রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব- ২২
তার সাথে আলোচনায় সর্বশেষ চূড়ান্ত হয় আমরা পরের দিন দুপুরে জিনারপুর থেকে ডলুড়ার রাস্তার মুখে উৎ পেতে বসে থাকবো। রাজাকাররা সন্ধ্যার আগ মুহুর্তে ঐ রাস্তায় আসবে। ওরা পাঁচ-ছয় জনের বেশি হবে না। বাকীটা যেন আমরা সামলিয়ে নিই। তবে রাজাকারদের সাথে সে নাও আসতে পারে। রাজাকাররা পাক সেনাদের হুকুমের গোলাম মাত্র। তাই ওদের আসার প্রোগ্রাম যদি কোন কারণে বাতিল হয় তাহলে তাকে দায়ী করা যাবে না। পুরো ব্যাপারটি আমাদের কর্তৃপক্ষকে জানিয়েই এতো দূর এগিয়েছি। তাই ইপিআর নায়েক মহিবুর রহমান ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা ষোল জন অস্ত্র সস্ত্রে সুজ্জিত হয়ে যথা স্থানে ওঁত পেতে বসে থাকি। বিকাল অনুমান পাচঁটার দিকে পাচঁ জন রাইফেলধারি রাজাকার ও চার জন খালি হতে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের এ্যাম্বুলেন্সের ভিতর ঢুকে পরে। আমরা তৎক্ষণাত তাদের কে ঘিরে ফেলি। হ্যান্ডসআপ শব্দটি উচ্চারণ করতেই তারা কিংকর্তব্য ও বিমূঢ় হয়ে পরে। কাঁধ থেকে রাইফেল নামিয়ে তাক করার সুযোগ টুকুও পায়নি। ভ্যাবচেকা হয়ে দু’হাত তোলে দাঁড়িয়ে থাকে। ওরা নির্ভয়ে বুক টান করে রাজার হালে আসছিল। কারণ এলাকাটি পাক সেনাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। আমরা কোন প্রকার ফায়ার না করায় রাজাকারদের এমন করুণ অবস্থা শত্রু পক্ষ আঁচ করতে পারেনি। বিনা গোলাবারুদ ও বিনা রক্তপাতে ওদেরকে হাতে নাতে ধরে ফেলি। রাইফেল কয়টা কেড়ে নিয়ে পিছন দিকে হাত বেধে ফেলি। আর এই প্রথম কোন রাজাকারকে চড়থাপ্পর মারধর না করে বালাট নিয়ে আসি। খুবই সহজ ভাবে তাদেরকে পাকড়াও করতে পেরেছি বলে মনের ক্ষোভটা লোপ পেয়ে গেছে। পরবর্তীতে তাদের ভাগ্যে কি ঘটে ছিল তা আর জানতে পারিনি। খোঁজ নেওয়ার ও অবকাশ মিলেনি। তবে ওদের শেষ পরিণতি যে মৃত্যু তা অনুমান করতে পেরেছি। এতো বড় ঝামেলা মুক্ত জয়ের এনাম হিসাবে তিন দিন বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছি। মনের আনন্দে সময়টা কাটিয়েছি মইলাম ও পানচড়ার শরণার্থী শিবিরে। পরে অনেক খোঁজ খবর নিয়েও রাজাকার নামি গিয়াস উদ্দিন এর কোন খবর পাইনি। তবে রাজাকার পাকড়াও অপারেশনের দু’একদিন পর ওদের একটা খবর পাই একজন রাজাকারকে বিশ^াস ঘাতকতার জন্য পাকসেনারা নির্মম ভাবে হত্যা করেছে। কিন্তু সেইকি ঐ বিশ^াস ঘাতক এর সঠিক তথ্য পাইনি। দেশ মাতৃকার টানে তার এমন শ্রেষ্ঠত্বের অবদান এখনো মনে দাগকাটে। আমার বিস্মৃতিতে যা আটকে গেছে আজ তা আর লিখতে পারছি না। বালাট রণাঙ্গনের যাবতীয় ঘটনাবলি যারা জানতেন সেই সব বন্ধুরাও অনেকেই স্বর্গবাসী হয়ে গেছেন। যারা জীবিত আছেন তারাও রোগ শোকে আক্রান্ত। যে টুকু মনে পরছে সেই টুকুরই আলোকপাত করছি। বালাট রণাঙ্গনে গেরিলা যুদ্ধে এই কয়েক দিনে কয়েক জন হতাহত হয়ে গেছে। কখন যে কে মরব বলা যায় না। সাথী ও বন্ধু যাদের সাথে সকালে নাস্তা খেলাম বিকালেই হত বা আহত হয়ে ফিরে আসছেন। এই কয় মাসে বহু রাজাকারও পাকসেনা শিকার করেছি। মরার আগে একটি শিকার করেই রণাঙ্গনে ষোলকলা পূরণ হবে। আর অপূর্ণ শিকারটি হচ্ছে হরিণ। চট করে সবাই ঐক্যমত পোষণ করলাম যেই ভাবনা সেই কাজ। আমরা আটজন দুপুরের খাবার খেয়ে রাইফেল হাতে হেডকোয়াটারের পিছন দিকে গভীর অরণ্য পাহাড়ের ভিতর ঢুকে গেলাম। তিন চার ঘন্টা ঝার জঙ্গল ভেঙ্গেও হরিণের খোজ পেলাম না। সন্ধ্যাও ঘনিয়ে আসছে। ভাগ্নে দুলচাঁদ শিকারের সখে তার আর তর সইছে না। একটি শিয়ালের উপরে রাইফেলের ট্রিগার টিপে দিল। এই দিকে মেজর ডি স্যুজা হেডকোয়াটারের পিছনে গুলির আওয়াজ শোনে হতভম্ব হয়েগেছেন। ব্যারাকের সামনে সবাইকে জড়ো হওয়ার জন্য অনবরত হুইসেল ফুঁকতে লাগলেন। যেন শত্রু পক্ষ হেডকোয়াটার আক্রমণ করে বসলো। সকলকে পোলিং করে সংখ্যা গণনায় দেখা গেল আমরা আটজন অনুপস্থিত। যাই হোক মেজর মহোদয় সুস্থির নিঃশ^াষ ফেলে আমাদের অপেক্ষায় পায়চারি করতে থাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা চলে আসি। আমাদেরকে ব্যারাকের ভিতর ঢোকতে না দিয়ে জামকৃত গালাগাল যা ছিল সবই উপরে ফেললেন। ইপিআর নায়েক মহিবুর রহমানকে নির্দেশ দিলেন প্রত্যেকের পিঠে দশটা করে ইট বেঁধে দিনে চার ঘন্টা দৌঁড়াতে হবে। আগামীকাল সকাল থেকে কার্যকরি করা হবে। মেয়াদ সাত দিন। আমাদের রাইফেল কেড়ে নিয়ে ব্যারাকে পাঠিয়ে দিলো। সকাল থেকে শুরু হলো হরিণ শিকারের ইট পর্ব। প্রথম দিন চার ঘন্টা দৌঁড়েই বাব দাদার নাম ভুলে গিয়েছি। গোলাম রব্বানী সাহেব, এনাম সাহেব, রবিন্দ্র বাবু সহ পাচঁটি কোম্পানীর কমান্ডারগণ আমাদেরকে মাফ করে দিতে মেজর ডি স্যুজা কে অনুরোধ জানান। কিন্তু মেজর মহোদয় উনার সিদ্ধান্তে অনড়। আমরা নাকি ওনাকে বহু জ¦ালাতন করেছি। আমাদের অপরাধের তুলনায় এ শাস্তি নাকি অতি সামান্য। সুতরাং তিনি সাত দিনের মেয়াদের আগে কোন অজুহাতই শোনতে চান না। তখন আমরাও বেপোরুয়া হয়ে ওঠলাম। পর দিন সকালে ইটের বস্তা কাঁধে নিয়ে দৌঁড়াতে শুরু করলাম। একজন রাজনৈতিক শ্লোগানের মতো বলতে লাগলো এবার যদি মুক্তি পাই, আমরা জোরে জোরে বললাম কালা মেজরের মাথা চাই। তিনি উপস্থিত থেকে জিজ্ঞাসা করেন আমরা কি শ্লোগান দিচ্ছি? কারণ তিনি বাংলা বুঝেন না। মেজর মহোদয়ের কথার উত্তর না দিয়ে সবাই মুখ টিপে হাসলেন।