রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব- ০৯
ভোর হতে না হতেই মেজর জি স্যুজা (কালামেজর) পিস্তল ও বেত হাতে, আমাদেরকে কয়েদখানা থেকে বাহিরে আনার হুকুম দেন। সাথী বন্ধুরা ও সবাই এই করুন ঘটনা দেখার জন্য ভীড় জমান। আমরা বের হতেই গালাগালি শুরু করলেন। তিনি কামড়ে খাবেন নাকি গুলি করে হত্যা করবেন, তিনি ভেবেই পাচ্ছিলেন না। সুনামগঞ্জের গোলাম রব্বানী সাহেব সিলেটের সিরাজ সাহেব দিরাই চন্ডীপুরের মহি উদ্দিন সাহেব সহ সকল নেতৃবৃন্দ আমাদেরকে হিন্দীতে কিছু বাড়তি গালাগাল দিয়ে মেজর ডি স্যুজাকে অনেকটা শান্ত করেন এবং সকল নেতৃবৃন্দ কালা মেজরের সাথে পরামর্শ করে আমাদের ব্যপারে একটি সিদ্ধান্তে উপনিত হন। সিদ্ধান্ত এই, পাক সেনাদের বাঘমারা ডিফেন্সে প্রত্যেকে একটি করে গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে হবে। নিক্ষেপের পর কালা মেজর তদন্ত করে জানবেন নিদৃষ্ট স্থানে নিক্ষিপ্ত হয়েছে কিনা। যদি নির্দেশ মতো কাজ না হয়, পরের টা পরে দেখা যাবে। প্রত্যেককে একটি করে গ্রেনেড দেওয়া হয়। আমরা সাথি ভাইদের সাথে হাত মিলিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর উদ্দ্যোশে রওনা হই। কারণ হানাদারদের গোয়েন্দারা সব জায়গায় লেগে থাকতো। প্রকাশ্যে যুদ্ধক্ষেত্রের এমন রায় প্রকাশ করায় হানাদাররা সতর্ক হওয়ার সম্ভবনা বেশি। বালাট থেকে বাঘমারার দূরত্ব প্রায় পাচঁ মাইল। এই দুর্গম রাস্তাটি অতিক্রম করতে অনুমান চার ঘন্টা সময় লেগেছিল। ওদের মুষলধারে গোলাগোলীর জন্য মাথা সোজা করার সুযোগ নাই। প্রায় এক মাইল রাস্তা ক্রলিং করে গিয়েছি। তাদের ব্যাঙ্কারের প্রায় বিশ গজ দূর থেকে সবাই এক সাথে বারটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করি। তাদের পাল্টা বোমা ও গুলিতে ডিফেন্সের সামনা আলোকিত হয়ে পড়ে। ক্রলিং করে অগ্রসর হতে ধানের গোচা ও কঁচু গাছে ধরে টান দিলে গোচা উপড়ে যায়, কিন্তু শরীর আগায় না। এই মধ্যে রাজেন্দ্র ও শাহিন মিয়া আহত হয়। রাজেন্দ্র বর্তমানে দিরাই থানার দুর্গাপুর গ্রামে মোহন্তটীকা নিয়ে বৈরাগ্য সাধন করছে। দুজনেরই হাঁটুর নিচে গুলি লেগেছিল। লুঙ্গি ছিঁড়ে ভালো করে বেঁধে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই শত্রুর গোলাগোলীর তোপ থেকে বাচঁতে ওদের ডিফেন্সের পিছন দিকে চলে যাই এবং একটি বাশঁঝাড়ে লুকিয়ে থাকি। এদিকে রাতও শেষ, অতএব গোলাগুলি ও কমে আসছে। এই ফাঁেক কোন ক্রমে বালাট এসে পৌঁছি। এই আহত দুই জন, কিছুদিন আগে হায়েনাদের ডিফেন্সের পাশ থেকে তাদের একটি ঘোড়া নিয়ে আসছিল। আজ তারা হাসপাতালে ভর্তি। তবে দুই জন আহত হওয়ায় কালা মেজর সন্তোষ্ট হতে পারেন নি। তিনি সবারেই মৃত্যু কামনা করেছিলেন। আজ আমি মনে মনে ভাবি আমিকি সত্যই পরম ব্রহ্মার অমরত্ব বর পেয়ে বেচেঁ গেছি। আমরা দুই দিন বিশ্রাম নেওয়ার পর তৃতীয় দিন মেজর ডি স্যুজা নির্দেশ দিলেন, সুনামগঞ্জের মালদার ভাইয়ের নেতৃত্বে কাঠাল বাড়ি এলাকায় এ্যাম্বোস করতে যেতে হবে। আমরাা বারো জন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়ার অপরাধে এই দোষ আর খন্ডন হচ্ছে না। কিন্তু মালদার ভাই এর চেয়ে অনেক অনেক অপরাধের দোষি সাব্যস্ত হয়ে আছেন। মেজর ডি স্যুজা উনাকে শুধু হুমকি ধমকি দিয়েছেন, কোন প্রকার সাজা দেননি। কারণ মালদার ভাই আমাদের চেয়ে ডাকসাইটে দুঃসাহসি ছিলেন। যুদ্ধের ময়দানে একটু আধটু ভয় ভীতি তো সবাইর থাকে। মেজর মহোদয়ও এর বাহিরে নন। আমরা চৌঁদ্দ জন কাঠাল বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেই, সাথে এলএমজি, এসএলআর, রাইফেল ও গ্রেনেড। রাস্তা চিনানোর জন্য সঙ্গে গেলেন ঐ এলাকার একজন সাহসি যুবক। আমাদের কাছে খবর আছে ঐখানে পাক সেনারা নির্বিঘেœ চলাফেরা করে। কিন্তু মেজরের নির্দেশ অপেক্ষা করাও সম্ভব নয়। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেই আমাদের বাচাঁর উৎস খোঁজা। আর মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত আমাদের শান্তি মিলবে না, তা স্পষ্ট বুঝে গিয়েছি। কাঁঠাল বাড়ির কাছে গিয়েই পাক সেনারদের আস্তানায় এক সাথে চৌদ্দটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করি, সাথে গুলিছুড়তে ও আরম্ব করি। এর পরই শুরু হয় ওদের গোলাগুলির তান্ডব। আমাদের টিকে থাকা আর সম্ভব হচ্ছে না। তবে ওদের গোংরানীতে মনে হয়েছে গ্রেনেডের আঘাতে কয়েক জন হতাহত হয়েছে। এই শান্তনা নিয়েই ওদের গোলাগুলির তোপ থেকে বাচাঁর জন্য দৌড়াতে দৌড়াতে একবারে পাহাড়ের পাদদেশে এসে পৌঁিছ। পূবের আকশ ফর্সা হয়ে গেছে, স্থানীয়রা গরু ছাগল ছেড়ে দিয়েছে ঘাস খেতে। বড় সড় একটি খাসিকে ধরে গোদিরগাঁও একটি বড় বাড়িতে ওঠি। মাংস ভাত রান্না করে খাওয়া দাওয়া শেষেই বালাট আসি। একদিন পর কালা মেজরের কাছে খাসি খাওয়ার খবর আসে। আমরা নাকি জোর করে খাসি ধরে খেয়েছি। তিনি আামদেরকে ডেকে পাঠান ও খাসির ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আমরা বলি একজন সুহৃদয় ব্যক্তি খুশি হয়ে খাসিটি দান করেছেন। আমাদের কথা তিনি বিশ^াস না করে খাসি দাতা মালিককে ডেকে আনার জন্য আমরা দুই জনকে পাঠান। আমরা কান্দাগাঁও থেকে একজন ফরেজগার মুরুব্বির হাতে পায়ে ধরে খাসির মালিক হিসাবে দাঁড় করাই। তিনি কালা মেজরের কাছে দানের মাহাত্ম্য দিয়ে একটি সুস্পষ্ট বয়ান পেশ করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদেরকে তিনি প্রাণদিক ভালোবাসেন বলে খাসিটি দিয়েছেন। উনার স্ত্রী অসুস্থ বিধায় নিজ বাড়িতে রান্না করে খাওয়াতে পারেননি বলে দুঃখ প্রকাশ করেন। শেষান্তে মেজর মহোদয় ও আমাদেরকে সন্দেহ করার জন্য দুঃখিত হন। আমরা ও বুক টান করে বললাম দেশের জন্য যুদ্ধ করতে এসেছি, মিথ্যে বলা আমাদের ধাতে সয় না।