুদ্ধের কথা আমরা কেউই কাউকে বলিনি। রাতের বেলায় বিবিসি ও আকাশ বাণী থেকে ওদের হতাহতের খবরটা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে।