রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর প্রেম

মনোরঞ্জন তালুকদার
২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন। কবিগুরুকে নিয়ে নানামুখী আলোচনা হবে আজ সর্বত্র। আমি গুরুদেবের জীবনের কম আলোচিত একটি বিষয় নিয়ে দুটি কথা বলতে চাই। কম আলোচিত বিষয় নিয়ে আলোচনা অনেক নিরাপদ ভেবেই এই দুঃসাহস দেখালাম।
রবীন্দ্রনাথকে বলা হয়, প্রকৃতি ও প্রেমের কবি। যে রবির কিরণ প্রভায় বাংলা সাহিত্য বিশ্ব সাহিত্যঙ্গনে আলোকিত, যাঁর সাহিত্য কর্মে প্রেম এসেছে নানা মাত্রায় নানা আংগিকে, যা প্রেমিক হৃদয়কে আকুল করেছে ব্যাকুল পিয়াসে,তাঁর কাব্যে বিধৃত প্রেম কি কেবলই কবি কল্পনার আবেগ মথিত শব্দের প্রকাশ নাকি যাপিত জীবনের পরতে পরতে সঞ্চিত অভিজ্ঞতার শৈল্পিক প্রকাশ?
মার্কিন ঔপন্যাসিক ও সমালোচক হেনরি জেমস লিখেছেন, একজন কবি বা সৃজনশীল সাহিত্যিক যা কিছু লিখেন তার প্রতিটি পঙক্তিতে নিজের কথাই লিখা থাকে।
তাহলে রবীন্দ্র সাহিত্যে এত গভীর ভাবে নিবেদিত ও সমর্পিত ভালবাসা কার উদ্দেশ্যে? কারা রবীন্দ্রনাথের মানস কন্যা? বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে যাঁর দানে, বাঙালির মানস নতুন করে বিনির্মাণ করেছেন, যিনি সেই কবির ব্যক্তি মানসকে প্রভাবিত করেছিলেন তিনি কে? রবীন্দ্রনাথের জীবনে প্রেম ক’বার এসেছিল? তাঁর জীবনে আসা সকল প্রেমই কি নীরবে এসেছিল -এই কৌতুহল রবীন্দ্র গবেষকদের কাউকে কাউকে তাড়িয়ে ফিরেছে। অনেকেই বিস্তারিত ভাবে রবিপ্রেম নিয়ে আলোচনা করেছেন। এখানে স্থানাভাবের কথা বিবেচনা করে খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা করা হলো। আগ্রহী পাঠকবৃন্দ রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাদম্বরীদেবীর সুইসাইডাল নোট, মুহাম্মদ জমির হোসেনের রবীন্দ্র জীবনে নারী, গোলাম মুরশিদ এর লিখা ভালবাসার কাঙ্গাল রবীন্দ্রনাথ, শঙ্খ ঘোষের ওকম্পোর রবীন্দ্রনাথ, প্রশান্ত পালের রবিজীবনী- বইগুলো পড়ে দেখতে পারেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, রবীন্দ্রনাথ যেমন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তেমনি দেখতে ছিলেন সুদর্শন। তাই অগণিত নারী তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। তেমনি একজনের নাম হেমন্ত বালা রায় চৌধুরী। রবীন্দ্রনাথ কে একটি চিঠিতে হেমন্ত বালা লিখেন,
“আপনি আমার দেবতা, আমার কল্পলোকের রাজা। আমার দুর্ভাগ্য যে, আমার পূর্ণ পূজা আপনার চরণে দিতে পারছি না। আপনি কি আমার মন দেখতে পারছেন না”?
এমনি করেই অসংখ্য নারীর প্রেমেই হয়ত অন্তরেই গুমরে মরেছে। কিন্তু কিছু কিছু নারী রবীন্দ্র মানসকেও গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। তন্মধ্যে কাদম্বরী দেবী ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর নাম অধিক পরিচিত। তাছাড়া আরো বেশ কজন নারী নানা সময়ে রবীন্দ্রনাথের জীবনে এসেছিলেন। যাদের কথা সংক্ষিপ্ত ভাবে আলোচিত হলো।
কাদম্বরী দেবী ছিলেন তাঁর বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের খেলার সাথী। তা ছাড়া তাঁর লেখার প্রথম পাঠিকা ও সমালোচকও ছিলেন তিনি। যদিও তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে এক বছর নয় মাসের বড় ছিলেন কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যেই স্নেহের প্রত্যাশী রবীন্দ্রনাথ ও হীনমন্যতায় কাতর ও নিঃসঙ্গ কাদম্বরী দুজন দুজনের আপন হয়ে উঠলেন। বালক রবি স্কুল থেকে ফিরেই তার ঘরে উপস্থিত হতেন। কৈশোরে পৌঁছাতেই তাদের বন্ধুত্বের চরিত্র কিছুটা বদলাতে শুরু করলো। ভালোলাগা ভালবাসাতে রূপান্তরিত হয়ে নানা পর্যায়ে নানা রূপে প্রকাশ পেতে শুরু করলো। “ভগ্নহৃদয় কাব্য” তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বউদি কাদম্বরী দেবীকে একটি কবিতার মাধ্যমে- তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা।
১৮৮৩ সালের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা “ভারতী” তে রবীন্দ্রনাথের উচ্ছ্বাসপূর্ণ একটি লিখা প্রকাশিত হয়। যা পরে ঠাকুর বাড়িতে কিছু সমস্যার সৃষ্টি করে বলে শুনা যায়।
লিখাটি ছিল,
“সেই জানালার ধারটি মনে পড়ে, সেই বাগানের গাছগুলি মনে পড়ে, সেই অশ্রুসিক্ত আমার প্রাণের ভাবগুলিকে মনে পড়ে। আর একজন আমার পাশে দাঁড়াইয়া ছিল, তাহাকে মনে পড়ে, সে যে আমার খাতায় আমার কবিতার পার্শ্বে হিজিবিজি কাটিয়া দিয়াছিল সেইটা দেখিয়া আমার চোখে জল আসে। সেই ত যথার্থ কবিতা লিখিয়াছিল। তাহার সেই অর্থপূর্ণ হিজিবিজি ছাপা হইল না , আমার রচিত গোটা কতক অর্থহীন হিজিবিজি ছাপা হইয়া গেল”।
১৮৭৮ সাল্রে বিলাত যাবার পথে ইংরেজদের সংস্কৃতি ও তাদের রীতিনীতি শেখার জন্য রবীন্দ্রনাথ আগস্ট মাসে সাত আট সপ্তাহ মোম্বাইয়ে আত্মারাম এর বাসায় অতিথি হিসেবে থাকেন। আত্মারামের ছোট মেয়ের নাম আনা তরখড়। তার উপর দায়িত্ব পড়লো রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজ রীতিনীতি শেখানোর। আনা ছিলেন রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বয়সে কিছুটা বড়। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রেমে পড়ে যান। বিদুষী আন্না কবির কাছ থেকে ভালবেসে একটি ডাকনাম চেয়েছিলেন। কবি নলিনী নামটি তাকে দেন। এই নাম পেয়ে মারাঠী কন্যা আন্না বলেছিল, কবি তোমার গান শুনলে আমি বোধহয় আমার মরণদিনের থেকেও প্রাণ পেয়ে জেগে উঠতে পারি।
অন্যদিকে নলিনীও রবীন্দ্রনাথের জীবনে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিলেন। কবির রচিত বহু কাব্য-কবিতা-নাটকে এই নামের উল্লেখ্য পাওয়া যায় এই কারণেই। তাছাড়া আনা ও কবির মধ্যে সম্পর্ক কিভাবে কতোটা গড়ে উঠেছিল তা তিনি ঘরোয়া আলাপচারিতায় ধূর্জটিপ্রসাদ, অতুলপ্রসাদ ও দিলীপ রায়ের কাছে বলেছিলেন।
“আমার সঙ্গে সে প্রায়ই যেচে মিশতে আসত। ঘুরত আমার আনাচে কানাচে । আমাকে বিমর্ষ দেখলে দিত সান্ত¦না, প্রফুল্ল দেখলে পিছন থেকে চোখ টিপে ধরত। এ কথা আমি মানব যে আমি টের পেতাম ঘটবার মত একটা কিছু ঘটছে…………………।(রবিজীবনী, দ্বিতীয় খন্ড, প্রশান্ত পাল)
ব্রাইটনে অবস্থান কালে রবীন্দ্রনাথ অতিথি হিসেবে ডাক্তার জন স্কটের বাড়িতে থাকা কালীন তিনি কবির চেয়ে ছয় বছরের বড় ডাক্তার স্কটের কন্যা লুসির প্রেমে পড়েন।
“এই পরিবার আর লুসির সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতার দুটি তথ্য পাওয়া যায়। একবার যখন এই পরিবারের কাছ থেকে রবীন্দ্রনাথ বিদায় নিলেন, অন্যটা যখন ১৮৯০ সালে তিনি দ্বিতীয়বার বিলেতে গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করার জন্য আকুল হয়ে সেই পুরানো বাড়িতেই ফিরে গেলেন। কবির ডায়েরি থেকে জানা যায় ১৮৯০ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর তিনি যান তার বহু স্মৃতিবিজড়িত ডক্টর জন স্কটের বাড়িতে । সেখানে গিয়ে শুনলেন, স্কট পরিবার সেখানে আর থাকেন না। তারা চলে গেছেন দক্ষিণ লন্ডনের উপকন্ঠে। কবি তখনকার মনের অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবেÑ
ভারী নিরাশ হৃদয়ে আমার সেই পরিচিত বাড়ি থেকে বেরোলুম। মনে কল্পনা উদয় হলো, মৃত্যুর বহুকাল পরে আবার যেন পৃথিবীতে ফিরে এসেছি। আমাদের সেই বাড়ির কাছে এসে দ্বারীকে জিজ্ঞাসা করলুম আমার সেই অমুক এখানে আছে তো? দ্বারী উত্তর করলো , না সে অনেক দিন হলো চলে গেছে। তবে তো সেই সমস্ত জানা লোকের কেহ কারও ঠিকানা খুঁজে পাবে না। জগতের কোথাও তাদের আর নির্দ্দিষ্ট মিলনের জায়গা রইলো না ——(রবিজীবনী তৃতীয় খন্ড- প্রশান্ত পাল)
রবীন্দ্রনাথ কি ইন্দিরা দেবীর প্রেমেও পরেছিলেন? রঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের তথ্য ও বিশ্লেষণ থেকে মনে হয়, ভালবাসার অঙ্কুর দেখা দিয়েছিল কবির হৃদয়ে। ইন্দিরাকে লিখা কবিগুরুর একটি চিঠি
“ এসব শিষ্টাচার আর ভাল লাগে না। আজকাল প্রায় বসে বসে আওড়াই ‘ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন’। বেশ একটা সুস্থ সবল উন্মুক্ত অসভ্যতা। বিচার আচার বিবেক বুদ্ধি নিয়ে কতকগুলো বহুকেলে জীর্ণতার মধ্যে শরীর মনকে অকালে জরাগ্রস্ত না করে দ্বিধাহীন চিন্তাহীন প্রাণ নিয়ে খুব প্রবল জীবনের আনন্দ লাভ করি। মনের সমস্ত বাসনা ভাবনা, ভালোই হোক মন্দই হোক, বেশ অসংশয় অসংকোচ এবং প্রসস্ত প্রথার সংগে বুদ্ধির, বুদ্ধির সঙ্গে ইচ্ছার, ইচ্ছার সঙ্গে কাজের কোন রকম অহর্নিশ খিটমিট নেই। একবার যদি রুদ্ধ জীবনকে খুব উদ্দাম উচ্ছৃঙ্খলভাবে ছাড়া দিতে পারতুম, একবার দিগ্বিদিক ঢেউ খেলিয়ে ঝড় বাধিয়ে দিতুম, একটা বলিষ্ঠ বুনো ঘোড়ার মতো কেবল আপনার লঘুত্বের আনন্দ আবেগে ছুটে যেতুম। কিন্তু আমি বেদুইন নই, বাংগালী। আমি কোণে বসে বসে খুঁতখুঁত করব, বিচার করব, তর্ক করব, মনটাকে নিয়ে একবার ওল্টাব একবার পাল্টাব যেমন করে মাছ ভাজে ফুটন্ত তেলে, একবার এ পিঠ চিড়বিড় করে উঠবে, একবার ও পিঠ চিড়বিড় করবে। যাক গে, যখন রীতিমতো অসভ্য হওয়া অসাধ্য তখন রীতিমতো সভ্য হবার চেষ্টা করাই সঙ্গত”।
এই চিঠির ভাষা এবং ইঙ্গিত খুবই অসাধারণ।
রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী মারা যাবার পর কাশীবাসী এক অধ্যাপকের সুন্দরী কন্যা উদিত হন কবির জীবনে। ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই নারীর নাম ছিল রানু অধিকারী। তিনি রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব না ভেবে তার ভালবাসার মানুষ হিসেবেই ভাবতেন। তার চিঠিপত্রের মধ্যে নিজের ভালো লাগাটাকে লাগাম দিয়ে থামিয়ে দিতে চাননি। রানু যখন বিয়ে করে শেষ পর্যন্ত কবিকে ছাড়লেন, তখন কবির মনে হয়েছিল তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল।
এবার আসি আর্জেন্টাইন কন্যা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর কথায়। ফরাসি ভাষায় অনূদিত রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি পড়েই কবির প্রেমে পড়েন ভিক্টোরিয়া। বিশ্ব ভ্রমণে বেরিয়ে কবি যখন অসুস্থ অবস্থায় আর্জেন্টিনায় তখন ভিক্টোরিয়ার সেবা যতœ আর গুণে মুগ্ধ হন রবীন্দ্রনাথ।
স্নেহ ও ভালবাসার কাঙ্গাল রবীন্দ্রনাথ ভিক্টোরিয়া ওকম্পোর প্রতি এতটাই আকৃষ্ট হয়েছিলেন যে, আগে আনা তরখড়কে নাম দিয়েছিলেন নলিনী আর এবার ভিক্টোরিয়া শব্দের কথা মনে রেখে তার নাম দিলেন বিজয়া।
পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ যতটা প্রেমিক ছিলেন ঠিক ততটাই নিঃসঙ্গ ছিলেন। তাঁর প্রেম যেমন ছিল দেহোত্তীর্ণ তেমনি তাঁর রচনা কালোত্তীর্ণ। গানে ,কবিতায়, উপান্যাস ও নাটকে তিনি ভালবাসার যে জয়ধ্বনি করেছেন এত মমতায়,এত আবেগে, কে আর পেরেছেন আবেগী বাঙালির আবেগ এভাবে প্রকাশ করতে? তাই তো আজ বাঙালিকে তার মনের কথা মনের মত করে প্রকাশ করতে হলে বার বার রবীন্দ্রনাথের আশ্রয়ই নিতে হয়। গুরুদেবকে জন্ম জয়ন্তীর এই পূণ্য লগ্নে তাঁকে হৃদয়ের সমস্ত ভালবাসা আর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথপুর ডিগ্রি কলেজ।