রাজনৈতিক দলের মানুষের কাছে ফেরা/ জনগণের উপলব্ধি অনুভব করার সক্ষমতাও দেখাতে হবে

দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নিজেদের জনসমর্থন প্রদর্শনের জন্য সবিশেষ চেষ্টায় নিয়োজিত রয়েছে বলে দেখা যায়। বিএনপি প্রতিটি বিভাগে সমাবেশ করছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রংপুর ও বরিশালে সংগঠনটি বড় সমাবেশ করেছে। জসনমাবেশে লোকসমাগম ঠেকানোর বিভিন্নমুখী তৎপরতা সত্বেও প্রচুর লোক আসছে। সমাবেশের লোক সমাগম বিএনপি নেতৃত্বকে বেশ উৎসাহিত করছে। তাঁদের এখন উৎফুল্ল ও দৃঢ় বলে মনে হচ্ছে। এর বিপরীতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও নিজেদের জনসমর্থন দেখানোর ব্যবস্থা নিয়েছে। বিভিন্ন ইউনিটের সম্মেলনের নামে সংগঠনটি বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর লোক সমাগম ঘটিয়ে একদিকে বিএনপিকে পালটা জবাব দিচ্ছে অন্যদিকে নিজেদের সংগঠনের ভিতর প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করছে। রাজনৈতিক দল হিসাবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের এই গণমুখিতা ইতিবাচক। শেষ পর্যন্ত যে জনগণই সবকিছুর নিয়ামক এই উপলব্ধি তৈরির বিষয়টি স্বস্তিদায়কও বটে। দ্বন্দ্ব, সংঘাত, চক্রান্ত, ষড়যন্ত্রের চাইতে বেশি বেশি করে মানুষের কাছে পৌঁছানোর সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়ার এই রাজনৈতিক কর্মসূচিকে আমরা স্বাগত জানাই।
আমাদের রাজনীতি চর্চার প্রধান সমস্যার জায়গাটি হলো, জনগণের নামে সকলে রাজনীতি করলেও এই জনগণই সবচাইতে বেশি উপেক্ষিত থেকেছেন। নির্বাচনের আগে জনগণের কিছুটা গুরুত্ব বাড়লেও নির্বাচনের পরপরই রাজনৈতিক দলগুলো ঘরের তালা বদ্ধ করে রাখে। সেই তালা ভেদ করে জনগণের কোনো আকাক্সক্ষা, আর্তি বা চাহিদার কথা সেখানে পৌঁছানো যায় না। ক্ষমতায় গেলে রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমশ গণবিচ্ছিন্ন হতে হতে একেবারে বৃত্তাবদ্ধ হয়ে যায়। রাজনৈতিক দলের এই গণবিচ্ছিন্নতার ফলাফল ভয়াবহ। এর মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক চর্চার অপমৃত্যু ঘটে। সেখানে গড়ে উঠে আধিপত্যবাদ, একনায়কতন্ত্রসুলভ মানসিকতা এবং পুনঃ পুনঃ ক্ষমতায় থাকার অভীপ্সা। দুর্নীতি মাথাচাড়া দেয়, আমলাতন্ত্র নির্ভরতা বাড়ে। বৈদেশিক প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও সংস্থার মাথা গলানোর পরিবেশ তৈরি হয়। বাহ্যতঃ দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জোয়ার বয়ে চললেও এই গণবিমুখতার ফলে রাষ্ট্রের গণপ্রজাতন্ত্রী চরিত্রের ধ্বংস ঘটে। ঠিক এরকম জায়গায় যখন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো আবারও গণমুখী হওয়ার চর্চায় নিজেদের নিয়োজিত করেন তাহলে তার চাইতে সুসংবাদ আর কিছু হতে পারে না।
২০২৩ সনের শেষে অথবা ২০২৪ সনের প্রথম ভাগে দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর দেখতে চায় দেশের মানুষ। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে স্পষ্ট মতবিরোধ লক্ষণীয়। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রেখে বিএনপি কোনভাবেই জাতীয় নির্বাচন হতে দিবে না বলে অনমনীয় মনোভাব দেখাচ্ছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সংবিধানের বাইরে গিয়ে ভিন্ন সরকার ব্যবস্থায় ফিরে না যাওয়ার সাফ কথা জানিয়ে দিয়েছে। এরকম মুখোমুখি অবস্থান সামনের নির্বাচন নিয়ে জনগণকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এর অবসান হওয়া উচিৎ। নতুবা রাজনীতি অশান্ত হয়ে উঠার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের দেশটি স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রম করলেও এখন পর্যন্ত সরকার পরিবর্তনের একটি সর্বসম্মত স্থায়ী পদ্ধতি তৈরি করতে না পারার বিষয়টি দুঃখজনক। স্বাধীনতা প্রাপ্ত হলেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জায়গায় যে আমরা খুব বেশি এগোতে পারিনি এই অবস্থা তার বড় প্রমাণ। স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে চাইলে গণতন্ত্র চর্চার মুক্ত পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে সকল দলের ঐকমত্য একান্ত প্রয়োজন। নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া এর অন্যতম। তাই চলমান পরস্পরবিরোধী অবস্থানকে ন্যূনতম জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দ্রুত ঐকমত্যের জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে জনসমাগম ঘটিয়ে নিজেদের সুদৃঢ় অবস্থানের প্রমাণ দিতে চাইছে সেভাবে জনগণের উপলব্ধি অনুভব করার সক্ষমতাও তাদের দেখাতে হবে।