রবীন্দ্র দর্শন

মনোরঞ্জন তালুকদার
বৈশাখ শুধু বাংলা নববর্ষের প্রথম মাসই নয়, বাঙালি মানস গঠনের প্রধান পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মমাসও। বাঙালি তার সকল সংকট-সম্ভাবনায়, আশা-নিরাশায়, আনন্দ-বেদনায়, আশ্রয় ও অভয়, আত্মবিশ্বাস ও সাহস খুঁজেছে রবীন্দ্র রচনাবলীতেই। দুর্ভাবনা আর দুঃসময়ের এই সংকট মুহুর্তেও তাঁর মাঝেই খুঁজে ফিরি দুর্যোগ উত্তরণের অভয় বাণী।

দুর্যোগ ও দুঃসময়ে যেমন মানবিকতার বিকাশ ঘটে তেমনি দানবেরও প্রকাশ ঘটে। পুরো বিশ্ব যখন বর্তমানে শতাব্দীর ভয়াবহতম সংকট কাল অতিক্রম করছে তখন যুগপৎ মানব ও দানবের আত্মপ্রকাশের এই ক্রান্তিকালে রবীন্দ্রনাথ পাঠ আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে দানবদের মানব সত্বায় প্রত্যাবর্তনের জন্য।

রবীন্দ্রনাথ একজন বিস্ময় মানুষ। জীবন প্রারম্ভ থেকে জীবনাবসান পর্যন্ত নিত্যনতুন ভাবে ও ভাবনায় নিজেকে প্রকাশ করেছেন প্রতিনিয়ত। তাঁর কর্ম ও কাজ, বিপুলতা ও বিশালতা, বিচিত্রতা ও জটিলতায় বহুমাত্রিক। বয়সের সাথে সাথে বেড়েছে ভাবনার গভীরতা, মনের দিগন্ত হয়েছে প্রসারিত। তাঁর দীর্ঘ জীবন আমাদের জন্য অপার আশীর্বাদ।

তাঁর সৌন্দর্য পিপাসা অনন্য, তিনি সত্য ও কল্যাণ আর মানবতার মাঝে সৌন্দর্য খুঁজেছেন। অনুভূতির সুক্ষ্মতায়, বৈচিত্রে, মাধুর্য্যে, উৎকর্ষে আর অনেকতায় রবীন্দ্রনাথের রচনাবলি এক অনুপম সৃষ্টি। তাঁর ভাব চিন্তা ও কর্মছিল সর্বতোমুখী ও সর্বত্রগামী।

বাংলা ভাষাভাষী মানুষ তাঁর কাছে পেয়েছি মুখের ভাষা, প্রাণের প্রীতি, আনন্দের আখাংকা, জীবনের প্রত্যয়। অনেকের মতে, সংস্কৃতিবান-মানবতাবাদী বাঙালি মাত্রই রবীন্দ্রনাথের মানস সন্তান।

আমাদের চেতনার বিকাশে রবীন্দ্রনাথের দান অনেকখানি। দুঃখ-বেদনা, হতাশা-নিরাশা, দুর্দিনে-দুর্যোগে, আপদে-বিপদে, সুখে-আনন্দে রবীন্দ্রনাথ আমাদের চিরসখা। তিনি নিজেই বলেছেন, “আমি ভালবেসেছি এই জগতকে, আমি প্রনাম করেছি মহতকে, আমি কামনা করেছি মুক্তিকে।”

মানুষের মধ্যে যেসব জীবন যাত্রী বিষয়ে নয় আবেগের মধ্যেই জীবনকে অনুভব ও উপভোগ করার প্রয়াসী রবীন্দ্রনাথ তাদের আশ্রয়।

সাহিত্য নিশ্চয়ই সবার জন্যই নয়। যারা প্রাণ ধর্মের তাগিদে চলাকে জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য বিবেচনা করেন তাদের কাছে প্রাণ ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পেলেই সন্তুষ্ট।সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য যা প্রয়োজন তা সে পেলেই তৃপ্ত। ব্যক্তি বিশেষে বৈষয়িক প্রয়োজনের তারতম্য থাকলেও তা বস্তুগত আখাংকার পরিমানগত তারতম্য। তার সাথে চিত্তের কোন সম্পর্ক নেই। তাই তারা বৈভবে বিত্তবান হলেও চিত্তের দিক থেকে নিঃস্বই থেকে যান।

কারন মনুষ্যত্ব ও মানবিকতা বিকাশের অন্যতম প্রধান অনুষংগ হচ্ছে সাহিত্য, শিল্প, সংগীত ও দর্শন। মনুষ্যত্ব ও মানবতার অনুশীলন ও বিকাশের জন্য এগুলোর চর্চা প্রত্যেক মানুষের জন্য আবশ্যক। কিন্তু সাধারণ মানুষ তার বৈষয়িক উন্নতির জন্য যে পরিমান শ্রম ও মেধা বিনিয়োগ করে সে তার মানসিক উন্নয়নের জন্য শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও দর্শনের চর্চাকে কখনো ততটা প্রয়োজনীয় মনে করেনি এবং এর দায়িত্বও স্বীকার করেনা। তাই সাহিত্য, শিল্প, সংগীত কিংবা দর্শন চিরকালই অল্প সংখ্যক মানুষের অনুশীলন ও চর্চায় রয়েছে সীমিত।

চেতনা আশ্রিত মানুষকে তার বৈষয়িক, আর্থিক, জৈবিক ও মানসিক যন্ত্রনায় শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টিতে, মানুষকে তার চিত্তের সৌন্দর্য অন্বেষা ও রূপ মাধুর্য উপভোগে, আত্মার বিকাশ কামনায়, চেতনার প্রসার বাঞ্জনায়, মানবিকবোধের উন্নয়ন কামনায় এবং মানবতাবোধের বিস্তার বাসনায় আমাদের বার বার রবীন্দ্রনাথের কাছেই ফিরে যেতে হয়।

রবীন্দ্র সাহিত্য জোতস্নার মতই সুন্দর, স্নিগ্ধ, মায়াবী এবং আনন্দদায়ক। জোতস্না কখনো ক্ষতিকর হয়না। ও কেবল আলো ও আনন্দ দেয়, স্বস্তি ও শান্তি ছড়ায়, দূর করে ভয় ও বিষাদ। তেমনি রবীন্দ্রনাথের মহান সৃষ্টি মনের কালিমা বিদূরিত করে চিত্তলোকে আশা ও আনন্দলোকের ফল্গুধারার সৃষ্টি করে। শুধু তাই নয় মন ও মননে, জগত ও জীবনে লাবণ্যের প্রলেপ দিয়ে উজ্জ্বল করে জীবন প্রীতি, উদ্ভোদন ঘটায় মনুষ্যত্ব ও মানবিকতার মহিমাময় চেতনার।

রবীন্দ্রনাথ মানবতার জয়গান গেয়েছেন। যা কিছু কৃত্রিম ও জবরদস্তিমূলক তিনি তার বিরোধী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস রাখতেন মানুষের মানবিক গুনে ও আত্মিক উৎকর্ষের উন্নয়নে। মানুষের সমৃদ্ধি ও সৌজন্যেই পীড়ন ও পাপ মুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে উঠবে – এ বিশ্বাস থেকেই জাগতিক সব অন্যায়-অনাচারের ব্যাপারে মানুষের বিবেক ও বোধের কাছেই আবেদন জানিয়েছেন বার বার। মানুষের প্রতি মানুষকে শ্রদ্ধাবান করে তুলবার সাধনাই করেছেন তাঁর লেখায়। তিনি চেয়েছিলেন স্ব প্রণোদিত মানব কল্যাণী মানুষ। যারা হবে কল্যাণ ও সমৃদ্ধিপ্রসূত স্বেচ্ছাসন্মতিতে হবে অনুপ্রাণিত। তিনি তাঁর রচনায় নানা ভাবে দ্বেষ-দ্বন্দ্ব, বিভেদ-বিরোধ, শোষণ-পীড়ন মুক্ত সমাজগঠনের চিন্তা জাগানোর চেষ্টা করেছেন আজন্ম। তিনি কামনা করেছেন সুশাসনের।

রবীন্দ্রনাথ মানবতার মূর্ত প্রতিনিধি, মানব কল্যাণের চির আখাঙ্খি এবং সাম্প্রদায়িকতার ঘোর বিরোধী। ১৯০৭ সালে প্রবাসী পত্রিকায় “ব্যাধি ও প্রতিকার” শীর্ষক একটি প্রবন্ধ তিনি প্রকাশ করেছিলেন। এতে তিনি লিখেছিলেন,

” আজ আমরা এই কথা বলিয়া আক্ষেপ করিতেছি যে, ইংরেজ মুসলমানদিগকে গোপনে হিন্দুর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিয়া দিতেছে। কথাটা যদি সত্যই হয় তবে ইংরেজের বিরুদ্ধে রাগ করিব কেন। দেশের মধ্যে যতগুলি সুযোগ আছে ইংরেজ তাহা নিজের দিকে টানিবে না, ইংরেজকে আমরা এতবড় নির্বোধ বলিয়া নিশ্চিত হইয়া থাকিব এমন কি কারণ ঘটিয়াছে।

মুসলমানকে যে হিন্দুর বিরুদ্ধে লাগানো যাইতে পারে এই তথ্যটাই ভাবিয়া দেখিবার বিষয়, কে লাগাইল সেটা গুরুতর বিষয় না। শনি তো ছিদ্র না পাইলে প্রবেশ করিতে পারে না, অতএব শনির চেয়ে ছিদ্র সম্বন্ধেই সাবধান হইতে হইবে। আমাদের মধ্যে যেখানে পাপ আছে শত্রু সেখানে জোর করিবেই – আজ যদি না করে তো কাল করিবে, এক শত্রু যদি না করে অন্য শত্রু করিবে- অতএব শত্রুকে দোষ না দিয়া পাপকেই ধিক্কার দিতে হইবে।

হিন্দু – মুসলমান সম্বন্ধ লইয়া আমাদের দেশে একটা পাপ আছে; এ -পাপ অনেক দিন হইতে চলিয়া আসিতেছে। ইহার যা ফল তাহা ভোগ না করিয়া আমাদের কোন মতেই নিষ্কৃতি নাই।…..

…… আর মিথ্যা কথা বলিবার কোন প্রয়োজন নাই। এবার আমাদিগকে স্বীকার করিতেই হইবে হিন্দু-মুসলমানের মাঝখানে একটা বিরোধ আছে। আমরা যে কেবল স্বতন্ত্র তাহা নয়। আমরা বিরুদ্ধ।

আমরা বহুশত বৎসর পাশে পাশে থাকিয়া এক খেতের ফল, এক নদীর জল, এক সূর্যের আলোক ভোগ করিয়া আসিয়াছি; আমরা এক ভাষায় কথা কই, আমরা একই সুখ দুঃখে মানুষ; তবু প্রতিবেশীর সংগে প্রতিবেশীর যে সম্বন্ধ মনুষ্যোচিত, যাহা ধর্মবিহিত, তাহা আমাদের মধ্যে হয় নাই। আমাদের মধ্যে সুদীর্ঘকাল ধরিয়া এমন একটি পাপ আমরা পোষণ করিয়াছি যে একত্রে মিলিয়াও আমরা বিচ্ছেদকে ঠেকাইতে পারি নাই। এ পাপকে ঈশ্বর কোনমতেই ক্ষমা করিতে পারেন না।”

শুধু এই লিখায় নয়, আরো বহু লিখায়- বিশেষ করে ‘কালান্তর’ এর বেশ কয়েকটি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু – মুসলমানের বিচ্ছেদজনিত পাপের স্বরূপ ও প্রভাব অনেক নিপুণ ভাবে উদঘাটন করেছেন।

আমাদের মত উন্নয়নশীল একটি রাষ্ট্রে যেখানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সাম্প্রদায়িকতা একটি বড় সমস্যা সেখানে রবীন্দ্র রচনা আমাদের অমূল্য অপরিহার্য সম্পদ। আমাদের অশিক্ষাদুষ্ট দেশে, দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজে এবং সাম্প্রদায়িক মনস্তত্ত্বে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা, মানবিকতা – মানবতার বিকাশ বিস্তার সহজে সম্ভব কেবল রবীন্দ্র রচনাবলী পড়ার ও পড়ানোর, শুনার ও শুনানোর মাধ্যমেই। কারন তাঁর রচনাবলী অনুভূতির গভীরতায়, মননের ব্যাপকতায় এবং মানবিকতার উৎকৃষ্টতায় কালোত্তীর্ণ।

যাযাবর বলেছিলেন, আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ – যন্ত্র ও যান্ত্রিকতার এ যুগেও সুখ প্রবণ, ভাববাদী, রোমান্টিক মানুষের কর্মহীন নিঃসংগ নিভৃত জীবনের উদাস মুহুর্তের অন্তরসঙ্গী হয়ে থাকবেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর অতুল্যতা ও অসামান্যতা নিয়ে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথপুর সরকারি কলেজ।