রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব- ২৩
তবে মেজর ডি স্যুজা আমাদের শ্লোগানের অর্থ না বুঝলেও তার মধ্যে একটি চাপা ভীতি লক্ষ্য করা গেছে। শ্লোগানটি উপস্থিত সকল মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে দারুণ রসাক্ত হয়েছে। মেজর মহোদয় সুস্পষ্ট ভাবে তা টের পেয়েছেন। তাই তিনি কিছু না বলেই স্থান ত্যাগ করেন। এরই মধ্যে মেজর মোতালিব সাহেব চলে এলেন এবং খবর দিলেন ‘ডি’ কোম্পানীর আব্দুস সালম গেরিলা যুদ্ধে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। তিনি আমাদেরকে মুক্ত করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। ততক্ষণে তার দেহ নিরব নিথর হয়ে গেছে। আমরা কতক্ষণ চোখের জল ফেলে ব্যারাকে চলে আসি। আর রণক্ষেত্র একবারে উত্তপ্ত হয়ে গেছে। মৃত্যু অনিবার্য মনে করে শরীর থেকে লাজ সরমটা একেবারেই মুছে দিয়েছি। তাই আমরা কজন বালাট বাজারে গিয়ে মেজর ডি স্যুজার স্টাইলে সাদা হাফ প্যান্টের ওর্ডার দিয়ে এসেছি। বালাট রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের তুলে নিতে জমদূত একবারে তাবু গেড়ে বসে আছে। কাকে যে কখন ধরবে বলা যায় না। তাই সাধ আহ্লাদ অপূর্ণ রেখে লাভ কি ? যুদ্ধের ফাঁক ফুকুরে হাফ প্যান্ট গেঞ্জি পরে শরণার্থী শিবিরে একটু ঘোরাফেরা করলে মনটা একটু হালকা হয়। আর ভালো মন্দা কিছু খেয়েও আসি। ব্যারাকে থেকে বোটের ডাল, আর লম্বা লেজের মেরা মেরির মাংস খেয়ে রুচিটাই মরে গেছে। তাই মাঝে মাঝে টহল দেয়ার নাম করে অস্ত্র হাতে বেরিয়ে পড়তাম। পাকসেনারা পুরো এলাকা দখল করে নেওয়ায় টহল করার জায়গাও কমে আসছে। একদিন আমরা দশ বারো জন নারায়ণ তলার উত্তর দিকে টহলে রওনা হলাম। পাহাড় ঘেঁষে প্রায় দুই মাইল হেঁটে খাসিয়া বস্তিতে গিয়ে বিরতি নিলাম। খাসিয়ারা খুব একটা পাত্তা দিলো না। ওদের ওখানে কয়েকটা ভুট্টা পুরা খেয়ে বাঙালি বসতির দিকে রওনা হলাম। পুরানো অভ্যাসটা ঘসা মাজা করতে ভাগ্নে রাজেন্দ্র একটি খাসিকে গুলি করে কাত করে দিল। গুচ্ছ গ্রামে এক বাড়িতে ওঠে রান্না বান্না করে খেয়ে দেয়ে বালাট চলে আসি। তবে আমরা পৌঁছার আগেই মেজর ডি স্যুজার কাছে খাসি মারার খবরটা চলে আসে। আমরা ডিফেন্স থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর থেকে আমাদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসা অনেকটা কমে যায়। তাই খাসির খবরটা দ্রুত আসে। খাসি আগেও খেয়েছি কিন্তু কোন খাসির মালিক অভিযোগ দিতে আসেননি। ঐ দিন মেজর মহোদয় আমাদেরকে ডেকে পাঠিয়ে খাসির ব্যাপারে কোন কৈফিয়ত চার্জ করেন নি। তিনি শুধু বলেছেন, আমরা জয়ী হয়েছি আমাদের কাছে তিনি পরাভূত। এই কথা বলেই তিনি হনহন করে চলে গেলেন। মেজর সাহেব আমাদের আচরণে কতটুকু কষ্ট পেয়েছেন তখন গুরুত্ব না দিলেও আজকের দিনে নিজেকে খুবই অপারাধী মনে করি। তিনি হয়তো স্বার্গবাসী হয়ে গেছেন। জানি না আমাদেরকে ক্ষমা করে গেছেন কিনা। তবে মেজর ডি স্যুজার মনের কষ্ট হালকা করতে পরের দিনই গেরিলা যুদ্ধে নারায়নতলা মিশন থেকে পাকসেনাদের হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি। গোলাগুলিতে আমাদের দুই জন আহত ও পঁচিশ ত্রিশ বছরের এক মহিলার পেটে গুলি লেগে বালাট হাসপাতালে মারা যান। তিনি ঘুমের মধ্যে গুলি বিদ্ধ হন। উনাকে শিলং হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। আমাদের ক্ষয়ক্ষতি যাই হোক উত্তর সুনামগঞ্জে গেরিলা যুদ্ধের তান্ডবে পাকসেনাদের ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠেছে। রণাঙ্গনে পাকসেনারা আধুনিক অস্ত্র ও যুদ্ধ কৌশলে আমাদের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও মনোবলে বিস্তর পিছিয়ে। তারা বেঁচে থেকে পাকিস্তান কায়েম করবে আর বাঙালির মাথায় পা রেখে রাজ্য শাসন করতে চায়। আমাদের দুর্বল অস্ত্র ও দুর্বল রণকৌশল থাকার পরেও দেশের টানে প্রাণ দিতে প্রস্তুত। দেশ স্বাধীনের পরে আমাদের মাদবরি করার ইচ্ছা নাই। তাই তো জয় সুনিশ্চিত। আমাদের এ’কয়দিনের জয়ে এলাকার জনগণের মধ্যে দেশ স্বাধীনের নব উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মনে আমাদের প্রতি আস্তা বেড়েছে। আমাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে ওনারা নব উদ্যোমে এগিয়ে আসছেন। প্রতি নিয়তই হতাহত হচ্ছেন। হতাহতের অসহায় পরিবারেগুলোর সাহায্য সহায়তায় কেউই এগিয়ে আসলেন কিনা অজানাই রয়ে গেল। সরকার ইচ্ছ করলেই আক্রান্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে পারেন। বেরিগাঁও ডিফেন্সে একদিন দুপুর বেলায় মোঃ মাহতাব নামে আমাদের একজন মুক্তিযোদ্ধা সম্ভবত তিনি এপিআর এর সদস্য ছিলেন, তিনি আমাদের দুই ব্যাংকারে মাঝে ফাঁকা জায়গায় বসে পাকসেনাদের বাঘমারা ডিফেন্সে টুইন্স মর্টারের গোলা ছুড়ছিলেন। আমি ব্যাংকার থেকে বের হয়ে ওনার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি ওনার বেখেয়ালে মর্টারের এঙ্গেল পজিশন নড়ে যাওয়ায় একটি বোমা গাছের পাতায় লেগে বিস্ফোরিত হয়। এতে ওনার শরীরে কয়েক টুকরা বোমের স্পৃন্টার ঢোকে পরে। উনার টু আইসি পাবলিক ছেলেটির শরীরেও একটি চোখ স্পৃন্টারে আক্রান্ত হয়। মাহতাব ভাইয়ের তেমন একটা সমস্যা হয়নি, বালাট হাসপাতল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েই ছেড়ে দেওয়া হয়। ছেলেটির চোখটা সম্পূর্ণ ভাবে সুস্থ্য হয়েছিল কিনা জানা সম্ভব হয়নি। আজ লিখতে বসে মাহতাব ভাই ও ছেলেটির কথা মনে পরে গেলো। ঐ ছেলেটি বেঁচে থাকলে হয়তো আমার মতো মুরুব্বী হয়ে গেছে। এমন হতাহতে অনেকের নাম ঠিকানা বয়সের ভারে মনে করতে পারছি না। তবে সেই সব হতাহতদের আফছা আফছা স্মৃতির পাতায় ভাসে। মুক্তিযোদ্ধের গল্প করার মতো সাথের লোকেরা না থাকায় সময় কাটছে না। রণাঙ্গনের আলোচনা করলেই দেহ মনে নতুন করে আলগা একটি শক্তির সৃষ্টি হয়। কয়দিন বাঁচারও সাধ জাগে। বছর উপর হয়ে গেলো মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতাও পাচ্ছি। আমি যুদ্ধাহত হয়েও আমার গাফিলতির কারণে সাধারণ ভাতা থেকেও বঞ্চিত ছিলাম।