রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব- ২০
নিপুণ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত দক্ষ পাকসেনারা একমাত্র গেরিলা যুদ্ধেই আমাদের কাছে পরাস্ত। বাঘমারা বেরিগাঁও রণাঙ্গনে সম্মুখ যুদ্ধে আমাদের যে পরিমাণ হতাহত হয়েছে। গেরিলা যুদ্ধে তাদের আরো অধিক পরিমাণে প্রাণহানি ঘটেছে। ওদের দুঃসংবাদের খবর জানতে আমাদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। খেত খামারে কাজ করা মুক্তিগামী সাধারণ মানুষেরা ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই হুবহু ঘটনার খবর আমাদের কাছে পৌঁছাতে কোন কারপন্য করতেন না। ভোর বেলা লাল পানির বাজারে খাসিয়াদের অভিনন্দন বার্তা জোরেশোরে পাই। একবারে জোর করেই পুদিনা পাতার ভর্তা ও মেরা পিঠা আমাদের খাইয়ে দেন। খাদ্য প্রণালি সাদামাটা হলেও ষোড়শী আপ্যায়ন নজর কাড়ার মতো। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার পথে এই বাজারেই এই খাসিয়ারা আমাদের প্রতি যে ধরনের দুর্ব্যবহার করেছিল, তাদের নানাবিধ জ¦ালাতনে অতিষ্ঠ করে তুলছিল। ট্রেনিংয়ে যাওয়ার উদ্দীপনাই মাটি করে দিয়েছিল। শহীদ বীর জগৎ জ্যোতি দাস এক খাসিয়াকে আচর মেরে তার বাবদশা ঘটিয়ে দিয়েছিল। এক আচারেই আমরাও খাসিয়াদের মধ্যে বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন রচনা হয়েছিল। দেশ স্বাধীনের পঁচিশ বছর পর বালাট গিয়েছিলাম তখনকার খাসিয়া তরুনীরা তরুণীর মা হয়ে বসে আছেন। বালাটে একদিন থেকে পুরোনো স্মৃতি স্মৃতিচারণ করে স্মৃতিকাতর হয়ে ফিরে এসেছি। মইলাম শরনার্থী শিবিরেও গিয়েছি। ধুধু বালির মাঠ জনশূন্য হয়ে পরে আছে কলেরার মহামারিও অদৃশ্য। এখানে আমার এক ভাই ও এক বোনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের কথা মনে করে শুধু চোখের জল ফেলে আত্মার শান্তি কামনা করে এসেছি। কি লিখতে কি লিখলাম। খাসিয়া তরুণীদের ওখানে নাস্তা সেরে আপ্যায়নকারীদের উদ্দ্যেশে দু’হাত তোলে বিদায় জানিয়ে বালাট ব্যারাকে চলে আসি। অপারেশন সাফল্যমন্ডিত হয়েছে বলে মেজর ডি স্যুজা হাত তুলে অভিবাদন জানান। আমরা ¯œানাহার সেরে ঘুমিয়ে পড়ি। সন্ধ্যার একটু আগে ঘুম ভাঙ্গে। কিছুক্ষণ হাটাচলা করে রেডিও নিয়ে বসে থাকি। এইর মধ্যে আকাশ বাণী কলকাতা থেকে দেবদুলাল বন্দপাধ্যায়ের ভারী কন্ঠে মোহনীয় আওয়াজ ভেসে আসছে। প্রথমে সুনামগঞ্জের পাক হানাদারদের হতাহতের খবর। আমরা কি আর বসে থাকার পাত্র। সবাই দাঁড়িয়ে জয় বাংলা শ্লোগানে বালাটকে স্বাধীন বাংলাদেশ বানিয়ে ফেলেছি। মেজর ডি স্যুজা ও মেজর মুতালেব সাহেব কে নিয়ে জয় বাংলা বলে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছেন। আমাদের জয় মানেই উনাদের কামন্ডিংয়ের জয়। ওনার সুদক্ষ দিক নির্দেশনার জন্যই এতো বড় সফলতা। আর এই দিন থেকেই আমাদের খাদ্যের গুণগত মানও বৃদ্ধি পেয়েছে। পোকায় ধরা চাউলের পরিবর্তে উন্নত মানের চাউল ও ডালের সর্বরাহ করা হয়েছে। সকালের পরোটা একটার বদলে দুটো করা হয়েছে। অস্ত্র গোরাবারুদের ও নতুনত্ব বেড়েছে আর মনে হয়েছে এখন আর কেউ কি পারে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে ? ডলুরা জিনারপুর এলাকার সফল অপারেশনের পর থেকে পাক সেনারা আগের চেয়ে তৎপর হয়ে গেছে। বালাটে বসেই জয়ের আনন্দে জয় বাংলা শ্লোগানের খবরটিও তাদের
কাছে পৌঁছে। তখন থেকে খেত খামারে কর্মরত খেটে খাওয়া মানুষদেরকে মারধর করে মাঠ থেকে তারিয়ে দেওয়া হয়। শত্রুরা যেন পাগলা কুকুরের মতো হয়ে গেছে। পুরো এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছে। খেত খামারে কাউকে দেখা মাত্রই গুলির নির্দেশ। তাদের ধারণা খেত খামারের মানুষেরাই তাদের গোপন খবরাখবর আমাদের কাছে পৌঁছায়। তবে আগের চেয়ে উত্তর সুনামগঞ্জে যুদ্ধের টানটান অবস্থা বিরাজমান। অকারণে ওদের বোম্বিংয়ের আওয়াজ শুনা যাচ্ছে। আমাদের প্রকাশ্যে চলা ফেরা সম্পূর্ণ ভাবে নিসিদ্ধ করা হয়েছে। আমপাড়া বাজারে তোছাদ্দেক হোসেন ডাক্তার (তসু ডাক্তার) উনার বিশ^স্ত লোক দ্বারা ঐ এলাকার খবরাখবর আমাদের কাছে পৌঁছাতেন। তিন আজ বেচেঁ আছেন কিনা জানি না। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ওনার ত্যাগতিতিক্ষার অবদানে মুক্তিযোদ্ধার সনদ প্রাপ্ত হয়েছেন কিনা তাও জানা গেল না। উনি বালাট হাসপাতালে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাথমিক চিকিৎসায় পারদর্শি ছিলেন। অক্টোবরের শেষের দিকে হানাদারদের গুলাগুলির তীব্রতা বিরামহীন থাকলেও আমরা একবারে নিরব নিস্তব্ধ। শুধু মাঝে মাঝে গেরিলা যুদ্ধে আক্রমন, ডোবা নালা খাল বিল থাকার কারণে আমাদের একটু বাড়তি সুবিধা। ওদের জীবন চলে গেলেও ওরা পানিতে নামে না। রাজাকাররাও প্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করতে চায় না। ওদের শুধু লম্প ঝম্প লুট পাট অগ্নি সংযোগ আর নারী ধর্ষণ একমাত্র কাজ। দেশের সেরা সেরা পরিবার গুলো পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছে। তারা জানতো পাকিস্তান হেরে গেলেও বাংলাদেশে তারা বহাল তবিয়তেই থাকতে পারবে, হয়েছেও তাই। থাক এসব যুদ্ধেই ফিরে আসি। আমাদের গেরিলা যুদ্ধ প্রতিনিয়তই চলছে। শত্রু পক্ষের হতাহতের মাত্রটাও বাড়ছে। তার পরও উত্তর সুনামগঞ্জ থেকে হানাদাররা পিছু হঁটছে না। আমরা শত চেষ্টা করেও আমাদের বে দখল হওয়া স্থানগুলি পুন:উদ্ধারে বিফল হচ্ছি। বালাট সেক্টরে পাঁচটি কোম্পানীর মধ্যে এ’ কোম্পানীর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্রে সফলতা দেখিয়েছেন বেশি। কম্পানী কমান্ডার মহোদয়ের নামটা এই মুহুর্তে মনে করতে পারছি না। ‘এ’ কোম্পানীতে ইপিআর ও আনসার ব্যাটেলিয়নের সদস্য সংখ্যা বেশি ছিল বলে বালাটের রণাঙ্গনের সফলাতার পাল্লাটা তাদের দিকেই ভারী। আমাদের ‘সি’ কোম্পানীতে দক্ষ মুক্তিযোদ্ধা কম হলেও মাথা মোটা দুঃসাহসি যোদ্ধার হার বেশি। তাই তাজ্জব কাহিনী জন্ম দিতে আমরাই ছিলাম সেরা। বড়চড়া সেক্টরের অধীনে বারো দিন যুদ্ধ করেছি, তাও আবার শহীদ বীর জগৎ জ্যোতি দাসের নেতৃত্বাধীনে। এমন দুঃসাহসি বীরের সাথে থেকে যুদ্ধ করাটাই গৌরবের ব্যাপার। সেই সময়ে রাজাকারও পাকসেনাদের আতঙ্ক উৎকন্ঠা মানেই জগৎ জ্যোতি দাস। সেই রণবীরের বীরত্বগাথা স্মৃতি আজীবন অম্লান হয়ে থাকবে।