রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব -০১

১৯৭১ এর ২৫ শে মার্চ রাত থেকে সারা দেশে পাক সেনাদের নৃসংস তান্ডবলীলা চললেও আমাদের গ্রামাঞ্চলে এর প্রভাব খুব একটা পড়েনি। দল বেঁধে উঠানে বসে রেডিওর খবর শুনে শুধু গালগপ্প করেই সময় কাটানো। কারো মনে কোন উদ্বেগ উৎকন্ঠা বা আতঙ্কের ছাপ পড়েনি। সারা গ্রামে মাত্র তিনটা রেডিও ছিল। সন্ধা হলেই সবাই রেডিওর বাড়িতে গিয়ে ভাব জমাতাম। আর এ যেন আমাদের নিত্য দিনের তামাশা। এই বিভীষিকাময় ভয়াবহের পরিনাম মোটেও আচঁ করতে পারি নাই। এপ্রিলের মাঝামাঝি চৈত্র মাসের একেবারে শেষে কিশোরগঞ্জ ও শরারচড়ে পঞ্চাশ ষাটটি পরিবার পাক সেনা ও তাদের দোসরদের অতর্কিত হামলার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে রাতের আঁধারে পালিয়ে আমাদের খাগাউড়া গ্রামটিকে নিরাপদ ভেবে আশ্রয় নেন। সাড়ে চারশত পরিবারের গ্রামে অনেক বড় বড় বাংলো ঘর থাকা সত্ত্বেও মুরুব্বিরা সর্বহারা মানুষদের গ্রামের মধ্যে আশ্রয় দেননি। অদেরকে আশ্রয় দিলে আমাদের গ্রামও আক্রান্ত হতে পারে এমন আলোচনাও শুনাগেছে। কারণ পাক সেনাদের কাছে এসব খবর পৌছাঁতে আমাদের সাত মাইল দক্ষিণে শামারচরের খালেক মিয়া দালাল ও আট মাইল উত্তরে জামালগঞ্জে লাল মিয়া দালালের আস্তানা রয়েছে। তারাই পাক সেনাদের খাস লোক। তাদের দ্বারা যেকোন সময় বিপদের আশংকা। তাই গ্রামের ভবিষৎ ভেবে গ্রামের উত্তরের মাঠে শরণার্থীদেরকে সাত দিন থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। উনারা মাঠের মধ্যে তাবু ও খড়ের ঘর বানিয়ে থাকতে শুরু করেন। ওদের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় জানা যায় হায়েনা ও তাদের দোসররা দিন দুপরে হঠাৎ তাদের বাড়ি ঘরে আক্রমণ করে আগুন জ¦ালিয়ে দেয়। এবং সুন্দর সুশ্রী পনেরজন যুবতী মেয়েকে তুলে নিয়ে যায়। লুট-পাট অব্যাহত রেখে কয়েক জনকে গুলি করে হত্যা করে। এদের কাছ থেকে আরো জানা যায়, যেসব যুবতীকে তারা সাথে নিয়ে আসতে পেরেছে তারাও হায়েনাদের নখের আচড়ে আক্রান্ত। কোনক্রমে রাতের আঁধারে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের গ্রামে এসেও একজন যুবক ও অর্ধ বয়ষ্ক ব্যক্তি মারা গেছেন চিকিৎসার অভাবে। এই দুই জন তাদের হাতে আঘাত প্রাপ্ত হলেও চিকিৎসনা পাননি। আমরা প্রতিদিনই উনাদের সাথে কথাবার্তা বলতাম। হানাদাররা তাদের বাকশক্তি প্রায় রূদ্ধ করে দিয়েছে। উনাদের এখন বড় দুশ্চিন্তা। ভালয় ভালয় ভারতে পৌঁছাতে পারলেই শান্তি। যে পনেরটি মেয়ে হায়েনাদের হাতে তুলে দিয়ে এসেছে সেই পরিবারগুলির সবাই ভয়ভীতি ঝেড়ে ফেলে বাচাঁ মরা দুটোই ইশ^রের হাতে শপে দিয়েছেন। বাকী মেয়েদেরকে রক্ষা করতেই এতদূর পর্যন্ত আসা। বাকী রাস্তাটোকু অতিক্রম করতে আবারো লম্পটদের কবলে পরলে প্রাণ হনন ছাড়া তাদের কাছে আর কিছু পাবে না। তাই সাত দিনের মাথায় আমাদের এখান থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। ওরা চলে যাওয়ার পর ওদের এতো লাঞ্ছনা দেখেও গ্রামের মানুষ বলাবলি করছেন এমন করুণ অবস্থায় আমাদের পড়তে হবে না। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পাক হানাদাররা কখনই আসবে না। তবে ওদের দুঃখ দুর্দশা আমরা যুব সমাজের মনে জ¦লন্ত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দশাও যে ওদের মতো হবে সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হয়ে গেছি। আকাশবাণী কলকাতা থেকে দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায় উত্তেজনাপূর্ণ যুদ্ধের খবর ও আলী রেজা চৌধুরীর চুটকী শুনে আমাদের মধ্যে চরম উত্তেজন সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েক জন মুক্তিযুদ্ধে চলেও গেছেন। আমার মার প্রচন্ড বাধার কারণে আমি একটু থমকে গেছি। তবে আমার পিতৃব্য নিমাই বাবু আমাকে উৎসাহ জুগিয়েছেন। কয়েক দিন থেকে যাওয়া বাস্তহারা মেয়েদের কাছ থেকে হায়েনাদের বিভৎস কুকর্মের কাহিনী জেনে গ্রামের যুবতীদের মধ্যে জিঘাংসার আগুন জ¦লে ওঠেছে। যে জন্য গ্রাম থেকে বিয়াল্লিশ জন যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। যুবতীরাও মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে। কিন্তু মুরুব্বিদের প্রবল বাধা অতিক্রম করে তাদের আর যুদ্ধে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। একটি কথা ভুলেই গেছি আমাদের গ্রামে আশ্রিতদের মধ্যে একজন ভদ্রমহিলা পদাবলি কীর্তন ও পালাকীর্তন খুবই ভালো গাইতেন। প্রতিদিন সন্ধায় তিনি আরতি করতেন সুললিত কন্ঠে। ওনার মোহনী সুরের টানে সন্ধ্যার সময় ওনাদের ওখানে দল বেঁধে চলে যেতাম। পরে জানলাম তিনি একজন সুনামধন্য কীর্তানীয়া। যে যুবকটি আমাদের এখানে মারা গিয়াছে ওই হতভাগা যুবকই ভদ্র মহিলার ভাইয়ের ছেলে। গ্রামের মুরুব্বিরা অনেক কাকুতিমিনতি করে উনাকে দিয়ে নিমাই সন্যাস পালাটি আমাদের আখড়ার নাটমন্দিরে পরিবেশন করান। তিনি এতো দরদ দিয়ে পালাটি গেয়েছিলেন, নিমাই দাঁড়ারে… সুরের তানটি আজো হৃদয়ে বেঁধে আছে। আমি ওই গানটি শুনার জন্য শরণার্থী শিবিরে উনাকে অনেক খুঁেজছি। ঠিকানাও পেয়েছিলাম, কিন্তু দেখা হয়নি। মহামারি কলেরায় এই সুরস¤্রাজ্ঞী ধর্মপনা নারীকে স্বর্গবাসী করে দিয়েছে। আর আমি অকালকুষ্মা-কে বহু রং তামাশা করেছেন, কিন্তু চিরতরে তুলে নিতে নারাজ। হয়তো বা এই লোমহর্ষক ঘটনাগুলি লিখার জন্য আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। (চলবে)
লেখক: যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা।