রসাতলে যাচ্ছে বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়

স্টাফ রিপোর্টার
একসময় যে বিদ্যালয়ের সুনাম ছিল সারা জেলায়। সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি দিন দিন অধ:পাতে যাচ্ছে। বিদ্যালয়ের কর্মকান্ডে শিক্ষকদের অনৈক্য ও অন্তর্দ্ব›দ্ব প্রকট আকার ধারণ করায় মূলত. এমন অবস্থা হয়েছে। বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা সুচারুরূপে না হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। ইতিমধ্যে বিদ্যালয়ে সংঘটিত একাধিক ঘটনায় আদালতে মামলাও হয়েছে। যার প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়। ফলশ্রæতিতে দিনে দিনে রসাতলে যাচ্ছে বিদ্যালয়টি। বলা হচ্ছিল শহরের ঐতিহ্যবাহী বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের কথা।
জানা গেছে, বিদ্যালয়ের বিশৃংখলা এবং শিক্ষায় পিছিয়ে পড়াসহ নানা জট ঝামেলা সৃষ্টির নেপথ্যে আছেন বর্তমান প্রধান শিক্ষক এবং দুইজন সহকারী শিক্ষক। বিভিন্ন কারণে শিক্ষার্থীর অভিভাবক বা শিক্ষার্থীরা মুখ খুলতে পারছেন না। তিন শিক্ষকের দ্ব›েদ্বর কারণে কম্পিউটার ল্যাব তালাবদ্ধ থাকায় কম্পিউটার নষ্ট হয়েছে ৫টি। বিদ্যালয়ের লাইব্রেরি রুমে থাকা বইগুলো কোন অবস্থায় আছে তা কোনো শিক্ষক দেখতে পারেন নি। এই লাইব্রেরি মাসের পর মাস তালাবদ্ধ থাকে বলে একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন।
১৯৩২ সালে ২ একর ২ শতাংশ জমির উপর প্রতিষ্ঠা হয় বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়। উচ্চ বিদ্যালয় হিসাবে স্বীকৃতি পায় ১৯৩৮ সালের ১৯ মার্চ। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে লেখাপড়ার মান খুবই ভাল ছিল। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনেকেই আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসকসহ দেশের উচ্চ পর্যায়ে অধিষ্ঠিত রয়েছেন বা ছিলেন।
২০১০ সাল থেকে নানা জটিলতায় ক্রমান্বয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা এবং শিক্ষার গুণগতমান অনেকটা নিচে নেমে গেছে। শিক্ষার অগ্রগতিতে ঝিমিয়ে পড়েছে বিদ্যালয়টি। বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও ৯ বছর ধরে শিক্ষকদের সমন্বয়হীনতার কারণে আগের সুনাম হারিয়েছে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানান, বর্তমানে বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ১২জন এবং ৬৫০ জন শিক্ষার্থী আছেন। গত এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৮২ জন। পাশ করে ৫৯ জন। ২০১২ সালে ২টি এবং ২০১৩ সালে ১টি জিপিএ-৫ এসেছে। বিদ্যালয়ে কর্মচারী আছেন আরও ৫ জন। বিদ্যালয়ে ৪ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ হয়েছে ২০১৮ সালে। এর আগে আরও ২টি পুরাতন টিনশেড ভবন রয়েছে। ১ তলার পাকাভবন রয়েছে আরও ২টি। সব মিলিয়ে শ্রেণী কক্ষ আছে ১১টি। বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিএম শাখা। বিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব ও ২টি প্রজেক্টর রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণীতে আমার ছেলে লেখাপড়া করে। সে প্রায়ই বিদ্যালয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর বাসায় চলে আসে। ক্লাস নিয়মিত হয় না। প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে মনগড়াভাবে আসা-যাওয়া করেন এবং অন্য দুই শিক্ষক নানা জট-ঝামেলা পাকাতে পরিকল্পনা করেন। সহকারী শিক্ষক রুহুল আমিন একজন শিক্ষক নেতা। অপর সহকারী শিক্ষক ফারুক আহমদ বিদ্যালয়ে বিভিন্ন ঝামেলায় জড়িত থাকেন।
বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী পরেশ আহমেদ বলেন, বিদ্যালয়ের কার্যক্রম নানাভাবে বিঘিœত হচ্ছে। এই কারণে লেখাপড়ার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিদ্যালয়ের লেখাপড়া ভাল করতে চাইলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যাপারে শিক্ষকদের নজর দিতে হবে।
শিক্ষার্থী অভিভাবক আব্দুর রহমান (৭০) বলেন, আমাদের সময়ে এই বিদ্যালয়ে লেখাপড়া খুবই ভাল ছিল। শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের কমতি ছিল না। এখন এই বিদ্যালয়টি ধ্বংসের মুখে পড়েছে কয়েকজন শিক্ষকের কারণে। বিদ্যালয়ের অনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে কেউ থাকেন হাট-বাজারে প্রচারে, কেউ থাকেন সভা-সমাবেশে। এই ধরনের শিক্ষকের অপসারণ না হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাবে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফারুক আহমদ বলেন, ২০১০ সালে প্রধান শিক্ষক নুরুল আবেদীনের যোগদানের পর থেকে লেখাপড়ার মান কমে গেছে। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমকে ঘিরে সারা বছর সমস্যা থাকে। বিভিন্ন সময়ে আমার এবং প্রধান শিক্ষকের মধ্যে মারামারির ঘটনায় আদালতে মামলা হয়েছে দুইটি। মামলাগুলো বর্তমানে পৌরসভায় সালিশে আছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন খরচপাতির ভুয়া ভাউচার তৈরি করেন প্রধান শিক্ষক। প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললে শিক্ষকদেরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রুহুল আমিন বলেন, আমি বিদ্যালয় সংক্রান্ত কোনো কিছুতে জড়িত নই। বিদ্যালয়ে মারামারির ঘটনায় মামলাটি বোর্ডে চলে গেছে। এর বেশি আমি কিছুই জানি না।
সাবেক প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমি বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪০ বছর শিক্ষকতা করেছি। নিজের দক্ষতায় সহকারী শিক্ষক থেকে সহকারী প্রধান শিক্ষক হয়েছি। পরে ১৯৯৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা ১৬ বছর পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছি। এই সময়ের অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা বলেছেন আমার দায়িত্ব পালকালীন সময়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ভাল ছিল। এখন লোকমুখে শুনে আসছি, শিক্ষায় পিছিয়ে পড়েছে এই ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন বিদ্যালয়টি। কোনো প্রতিষ্ঠান প্রধানের প্রশাসনিক দক্ষতা না থাকলে প্রতিষ্ঠানের অধ:পতন ঘটবেই।
বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল আবেদীন বলেন, বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা ভাল আছে এবং শিক্ষার মানও ভাল। সৃজনশীল পদ্ধতির জন্য হয়তো লেখাপড়ায় শিক্ষার্থীর আগ্রহ কমতে পারে। তিনি বলেন বিভিন্ন ঝামেলায় বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মধ্যে মামলা ছিল। এই মামলা এখন সালিশে আছে।