রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার

পর্ব- ২৪
অক্টোবরের মাঝামাঝি ভোর সময়ে বেরিগাঁও ডিফেন্সে পাক সেনারা আক্রমণ করে বসে। আমাদের প্রতিটা পাকসেনাদের একজন করে পাহারায় রেখে বাকী সবাই ঘুমিয়ে ছিলাম। গুলির শব্দে তড়িগড়ি করে ঘুম থেকে ওঠি। আমরাও ফায়ার শুরু করি। গোলাগুলির এক পর্যায়ে আমাদের গোলাবারুদ প্রায় শেষ হয়ে যায়। এতে আমাদের সামনের তিনটি ব্যাঙ্কারের সবাই ব্যাঙ্কারে ছেড়ে পিছু হটতে বাধ্য হই। এই সুযোগে আমাদের তিনজনকে ধরে ফেলে। ওদের মধ্যে মোঃ তালেব মিয়া ও মোঃ আলাল মিয়ার নামটা শুধু মনে আছে। আরেক জনের নাম মনে করতে পারছি না। সুনামগঞ্জ শত্রু মুক্ত হওয়ার পরের দিন আহসান মারা ফেরির ধারে তালেব মিয়ার লাশ পাওয়া যায়। ধারণ করা হয় হানাদাররা সুনামগঞ্জ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পথে তাকে মেরে ফেলে রেখে যায়। বাকী দুই জানের আর কোন খবর পাওয়া যায়নি। মনের ভ্রমে আগের ঘটনা পরে উল্লেখ্য করলাম। বালাট থেকে যথারীতি গেরিলা যুদ্ধে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ভালই কাটছিল। আর সুস্থ্য দেহে মৃত্যুর মুখোমুখি থাকলে প্রাণে কল্পিক সুখ লেগেই থাকে এবং জীবনের কাছাকাছি থাকা যায়। এ যেন অন্যরকম সুখানুভূতি। এ পর্যন্ত কোন ঘটনায় দিন তারিখ উল্লেখ করে লিখতে পারিনি। কিন্তু ৫ নভেম্বর ভুলে যাওয়ার নয়। এই দিন রাত দুটোর সময় আমরা সতেরো জন নারায়ণতলা মিশনের ডান পাশ দিয়ে একটু অগ্রসহ হয়ে উৎপেতে বসে থাকি। ভোরের সামান্য আলো ফুটতেই পাক সেনাদের নড়াচড়া দেখতে পাই। ফায়ার শুরু করতেই ওরাও পাল্টা গুলি ছুড়ে। মূলত আমাদের এ্যাম্বুসের ভিতরে না ঢুকতেই আক্রমণ করাতে তা সামনা সামনি যুদ্ধে রূপ নেয়। প্রায় এক ঘন্টা গোলাগুলির পর ওদের একটি বোমা আমার সামনে বিষ্ফুরিত হয়। বোমার সেলের কয়েকটা টুকরা আমার বাম পেটের ও বাম হাতের কনুইয়ে ঢুকে পরে। তৎক্ষণাৎ আমার সাথীরা আমাকে ধরাধরি করে বালাট হাসপাতালে নিয়ে আসেন। প্রাথমিক চিকিৎসার পর শিলং হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয় হয়। রাতেই অপরেশন করে সেলের টুকরোগুলি খোলার পর কিছুটা আরাম বোধ করি। যাক অল্পতেই রক্ষা, পনেরদিন হাসপাতালে বেডে শুয়ে, ফেলে আসা রণাঙ্গনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সব কিছুই স্বপ্নের মতো মনে হয়েছে। গোলাগুলি শব্দ স্বপ্নে দেখে ঘুম থেকে আঁতকে ওঠি। তাড়াতাড়ি সুস্থ্য হয়ে পুন:রায় যুদ্ধে যেতে মনটা আনচান করে। রণাঙ্গনে শহীদ হয়ে যাওয়া সাথীদের মনে করে কষ্ট লাগলেও মনকে নিজেই সান্তনা দেই, পুরো পৃথিবীটাই একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং আজকের দিনে মন খারাপ করে লাভ কি। রণাঙ্গনের ধর্মের নড়াচড়া ছিল না বলেই একে অন্যের প্রতি মমত্ববোধ অটুট ছিল। ধর্মই বিভাজনের জন্ম দেয়। ধর্মই সংঘাতের সৃষ্টি করে। মোটামোটি সুস্থ্য হয়ে বালাট চলে আসি। পৌঁছেই দেখি এক তুঘলকি কান্ড। সেক্টর কমান্ডো বাহিনী, আমাদের ‘ডি’ কোম্পানীর কমান্ডারকে কোম্পানীর হেডকোয়ার্টার ভাতেরটেক থেকে হাত বাঁধা অবস্থায় গ্রেফতার করে নিয়ে আসেন। ধর্ষণ, হত্যা, লুটতরাজ সহ সকল অপরাধে অপরাধী তিনি। উনাকে একটি বড় গাছে বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। মুক্তিযোদ্ধা সকলকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে নিদের্শ দেওয়া হয়েছে একেক করে সবাই ওনার শরীরে সম্মানজনক স্থানে হাত দিয়ে আগাত করতে হবে। নির্দেশ মোতাবেক সকলেই আনন্দের সহিত কাজটি সম্পাদন করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক প্রকার শাস্তির গল্প শোনেছি। এমন বৈচিত্রময় নাটকীয় শাস্তির বিধান আগে কখও দেখিনি। ওনাকে ঐ দিনই বালাট থেকে শিলং পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শেষান্তে কি পরিণতি হয়েছিল জানতে পারিনি। এই দিকে উত্তর সুনামগঞ্জে গোলাগুলির তীব্রতাও কমে আসছে। বোমবিং এর বিকট শব্দ আর কানে আসছে না। হালকা পাতলা টহল ও টুকটাক নাম মাত্র গেরিলা যুদ্ধ চলছে। নিরাপদ দূরত্ব থেকে ঠুসঠাস করেই সময় কাটছে। তাই হতাহত থেমে গেছে। সবারই যুদ্ধের চেয়ে রেডিও শোনার একনিষ্ঠতা বেড়ে গেছে। উত্তর সুনামগঞ্জ রণাঙ্গনের চাঞ্চল্যকর খবর আকাশবাণী থেকে আর শোনা যাচ্ছে না। তবে অন্যান্য এলাকার রণাঙ্গনে যৌথ বাহিনীর দুর্ধর্ষ আক্রমণে পাকসেনাদের শক্ত ঘাঁটিগুলি তছনছ হয়ে যাচ্ছে। হানাদারদের মনোবলে ত্রাসের সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে মহেন্দ্রক্ষণ ৬ই ডিসেম্বরের সূর্য উদয়। ঐ রাতেই সুনামগঞ্জ শত্রুমুক্ত হওয়ার সংবাদ আসে। ৭ই ডিসেম্বর সকালে সুনামগঞ্জের দিক থেকে শ’ শ’ রাজাকার কালো পতাকা হাতে করে জয় বাংলা শ্লোগান দিতে দিতে মিছিল করে বালাট অভিমুখে আসছে। এই মহানন্দ রাখি কোথায়। মাত্র মাস কয়েক আগে পাকসেনার ও রাজকাররা শ্লোগান দিয়ে আমাদের ডিফেন্স দখল করেছিল। সেই রাজাকররা আজ পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে আত্মসমর্পণ করতে আসছে। এই বিজয় সর্বকালের, সর্বযুগের। লক্ষ লক্ষ প্রাণ ও অগণিত মা-বোনদের ইজ্জতের বিনিময় কে গর্বিত ও মহিমান্বিত করে তুলেছে। আমরাও বালাটকে শেষ প্রণিপাত জানিয়ে সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হই। আশার পথে পাকসেনাদের ডিফেন্স বাঘমারা এলাকাটা ভালো করে ঘুরে দেখলাম। ওদের ব্যাঙ্কারের আশেপাশে মেয়েদের ব্যবহৃত কাপড়-চোপড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখেছি। ব্যাঙ্কারের পাশে একটি ডুবায় এক যুবতীর মরদেহ পরে থাকতে দেখেছি। ঐ খানে কয়েকটি পরিবারকে হানাদাররা আটকে রেখেছিল। তাদের বুক ফাটা বক্তব্য শোনেছি। এই নিদারুণ কাহিনী আর লিখলাম না। মন থেকে বুঝে নেওয়ার অনুরোধ রইল। আমার এসএলআর এর সতেরোটি গুলি খায়েশি স্থানগুলোতেই ফুটিয়ে ফুটিয়ে আসছি।