রমাদানে তাওবা ও ইস্তিগফার

শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
রমাদান হলো রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এ মাসের আমলসমূহের মধ্যে তাওবা ও ইস্তিগফার গুরুত্বপূর্ণ। কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা হলো ইস্তিগফার। ইস্তিগফার ও তাওবা জোড়া শব্দ হিসেবে দেখা যায়, যেমন: তাওবা-ইস্তিগফার। কখনো কখনো এ দুটি শব্দ সমার্থকও হয়। তবে ইস্তিগফার জীবিত ও মৃত সবার জন্য; আর তাওবা শুধু জীবিত লোকের জন্য। কোরআনে উদ্ধৃত হয়েছে: ‘আমাদের রব! আমরা আপনার কাছে ক্ষমা চাই। আমাদের আপনার দিকে ফিরে যেতে হবে।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ২৮৫)। ‘তোমরা তোমাদের পালনকর্তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয় তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল।’ (সুরা-৭১ নূহ, আয়াত: ১০)।
ইস্তিগফার দ্বারা আল্লাহর রহমত ও নেয়ামত
লাভ করা যায়। ইস্তিগফারের ফজিলত সম্পর্কে কোরআন কারিমে এসেছে: ‘ (ইস্তিগফারের ফলে) তিনি (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি সুষম বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। আর তোমাদের সম্পদে প্রাচুর্য ও সন্তানের বরকত দেবেন এবং তোমাদের জন্য বাগবাগিচা পানির ফোয়ারায় শোভিত করবেন।’ (সুরা-৭১ নূহ, আয়াত: ১১-১২)।
ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতের মতো স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ একটি ইবাদত। ইস্তিগফার করার জন্য আগে গুনাহ করা শর্ত নয়। মানে কেবল গুনাহ করলে ইস্তিগফার করতে হবে, তা নয়। এমনিতেই ইস্তিগফার করা যায়। ইস্তিগফার করলে আল্লাহর নেয়ামতের দ্বার উন্মুক্ত হয় ও তার অবারিত রহমত বর্ষিত হয়। ইস্তিগফার শুধু অনুতাপ নয়, শোকরিয়া হিসেবেও করা হয়। মক্কা বিজয়ের পর আল্লাহ তাআলা প্রিয় নবীজি (সা.) কে বলেন: ‘যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসে, দেখবেন লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দীনের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। তখন আপনি আপনার রবের (প্রভুর) পবিত্রতা বর্ণনা করুন প্রশংসাসহ, আর তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি সর্বাধিক তাওবা কবুলকারী (তিনি তা পছন্দ করেন)।’ (সুরা-১১০ নাসর, আয়াত: ৩)।
নিজে যেমন তাওবা ইস্তিগফার করব, অনুরূপ সকল মুমিন নর-নারীর জন্য ইস্তিগফার ও ক্ষমা প্রার্থনা করব। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মুমিন নর-নারীর বিনিময়ে আমাদের একটি করে নেকি প্রদান করবেন। (মাজমাউজ জাওয়ায়িদ, খ-: ১০, পৃষ্ঠা: ৩৫২, হাদিস: ১৭৫৯৮)। যে ব্যক্তি সর্বদা ইস্তিগফার করতে থাকে, আল্লাহ তাআলা তাকে সংকট থেকে মুক্তির পথ করে দেন। যাবতীয় দুশ্চিন্তা থেকে প্রশস্ততা ও প্রশান্তি দান করেন এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিজিক দান করেন। (সুনানে আবু দাউদ, খ-: ১, পৃষ্ঠা: ৪৭৫, হাদিস: ১৫১৮)।
তাওবার পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার নিকট লজ্জিত, অনুতপ্ত হয়ে অন্যায়-অসৎ কাজ থেকে প্রত্যাবর্তন এবং ভবিষ্যতের জন্য ন্যায় ও সৎ কাজের সংকল্প করা। অতঃপর সৎ কাজের দ্বারা অতীতের সব অসৎ কাজের ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করা। অর্থাৎ পাপের পথ ছেড়ে পুণ্যের পথে ফিরে আসা। সব তাওবাই ইস্তিগফার, সব ইস্তিগফার তাওবা নয়।
কাউকে শারীরিক-মানসিক কষ্ট দেওয়া, মান-সম্মান নষ্ট করা, দুর্নাম করা এবং মিথ্যা অপবাদ দেওয়া ও সম্পদ হানি করা মানুষের হক নষ্ট করার অন্তর্ভুক্ত। কারও কোনো হক নষ্ট করে থাকলে যথাসম্ভব তার ক্ষতিপূরণ করতে হবে বা ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। আল্লাহর হকের মধ্যে কোনো হক (যেমন নামাজ, রোজা, জাকাত ও হজ ইত্যাদি) বাকি থাকলে তা তাড়াতাড়ি আদায় করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট দৃষ্টান্তমূলক তাওবা করো।’ (সুরা-৬৬ তাহরিম, আয়াত: ৮)।
আল কোরআনে আল্লাহ তাআলার ক্ষমার ঘোষণা: ‘(হে রাসুল সা.!) আপনি বলুন, হে আমার (আল্লাহর) বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করবেন।
তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা-৩৯ জুমার, আয়াত: ৫৩)।
মাগফিরাত মানে ক্ষমা করা, গাফার ও গুফরান মানে ক্ষমা; ইস্তিগফার মানে ক্ষমা চাওয়া; তাওবা মানে ফিরে আসা বা ফিরে যাওয়া, প্রত্যাবর্তন করা, বিরত হওয়া। প্রথম মানুষ প্রথম ভুল করেছেন। ‘সকল মানুষ ভুলকারী, তাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ হলো তওবাকারী।’ (বুখারি)। মোনাজাত অর্থ কানে কানে কথা বলা বা গোপনে কথা বলা। যেহেতু নিজের পাপের কথা আল্লাহর কাছে গোপনে স্বীকার করা হয় অথবা আপন বিশেষ প্রয়োজন ও চাহিদা বিশ্বস্ত প্রিয়ভাজনের কাছে নির্জনে-নিবৃতে বলা হয়, তাই তা মোনাজাত। মোনাজাত মানে আবেদন বা প্রার্থনা।
লেখক: বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির যুগ্ম মহাসচিব ও আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম এর সহকারী অধ্যাপক। (সংকলিত)