রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব-২১
আমরা কয়েক জনের নাম সি কোম্পানীর রেজিস্টারে অন্তর্ভূক্ত থাকলেও হেড কোয়াটারের কমান্ডবাহিনী সহ পাঁচ কোম্পানীর রণাঙ্গন এলাকায় চষে বেড়িয়েছি। বালাট থেকে ভাজা বোট নিয়ে নিজের টাকায় কিনে ব্যাংকারে ব্যাঙ্কারে সাথী ভাইদের খাইয়ে দিয়ে আনন্দ উপভোগ করেছি। ঐ দিন গুলি আজও মনে নাড়া দেয়। রাজাকারদের শায়েস্তা বা কঠিন কাজগুলোতে আমাদের ক’জনের ডাক পরতো। কাজগুলো যতই ঝামেলার হউক না কেন আমাদের কাছে মন্দ লাগতো না। আর নিজ হাতে রাজাকারদেরকে শাস্তি দিতে পারলে শহীদ হওয়া সাথী বন্ধুদের হারিয়ে যাওয়ার ব্যাথা অনেকটা ভুলে যেতে পারতাম। একদিন বিকেলে আমাদের চার জন মিলে তাস খেলছে। আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছি। এমন সময় খবর পেলাম কয়দিন আগে যে, গরু ও একটি মেয়েকে রাজাকাররা তুলে নিয়ে গিয়েছিল সেই মেয়েটি নাকি হায়েনাদের কবল থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। খবরটি পাওয়া মাত্রই তাস খেলার আসর বাদ দিয়ে রাত্রি বেলায় টহল দেওয়ার নাম করে ঐ মেয়ের বাড়িতে যাই। তার বাড়িতে গিয়ে জানতে পারি মেয়েটি নিরাপত্তার কথা ভেবে নিজের বাড়িতে না এসে চৌমুহনী খাইয়ার গাওয়ে তার মামার বাড়িতে গিয়ে ওঠে। আমরা তার মামার ওখানে গিয়ে মেয়ের মাকেও ওখানে পাই। অনেক চেষ্টা করেও মেয়েটির সাথে দেখা করতে ব্যর্থ হই। তার মার সাথে সামান্য আলাপ করে জানতে পারি মেয়েটি কদিন ধরে লজ্জা অপমানে কারো সাথেই দেখা করেনি। অগত্যা তার মায়ের সাথেই আলোচনা শেষে পান খাওয়ার জন্য মায়ের হাতে একশত টাকা দিয়ে ওখান থেকে বিদায় হই। আমরা সামান্য অগ্রসর হতেই ঐ মহিলা আমাদেরকে পিছন থেকে ডাকতে শুরু করেন। ডাকের শব্দে আমরা দাঁড়িয়ে গেলে মহিলা কাছে এসে বললেন ওনার মেয়ে নাকি আমাদের সাথে কথা বলবে। তাই আবার ফিরে গিয়ে ঘরের বারান্দায় সবাই বসলাম। মেয়েটি আড়াল থেকে দাঁড়িয়ে সকল ঘটনা পূঙ্খানো পুঙ্খ ভাবে আমাদেরকে খোলে বলে। রাজাকাররা তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ঐ খানে তার বাবার পরিচিত এক রাজাকারকে দেখতে পায়। ঐ রাজাকারের বাড়ি বাঘমারা গ্রামে। ঐ রাজাকারও মেয়েটির বাবা এক সাথে চোরা কারবার করেছে। সেই পরিচয়ের সুবাদেই ঐ রাজাকারের সহায়তায় মেয়েটি পালিয়ে আসতে সুযোগ পায়। আত্মীয়তার একটি সমীকরণ লক্ষ করার মতো। বালাটে এক মুক্তিযোদ্ধার বিশ^াস ঘাতকতায় এক কুখ্যাত রাজাকারের পলায়ন, আর এখানে রাজাকারের সত্যিকারের মহানুভবতাই উদাহরণটি আজকের লিখায় স্থান পেল। তার মহৎ উদারতার জন্যই মেয়েটি মান সম্ভ্রম নিয়ে আসতে পেরেছে। এতো দিন জেনে এসেছি রাজাকাররা শুধু কুকর্মেই লিপ্ত থাকে। এখন জানলাম কুলাঙ্গার লম্পট দ্বারা মাঝে মধ্যে সুকর্ম ও সাধিত হয়। আমরা মেয়েটিকে সাধুবাদ জানিয়ে ওখান থেকে বিদায় নিলাম। বালাটে এসে রাজাকার বধের নতুন একটি ফন্দি আটলাম। পরের দিনেই মেয়েটির মামাকে খবর দিয়ে বালাট নিয়ে আসি। তার সাথে হৃদতার সহিত বিশদ আলোচনার পর বাঘমারার রাজাকারকে গুচ্ছ গ্রামে নিয়ে আসার জন্য পরামর্শ দিলাম এবং শর্ত দিলাম ঐ রাজাকার যদি আমাদের কথা মতো একমত নাও হয় তবু তাকে স্ব-সম্মানে ছেড়ে দিব। দুই দিন বাদে সংবাদ এলো ঐ রাজাকার গুচ্ছ গ্রামে না এসে গোদিরগাঁও আসবে এবং আমরা যেন ঐ খানে অস্ত্রবিহীন উপস্থিত থাকি। শর্ত মোতাবেক যথা সময়ে আমরা পাঁচ জন খালি হাতে আর সাত জনকে অস্ত্রসহ আমাদের পিছনে পিছনে খেয়াল রাখার জন্য নিয়ে যাই। কারণ বিপদের হাত পা নেই। কখন যে বিপদ চেপে বসবে বলা যায় না। গোদির গাওয়ের মাথায় একটি গাছের নিচে তাকে নিয়ে বসলাম। তার কাছ থেকে নতুন তথ্যের অবগত হলাম। পাকসেনাও রাজাকাররা যদিও এক পথের পথিক কিন্তু আন্তরিকতার ফারাক বিস্তর। রাজাকারদের কে পাকসেনারা পুরোপুরি বিশ^াস করে না। যে জন্য রাতের বেলায় পাকসেনা ও রাজাকাররা এক সাথে ঘুমায় না। রাজাকারদের ঘুমানের জন্য আলাদা ডেড়ার ব্যবস্থা। শুধু কাটা দিয়ে কাটা তোলার জন্যই রাজাকারদের সাথে কেবল বাহ্যিক প্রণয় প্রীতি। চব্বিশ ঘন্টা ফুট ফরমায়েশের উপর রাখে, রাজাকারদেরকে দুই পা এক করতে দেয় না। হানাদারদের ডিফেন্সে থেকে রাজাকারদের আস্তানা একটু দুরে রাখে। এতো দিন জেনে আসলাম পাক সেনা ও রাজাকারের গলায় গলায় ভাব। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আলাপে আরো জানা যায় তাদের লোকবল ও অস্ত্রবলের খবরাখবর। শেষান্তে সিদ্ধান্ত হয়, যে সব রাজাকাররা মেয়েটিকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল সেই রাজাকাররা আবার গরু বা খাসি ধরে নিতে ডলুড়া গ্রামে আসতে হবে। যে কোন কৌশল অবলম্বন করে রাজাকারদের ডলুড়া গ্রামে নিয়ে আসবে। আমরা আগ থেকে ওখানে উৎ পেতে বসে থাকবো। সে আরো জানালো তার মনে পাকিস্তান প্রেমের কোন ছিটা ফোটাও নেই এবং সে বেতন ভূক্ত রাজাকারও নয়। তার পরিবার পরিজন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই পাক সেনাদের হাতে নজর বন্দি অবস্থায় আছে। শুধু পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে সে হানাদারদের পুতুল হয়ে নাচে। ইচ্ছা থাকলেও হানাদারদের কব্জা থেকে বের হওয়ার পথ রুদ্ধ। তবে দেশ যাতে হানাদার মুক্ত হয় সে কায়মন চিত্তে সেই কামনাই করে। তার আবেগগণ কথাবার্তায় আমরা একবারে দুর্বল হয়ে পরি। তাকে অত্যাধিক বিশ^স্ত মনে করে স্ব সম্মানে বিদায় দেই। আর অবিশ^াসী কাজ করলেও আমাদের কোন বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভবনা নেই। বিপদের মধ্যে তো আছিই। নতুন কোন বিপদের আশঙ্কা করাও বাতুলতা। দুদিন পরেই বিকেল বেলায় লাল পানির বাজারে সে এসে আমাদেরকে খবর দেয় আমরা বাজারে এসে তার সাথে দেখা করে জানলাম সে নাকি গত কালও এই বাজারে এসে আমাদের খোঁজ খবর নিয়েছিল। আমরা ব্যারাকের বাহিরে থাকায় দেখা হয়নি।