রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব- ২৫
সুনামগঞ্জ পৌঁছেই জেলাখানায় চলে যায়। মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনাদের যৌথ অভিযানে বিভিন্ন রণাঙ্গন থেকে ১৪ জন পাকসেনাকে ধরে এনে জেলা কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তাদের সাথে কথা বলা ও আঘাত করা বারণ থাকা সত্বেও মনের ক্ষোভে প্রশ্রাব হাতে নিয়ে ওদের ওপর ছুঁড়ে মারলাম। এতে একজন নেতৃত্ব স্থানীয় ব্যক্তির গালগাল শুনেছি। তবে যুদ্ধ শেষে এইটুকু প্রতিয়মান হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামটি আমরা সাধারণ সৈনিকদের কাছে যতটুকু বেদনাদায়ক ও হৃদয় বিদারক লাগছে নেতৃত্বস্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণে ততটুকু লাগেনি। আর রণাঙ্গণে হতাহত হয়েছি সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারাই বেশি। আট তারিখে ‘সি’ কোম্পানীর সবাই পাগলা ডাক বাংলা ও হাই স্কুলে অবস্থান নিই। হানাদাররা তখন গোবিন্দগঞ্জে। ডাকবাংলাতে এসে রাজাকাররা দলে দলে আত্মসমর্পন করেছে। পাগলা চিকারকান্দি গ্রামের, বালাট কয়েদখানা থেকে পালিয়ে আসা রাজাকারকে খোঁজতে আমরা তার বাড়িতে গিয়েও দেখা পাইনি। সে কোন ফাঁকে আত্মসমর্পন করে চলে গেছে। তবে পাগলা কয়েক দিন থাকাকালীন পাকিস্তান প্রিয় ইয়াসিন মৃধার বাড়িতে কয়েক বার গিয়েছি। পাগলা এলাকার রাজাকাররা যুদ্ধের সময় দাপটের সঙ্গেই পাগলামো করেছে। আমরা ১৬ই ডিসেম্বর সিলেট আলিয়া মাদ্রাসায় গিয়ে উঠি। এই রাস্তাটুকু পায়ে হেঁটে গিয়েছি। পুরো রাস্তাটি হানাদারদের দখলে ছিল। এলাকার নির্যাতিত মানুষেরা আমাদের হাত ধরে অনুরোধ করেছেন, রাজাকারদের কীর্তিকলাপ দেখার জন্য। কমান্ডারের বাধার কারণে তা আর হয়ে উঠেনি। ঐ এলাকায় রাজাকাররা ধর্ষণ, হত্যা, লুন্ঠন যথেষ্ট করেছে। রাস্তায় কয়েক জন রাজাকারদের সাথে দেখাও হয়েছে। কিন্তু তাদেরকে কটুকথা বলা ও কর্তৃপক্ষের বারণ আছে। মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকার যেন একাকার হয়ে গেছে। ওসব ভেবে রাতে আর ঘুম হলো না। ভোর হতে না হতেই আমরা কয়েকজন টিলাগড়, মেজরটিলা বিমানবন্দর এলাকায় হানাদারদের ব্যাঙ্কারের চারপাশে ঘোরে দেখে বুকটা কেঁপে উঠে। ওই সময় ওই সব এলাকায় যেতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে গিয়েছি। হানাদারদের মাইন পুঁতে থাকার ভয়ে একটু সাবধানে এগোতে হচ্ছে। ১৫ তারিখেই যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে, ক্ষতবিক্ষত দেহের অগণিত মেয়েকে ঐ এলাকা থেকে উদ্ধার করেছেন। আমরা ওখানে যুবতীদের কঙ্কাল ও পচা গলা লাশ দেখতে পেয়েছি। মাথার চুলে নারী কঙ্কাল চিনতে ভুল হইনি। এসব মেয়েদের তাদের মা বাবার কাছ থেকে তুলে এনেছে রাজাকাররা। এক কথায় রাজাকারদের কোন ধর্মই ছিল না। ধর্মের দোহাই দিয়ে দেশের মানুষকে কাবু করতে চেয়েছে। মুসলিম মেয়েদেরকে আওয়ামীলীগার বানিয়ে ধর্ষণ করেছে। হায়েনাদের নখের আচড়ে কুকড়ে যাওয়া হতভাগা নারীদের বুক ফাটা আর্তনাত, হায়েনাদের শক্তির ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। যে সব মেয়েরা পাক অফিসারদের রক্ষিতা হিসাবে ছিল তারই সুস্থ্য দেহে মুক্তি পেয়েছে। শালোটিকর এলাকায় গিয়ে দেখলাম ওখানের রাজাকাররা দুবর্ৃৃত্তায়নের অভয়ারণ্য কায়েম করেছে। ঐ এলাকায় যুবতীদের মদ খাইয়ে নেশা করিয়ে নৃত্যের আসর জমিয়েছে। জোরপূর্বক উলঙ্গ অবস্থায় নাচতে বাধ্য করেছে। অনেক মেয়েকে অবাধ্যতার কারণে গলায় পাথর বেধে নদীর জলে ফেলে দিয়েছে। কয়েকটি লাশ নদীর কিনারায় শিয়াল কুকুরে খেতেও দেখেছি। ঐ এলাকাটা সিলেট শহরের বাহিরে থাকায় রাজাকাররা নির্বিঘেœ কুকর্ম হজম করতে পেরেছে। তবে পাক সেনাদের মনোরঞ্জনের ঘাটতি না পড়লেই রাজাকারদের সাতখুন মাফ। এই নির্যাতিত নিপীড়িত মা বোনদের আর্তচিৎকার বিশ^ বিবেককে নাড়া দিয়েছে। আমার সাথীরা যারা শহীদ হয়েছেন, তারা সত্যই পূন্যবান। আমার মতো কম হজমী মনের যারা বেঁচে আছি, কেবল রাজাকারদের হাসিখুশি জীবন দেখার জন্য। পাকসেনাও রাজাকারদের নারী নির্যাতনের বিভৎস্য ঘটনা গুলো যখন চোখে ভাসে তখন নিজেকে সামলিয়ে নিতে কষ্ট হয়। দেশ পরিচালনা যারা করেন আটচল্লিশ বছর পরেও ওনাদের মন থেকে পাকিস্তান প্রীতিটা মুছে যায়নি। আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ না হলে পরিতাপের পরিসমাপ্তি ঘটবে না। অনেক রাজাকার দেশে থেকে জনকল্যাণে নিজের পক্ষে যতই সাফাইগাক না কেন, মানবতা বিরোধী অপরাধ কম বেশি হতে পারে। তবে জঘন্য অপরাধে সকাল রাজাকারের মৌলিক নীতি এক ও অভিন্ন। সিলেট তিন চারদিন অবস্থান করে আলিয়া মাদ্রাসাতে অস্ত্র জমা দিয়ে দিরাই থানাধীন নিজ গ্রাম খাগাউড়া চলে আসি। মাস কয়েক এলাকাতে মুক্তিযোদ্ধারাই মায়মাদবরী করেছি। বহু বছর অতিক্রান্ত হলেও জামালগঞ্জে একাত্তরের মর্মস্পর্শী নেশাটা মন থেকে মুছে দিতে পারিনি বলে ১৯৮৯ সালে বালু পাথরের ব্যবসার সুযোগে জামালগঞ্জের সাচনা বাজারে আসা। এখানে এসে আমার আগের উদ্যোম ও মনোবল প্রায় শূন্যর কোটায় এসে দাঁড়িয়েছে। এক সময়ে রণাঙ্গনে আমার শব্দে হানাদাররা নড়েচড়ে বসতো। সেই আমি এখন পাতি ছিচকা মাস্তানদের তোয়াজ করে চলি। আমাকে কখনো সংখ্যালঘু, কখনো হিন্দু মুক্তিযোদ্ধা, কখনও বা দিরাইর তালিকা মুক্তিযোদ্ধা বলে কিছু মানুষের কুদৃষ্টি আমার স্বাভাবিক জীবনকে অতিষ্ট করে তুলে। মৃত্যুঞ্জয়ী দেহে মৃত্যু আতঙ্ক ভর করেছে। বছর দেড়েক আগে জামালগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার মহোদয়ের বরাত দিয়ে সাচনা বাজারে মাইকিং করা হয় এই মর্মে, জামালগঞ্জ উপজেলায় কোন রাজাকার থেকে থাকলে, তাদের তথ্য দিতে সর্বস্তরের জনগণকে বিশেষ ভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। মাইকিংটি শোনে ভাবলাম জামালগঞ্জের কুখ্যাত রাজাকাররা হয়তো দুর্ভেদ্য প্রাচীরে আশ্রীত। তা ডেপুটি কমান্ডার মহোদয়ের জানার কথা নয়, উনার চোখ আছে ঠিকই, তাও বুঝি দৃষ্টিহীন।
আমার চোখ ও ঝাপসা হয়ে আসছে, দৃষ্টিহীনতা আসন্ন। রাত্রী যতই দীর্ঘ হোক না কেন প্রভাত একবার হবেই। তবে জীবনের বেলায় প্রবাদটির কোন মিল খুঁজে পাচ্ছি না। রাজাকাররা যে ভাবে দাপটের সহিত সুখ সাচ্ছন্দ্যে বহাল তবিয়তে আছে। বলা যেতে পারে, চিরসুখি সে, বিবেকহীন যে। এই প্রবাদটির মিল পাওয়া যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সকল মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে আকুল আবেদন আপনি মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনও করা হয়। তবে মুক্তিযোদ্ধার জীবদ্দশায় যাতে রাস্তাঘাটে চলাকালে কোন মুক্তিযোদ্ধকে দেখা মাত্রই সম্মান জানান। এমনকি অফিস আদালতে গেলেও অফিস কর্মকর্তাগণ দাঁড়িয়ে যেন সম্মান প্রদর্শন করেন। আমার আবেদনটি বিবেচনা করতে সদাশয় সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করি। আমার অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটির জন্য সুহৃদ পাঠকদের প্রতি ক্ষমাপ্রার্থী।