রাতের ঘুম: সুস্থতা ও দীর্ঘায়ূ

প্রফেসর ড. মো: আতী উল্লাহ
দিন ও রাতের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে: দিন সূর্যের আলোয় আলোকিত, উদ্ভাসিত; আর, রাত অন্ধকারে আচ্ছন্ন, আচ্ছাদিত। ইংরেজ কবির ভাষায়: Sound sleep by night, study and ease/Together mixt (mixed), sweet recreation/And innocence which most does please, with meditation অর্থাৎ, রাতের বৈশিষ্টই হচ্ছে: মানুষের গভীর ঘুম বা সুনিদ্রা। আর, ঘুমোতে যাওয়ার পূর্বে সন্ধ্যায়ই সে আনন্দে কিছুপঠন/পাঠন করবে, কয়েকজন একত্র হয়ে মজার মজার বই-পুস্তকাদি-পুঁথিসাহিত্য-ধর্মগ্রন্থ পড়বে; অর্থাৎ, শরীর ও মনকে সুনিদ্রার জন্য তরতাজা-প্রশান্ত-প্রফুল্ল করে তুলবে। আগে ভাগে অল্প আহার করেযেটুকু মন চায়প্রার্থনা করে নিষ্কলুষ মনে বিছানায় গিয়ে আরামের ঘুম ঘুমানোর জন্য প্রস্তুতি নেবে; আর, কিছুক্ষণ সম্পূর্ণ অন্ধকারে আবিষ্ট কক্ষে স্রষ্টা ও সৃষ্টির ধ্যানে নিমগ্ন থেকে শান্ত মনে আস্তে করে বিছানায় তার শরীরটা এলিয়ে দেবে; আর, মূহুর্তেই সে গভীর ঘুমের কোলে ঢলিয়ে পড়বে; পরের প্রত্যুষে সে পরিতৃপ্ত দেহ-মন নিয়ে ঘুম থেকে উঠে দিনের কার্যক্রম শুরু করবে। এই হল ঘুমের বৈজ্ঞানিক বিধান।
এর উল্টোটা যে-ই করবে, বয়স ৪০ হওয়ার পর পরই তার শরীর আর কুলাতে পারবে না। শরীর তখন অসহায়ের মতব্যক্তির এ বদ-অভ্যাসের কুফলের যন্ত্রণা পেয়ে পেয়ে কাতর থেকে আরওকাতর হতে শুরু করবে; কারণ,ব্যক্তি তার উপর অত্যাচার করেছে। এক সময় শরীর ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিরব বিদ্রোহ ঘোষণা করবে এবং ঐঅত্যাচারেরকঠোর প্রতিশোধ নিতে আরম্ভ করবে। হাজরো রোগ তাকে আক্রমন করবে একের পর এক। দেশ-বিদেশে এত এত চিকিৎসার পরেও একসময় শরীর অবশ্যই কাবু হয়ে যাবে। বয়স ৪০ থেকে ৫০ এর মধ্যেই তার মারা যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। আর যদি বাঁচেও, তবু রোগ-শোক-ছটফট-যন্ত্রণা সবকিছুকে সঙ্গী করে নিয়েই তাকে বাঁচতে হবে। র্ফাসি কবির ভাষায়: “বয়স তোমার ৪০ হয়ে গেছে, মেজাজ তোমার আজও বদলায় নি, ছেলেমি এখনো রয়ে গেছে তোমার মধ্যে (সুতরাং, শুধুমাত্র অপেক্ষা কর কবরের জন্য”)।দিনের বেলায় মানুষ যতটুকু সম্ভব শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করবে। এতে তার শরীর ও মন উভয়ই হবে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। তখনই প্রয়োজন পড়বে শরীরের রিচার্জিং-এর। আর, অন্ধকার রাতের সুনিদ্রাই হচ্ছে শরীরের এই রিচার্জিং। প্রতি রাতে নিয়মিত এই রিচার্জিং না হলেই ব্যক্তির জন্যঅপেক্ষা করছে সমূহ বিপদ।
নিচে আমি কয়েকটি নিষ্ঠুর এবং বাস্তব পরিসংখ্যান দিচ্ছি: ১/ আমার এক ঘনিষ্ট আত্মীয় (শহরের বাসিন্দা) এক সরকারি চাকুরি করতেন। ছোট-খাটো চাকুরি হলেও তার সংসার ভালই চলছিল। শহরে পিতার বানেেনা নিজস্ব বাড়িঘরও আছে। হঠাৎ শুনলাম: পরিবার-পরিজন নিয়ে তিনি আমেরিকায় স্থায়ীভাবে পাড়ি জমাচ্ছেন। গ্রামের বাড়ির জায়গা-জমি বিক্রি করে টাকার ব্যবস্থাও করে ফেলেছেন। তখন তার বয়স হবে ৪৪/৪৫ এর মত। দেখতে সুপুরুষ। একদিন একটা প্রয়োজনে ওখানে আমার যাওয়া পড়ল। কথার এক ফাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “ভাইসাব, এটা কি করছেন?” রাগে লাল হয়ে গিয়ে উনি জবাব দিলেন, “তুমি কি বুঝবা, আমার বাচ্চা-কাচ্চার ভবিষ্যৎ আছে না”? আমি চুপই রইলাম। পরে শুনলাম, তার বিধবা ইয়াং শালিকাও তাদেরই সাথে যাচ্ছে। আমেরিকায় গিয়ে পেলেন এক ৫ তারা হোটেলে চাকুরি। উনার এক ছেলে এবং মেয়েরাও আছে। উনার চাকুরিটা ছিল:-দিনে ঘুম, আর সারা রাত হোটেলের কাপড় ধোয়া। ছেলে-মেয়েরাও ছোট। চার বছর না যেতেই খবর আস্ল: উনি মারা গেছেন। লাশ দেশে পাঠাবার টাকা নেই। সপ্তাহ খানেক তার লাশটি‘লাশ-ঘরে’ রেখে ওখানেই তার দাফন হল। বড় মেয়েকে দেশে এনে অনেক বয়সে বড় ঘটক ধরে বিয়ে দেয়া হল। অন্যগুলোকে দেশে এনেও বিয়ে করাতে না পেরে ঐ দেশে আবার ফেরতনিয়ে গিয়ে দেশি বিদেশির পাত্রস্থ করেছেন। প্রায় ৪৮ বছর বয়সে উনার একমাত্র ছেলেটি শেষপর্যন্ত বিয়ে করেছে। ঘরে ঐ বধুর এখন দুই শ্বাশুড়ি। বছর কয়েক পূর্বে নাকি বড় শ্বাশুড়ির ব্রেস্ট-ক্যানসার অপারেশন হয়েছে। শুনেছি, খুব কষ্টে নাকি দিনাতিপাত হচ্ছে। (আল্লাহ উনাকে বেহেশ্ত্ নসিব করুন, আমীন)।
২/ উচ্চ-পদের এক সরকারি চাকুরে (আমার পরিচিত) ছুটি নিয়েঐ দেশেই সোনার হরিণ ধরতে গিয়েছিলেন। ২ বা ৩ মাস পর ফিরে এসে সহকর্মীদের কাছে নাকি মন্তব্য করেছেন: “ওখানে গিয়ে বসার জন্য যদি একটা টুলও পেতাম, তা হলেও হয়ত থেকেই যেতাম”।৩/ অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বাসা-বাড়ির নাইট-গার্ড সহ যারা অনবরত রাতের চাকুরি করে, তারা নানা প্রকার জটিল রোগে-শোকে ভোগে আগেভাগেই মারা যায়।৪/ অভিজ্ঞতায় আরো দেখা যায়, যাঁরা রাত জেগে ওয়াজ-নসিহত করেন এবং যারা নিয়মিত রাত জেগে তা শোনেন, তাদের ক্ষেত্রেও রোগ-শোক এবং মৃত্যুর পরিসংখ্যান একই রকম। ৫/ আমার জানামত অন্তত দু’জন আলেম গভীর রাতে ওয়াজ করতে গিয়ে আসা-যাওয়ার পথে সড়ক-দুর্ঘটনায় নিহতহয়েছেন। ৬/ অনেক গবেষক রাত জেগে জেগে গবেষণাকর্ম করতে করতে অকাল-রোগ অথবা অকাল-মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। ৭/ আমার পরিচিতঅনেক ব্যবসায়ী ভাইয়েরা রাত ১ টার দিকে বাড়ি ফিরতেন। তারা অনেকেই ৫০ পুরো না করতেই ইন্তিকাল করেছেন। ৮/ অনেক বড় বড় উচ্চশিক্ষিত লোক সারা রাত জেগে অতিরিক্ত মদ্যপান ও মাত্রাতিরিক্ত আমোদ-ফুর্তি করে ঐ রাতেই হার্ট এ্যাটাকে মৃত্যুকে বরণ করে নিয়ে ইহলোক ত্যাগ করেছেন বলে আমাদের সকলের জানা আছে। ৯/ এক আলেম ছাত্রজীবনে খুব মেধাবি শিক্ষার্থী ছিলেন। রাত জেগে ওয়াজ করতে করতে এক সময় উনি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। এখন সুস্থ আছেন এবং ওয়াজও করেন বটে, কিন্তু প্রায়ই উনার মুখ দিয়ে অনেক অকথ্য-অশ্লীল গালিগলাজ বের হয়, যেগুলো একদিন শুনে আমি হতবাক হয়েছি। আর কত পরিসংখ্যন দেব? শ্রদ্ধেয় ভাই-বোনেরা আমার,মোদ্দা কথা: বয়স ৪০ এর পর সকলেরই সাবধান থাকা বুদ্ধিমানের কাজ।
এখন আসি আবার ইংরেজি সাহিত্যে। জনৈক প্রবন্ধকার লিখেছেন: Lying late at night is a great shortener of life. At least, it is never found in company with longevity অর্থাৎ, রাতে দেরি করে ঘুমোতে যাওয়া মানুষের আয়ূষ্কাল অনে…ক কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে, দীর্ঘায়ূ ও সুস্থতার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই”। রাতে দেরিতে ঘুমানো এবং সুস্থতা বা দীর্ঘায়ূ এক সঙ্গে চলতে পারে না। একটাকে চাইলে অপরটার অভ্যাস এবং আশা অবশ্যই ছাড়তেই হবে। কারণ,সোজা কথায়, দুইটা দুই সতীন।
অন্ধকারকে দেখতে হবে, চিনতে হবে। অন্ধকার রাতের গভীর ঘুমের প্রকৃত অর্থই হচ্ছে স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা এবং কঠিন কঠিন রোগমুক্তি। নিউরোবিজ্ঞান অনুসারে, রাতের অন্ধকারের ঘুমই হচ্ছে প্রকৃত ঘুম।এ মতে, দিনের বা দিবালোকেরঘুম কোন ঘুমই নয়। এটা একটা স্রেফে আলস্য, বেকারত্বের অভিশাপ, সময়ের দারূন অপচয় এবং অসুখ-বিসুখ ডেকে আনার একটি উত্তম পন্থা।সত্যিকারের জ্ঞানীদের কথা: “দিনের বেলায় বিছানা-কাতর হইও না; হইলে, বিছানাই তোমাকে অল্পদিনেই কাতর করে দেবে”।দিনের ঘুমের অপর নাম ‘কাজের অক্ষমতা’। একজন সুস্থ ব্যক্তিও যদি দিনের বেলা ঘুমায়, দেখে কেউ জিজ্ঞেস করেও ফেলতে পারে-‘উনি অসুস্থ নাকি’? এটা ভীষণ লজ্জাকর। নিউরোবিজ্ঞান বলে: রাতের ঘুম is a well-documented fact ” (সন্দেহাতীতভাবে সত্য)। দেহের শিরা-উপশিরার কার্যকারিতা বজায় রাখতে রাতের ঘুমের বিকল্প নেই। এ ঘুম ব্যক্তির জৈবিক চাহিদা পূরণ করে এবং আগামিকালের কাজের জন্য তাকে প্রস্থুত করে তুলে।
কাজের ফাঁকে দিনে বিশ্রাম; আর, দিনের ঘুম সম্পূর্ণ আলাদা দুই জিনিস। আবার চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুসারে এই বিশ্রাম বা তন্দ্রাও হবে সর্বোচ্ছ ২০ মিনিট। কাজের ফাঁকে বিশ্রাম বৈজ্ঞানিক ব্যাপার। আর, সাহিত্যের ভাষায়: “বিশ্রাম চোখেরই অঙ্গ, এক সাথে গাঁথা/নয়নের অংশ যেন নয়নের পাতা”।
রাতের সুনিদ্রার সাথে অনেক ব্যাপার জড়িত। আমি এখানে মাত্র দু’/চারটি উল্লেখ করছি: ১/ শুবার ঘর হবে শুধুই শুবার উদ্দেশ্যে। ২/ কক্ষটি হবে গাঢ় অন্ধকার। ৩/ ডিস্টার্বিং কোন শব্দ না থাকা। ৪/ শুতে যাবার ২ ঘন্টা আগে রাতের অল্প আহার শেষ করতে হবে। ৫/ রাতে কোন অবস্থাতেই কোন ডিনার পার্টিতে খাওয়া চলবে না। ৬/ সকালের খাবার হবে রাজার মত, দুপুরের খাবার প্রজার মত, আর রাতের খাবার গরিবের মত। ৭/ কম, কিন্তুপ্রয়োজনমত মেপে মেপে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাবেন। প্রবাদ আছে: “বেশি খাবি, তো কম খা”, অর্থাৎ, বেশিদিন বেঁচে বেশি খেতে হলে প্রতিবেলা কম কম খা; জন্মের পূর্বেই খাদ্য বরাদ্দ হয়ে রয়েছে, একটি দানা অবশিষ্ট থাকলেই ওটা খেয়ে শেষ না করে মরা যাবে না; অর্থাৎ, আয়ূতে বরকত চলে আসবে এবং মৃত্যুর দিন-ক্ষণও ঠিক থাকবে, এক মূহুর্তও আগ-পিছ হবে না।৮/ চির-আধুনিক পবিত্রআল-র্ক্বোআনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, “মানবের স্বাভাবিকখাদ্য হচ্ছে ফল”। আমরা সবাই দেশিয় সস্থা ফল সারা বছর খেতে পারি; আর, বেশি বেশি ফলগাছ লাগাতে থাকি।৯/ দিনের কাজ করতে হবে উদ্ভাসিত সূর্যালোকে, অথবা অধিক পাওয়ারের বাল্বের নিচে, যাতে করে অন্ধকার নামার সাথে সাথে দিনের কাজের পরিশ্রান্ত চোখে ঘুমের ভাব নেমে আসে, এবং অবশ্যই আসবে; ফলে, হবে গভীর সুনিদ্রা; কারণ, দিনে চোখের উপর কিছুটা হলেও অত্যাচার করা হয়েছে সজ্ঞানে ও ইচ্ছাকৃতভাবে, চোখ দু’টো এখন যত দ্রুত সম্ভব ঘুম চাইবেই। ১০/ দিনে যারা ঘুমায়, রাত তাদের জন্য সত্যিকার অর্থেই বড় কষ্টের হয়ে থাকে; আর, রাতে ঘুমাতে না পারায় দিনেই তার ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে হাজারো রোগ ডেকে আনে। ১১/ বেশি বেশি ভাল ভাল খাবার মানেই বড় বড় টাকা, বড় বড় ডাক্তার, বড় বড় ক্লিনিক-হাসপাতাল, দেশ এবং বিদেশে। ১২/ একজন ৮০ বছরের মেডিসিনের প্রফেসরের ভাষায়: “আচার তো বানালেনই বছর ধরে মজা করে বেশি বেশি খাওয়ার জন্য, তা হলে ডায়েট কন্ট্রোল করবেন কি করে?জিহ্বা সামলান, বড়লোক হয়ে গিয়ে বড়লোকি নানা আইটেমের কাঁচা সালাদ, অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে: ‘ফলাদি ব্যতিরেকে অন্য যে কোন কিছুই কাঁচা খাওয়া নিষেধ’ ”। সারকথা: শরীরের উপর অত্যাচার করবেন, জুলুম করবেন, তো মায়ার শরীরটাই প্রতিশোধ নিয়ে ছাড়বে।
লেখক: প্রফেসর ড. মো: আতী উল্লাহ,
প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।
০৭/৮/২০২০