ভ্রমণ-রাশিয়া থেকে ফিরে

এনাম আহমেদ (এডভোকেট)
(দশম ও শেষ পর্ব)
রাশিয়ার আভ্যন্তরিন পরিস্থিতি অনুধাবন করার চেষ্টা করলাম। এরা ইংরেজি বুঝে না, যারা বুঝে তারা বলে না! তারপরেও যতটুকু উদ্ধার করলাম তা রহস্যজনক! শিক্ষা, চিকিৎসা কিনতে হচ্ছে। লেখাপড়া করার পর চাকুরীর নিশ্চয়তা নেই। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলো জেঁকে বসেছে সারা রাশিয়া জুড়ে। মানুষের দুঃখ দুর্দশা, বৈষম্য বাড়ছে দ্রুত। তবু পুতিনের জনপ্রিয়তা কমেনি! দেশের শান্তি-শৃংখলা ও রুশ ফেডারেশনের ঐক্যের প্রতি যে হুমকি সৃষ্টি করেছিল তা মোকাবেলায় দৃঢ়তা প্রদর্শন, ন্যাটো সামরিক জোটের হুমকি মোকাবেলায় সফলতা, মধ্যেপ্রাচ্যসহ বিশ্ব রাজনীতিতে পরাশক্তি হিসেবে ফিরে আসা পুতিনের জনপ্রিয়তার কারণ। তবে তারা ১৯তম বিশ্ব ছাত্রযুব উৎসবের আয়োজন করেছে সর্বশক্তি দিয়ে। আয়োজনটি ছিল বিশাল, কিন্তু গুছানো। বাংলাদেশের বেশিরভাগেরই আবাসন ছিল রকসিডমের ‘সাপফির’ হোটেলে। আবাসন থেকে সম্মেলন স্থলে যেতে বাসে লাগে ১৫ মিনিট। উৎসবের বর্ণিল রঙে রাঙানো শত শত বাস প্রতি ১০ মিনিট পর পর আসা-যাওয়া করতো। বিভিন্ন সেমিনার, রাশিয়ার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রর্দশনের সাথে সাথে প্রতিদিনই ছিল খেলাধুলার প্রতিযোগিতা। ফুটবল, সাইক্লিং, ইনডোর গেমস, অ্যাথলেটিক্সসহ সব ধরনের খেলাধুলার আয়োজন ছিল উৎসবে। এরমধ্যে ১৬ অক্টোবর ম্যারাথনে পদক জিতেন যুব ইউনিয়নের জোনাকী জাহান ও উদীচীর শুভ্রা কর। রাশান প্রযুক্তির প্রদর্শনীটি ছিল অসাধারণ। কী চিকিৎসার ক্ষেত্রে, কী যুদ্ধ ক্ষেত্রে বা রোবট, সব কিছুতেই চমক লাগানো ব্যাপার-স্যাপার! ‘সোফিয়া’ টাইপ একটি রোবট দাঁড় করিয়ে রেখেছে। যে যাই জিজ্ঞেস করে, উত্তর দিয়ে দেয়! আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি বলায় একটি বিস্ময়কর তথ্য দেয় বাংলাদেশ সম্পর্কে, যা আমি হজমও করতে পারিনি আবার ফেলতেও পারিনি! অন্যান্য রোবটগুলো ফুটবল খেলল, গিটার দিয়ে গান গেয়ে শুনাল! সুমনকে তাদের প্রজাতি মনে করে জড়িয়ে ধরল! পদার্থ বিজ্ঞানের অনেক নতুন উদ্ভাবন তারা দেখাল। শাবিপ্রবি ও পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজিয়া চৌধুরী তা বুঝিয়ে দেয়ার পরও অপদার্থরা সবগুলো বুঝলাম না। তবে উনার বিস্ময় দেখে অনুধাবন করলাম, পদার্থ বিদ্যায় রাশান অগ্রসরতা।

মূল মিডিয়া সেন্টারের ১২ নং ব্লকটি ছিল আমাদের দখলে! এর ভেতরে বিশাল বিশাল ১০টি হল। হলগুলোর নামকরণ করা হয়েছে চে, ফিদেল কাস্ত্রো, লেলিনসহ বিপ্লবীগণের নামে। দুটি হলে টানা ৫ দিন বসে সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী আদালত। কিউবাসহ তিনটি দেশের অভিযোগের ভিত্তিতে আদালত যুক্তরাষ্ট্রকে দোষী সাব্যস্ত করে। অন্য ১১টি ব্লকের ১১০টি হলে চলে রাশিয়ান সরকারের অনুষ্ঠান। উৎসবে এক এক দিন এক এক দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। দিবসগুলো ছিল আমেরিকান দিবস, আফ্রিকান, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় দিবস ইত্যাদি। শেষের দিকে ছিল বাংলাদেশের অনুষ্ঠান। এতে ‘জাতীয় সম্পদের অপব্যবহার’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক এম.এম আকাশ। এনপিসি’র সদস্য সচিব হাফিজ আদনান রিয়াদের সঞ্চালনায় ভারত, নেপাল, শ্রীলংকার প্রতিনিধিরাও এতে বক্তব্য রাখেন। ‘নারীর প্রতি সহিংসতা’ সেমিনারে বক্তব্য রাখেন সিপিবি নেত্রী তাহমিনা ইয়াসমিন নীলা। ‘উচ্চ শিক্ষা বেসরকারিকরণ’ সেমিনারে বক্তব্য রাখেন ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সভাপতি জিলানি শুভ। আরেকটি সেমিনারে বক্তব্য রাখেন যুব ইউনিয়ন নেতা ডাঃ সাজেদুল হক রুবেল। সবার শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জমশেদ আনোয়ার তপন ও প্রবীর সরদারের নেতৃত্বে চলে অনুষ্ঠান। তাছাড়া প্রতিদিনই আমরা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে হৈ চৈ করে পুরো সম্মেলন স্থল একবার ঘুরে আসি। পরবর্তীতে অন্তত একশটি দেশ আমাদের ফলো করে।
সেমিনারগুলোতে বিশ্বের বিশিষ্টজনদের সাথে আমাদের দেখা হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে কাঙ্খিত হচ্ছেন সারা বিশ্বের বিপ্লবের রোল মডেল চে গুয়েভারার মেয়ে অ্যলাইদা গুয়েভারা! চে’ র পবিত্র রক্তের উত্তরাধিকারের সাথে পরিচিত হতে পেরে, কথা বলতে পেরে আমরা রীতিমত আবেগে আপ্লুত। তিনি আমাদের সঙ্গে ছবি উঠলেন, গান গেয়ে শুনালেন, চে- গুয়েভারার সকল ছবি সম্বলিত একটি বিশাল গ্রন্থ আমাদের উপহার দিলেন। সারা জীবন এই সুখস্মৃতি আমাদের প্রেরণা যোগাবে।1-
এবারের উৎসব রাশিয়াতে আয়োজনের ক্ষেত্রে উফডি’র আবেগ ছিল রুশ বিপ্লবের শতবর্ষ পূর্তি। কিন্তু পুতিন সরকার কিছু কিছু ক্ষেত্রে মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদের সঙ্গে আপোষ করেছে। সুইডেনের আনা হেনাকে ‘বয়কট ইসরাইল’ লিখা টি-শার্ট পড়ার ‘অপরাধে’ রাশিয়া থেকে বহিষ্কার করা হয়। বাংলাদেশ সংহতি সভা করতে চেয়েছিল রোহিঙ্গা ইস্যুতে, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন সেমিনারে জোর করে মাইক বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে ‘উফডি’ আয়োজক হতে আগ্রহী দেশগুলোর প্রতি কঠোর হতে হবে। নিরাপত্তার বাড়াবাড়ি ছিল। তবে তার সংগত কারণ আছে। এর আগে এই শহরে বিদেশীদের উপর জঙ্গি হামলা হয়েছে।
আমরা ২১অক্টোবর বিকেলে মস্কোর উদ্দেশ্যে সোচি ছাড়ি। তার আগের দিন ঘুরে আসি সোচি পার্ক। এটি বিশ্বের ১০টি শ্রেষ্ঠ পার্কের একটি। এটি এতো সুপরিকল্পিত যে, এর বর্ণনা লিখার কল্পনাও করতে পারছি না! উৎসবে অংশগ্রহণকারী হিসেবে এই ব্যয়বহুল পার্কটি আমরা ফ্রি উপভোগের সুযোগ পাই। ঐদিন সকালে আমরা যাই শহর থেকে ৫০ মাইল উত্তরে একটি পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্রে। সেখানে কেবল কারে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে অক্টোবরেই বরফের নাগাল পেয়ে যাই।
আমরা যাওয়ার মতো দেশে ফেরার ক্ষেত্রেও ৩ গ্রুপে ভাগ হয়ে ফিরি। যাওয়া সময় শত বাঁধা, ফিরে আসাটা শান্তিময় হবে, সেই দূরাশা কেউ করিনি। সোচি থেকে আড়াই ঘন্টায় মস্কো পৌঁছি রাত ৮টায়। হাজারো উৎসবকারী মস্কো ফিরছে বলে বিশাল প্লেন। প্লেনেই দেখা হয়ে গেল রাশান জাতীয় হ্যান্ডবল দলের খেলোয়ারদো সঙ্গে। মস্কো এয়ারপোর্টে পৌছে আমরা বাংলাদেশগামী প্লেন মিস হওয়ার ভয়ে আর হোটেলে গেলাম না। সেখান থেকে ট্যক্সি নিয়ে রাতেই রওয়ানা হয়ে গেলাম নির্ধারিত অন্য এয়ারপোর্টে। দুই ঘন্টা জার্নি করে রাতের মস্কো দেখতে দেখতে গন্তব্য এয়ারপোর্টে চলে এলাম। কিন্তু ট্যক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে ভাষাগত সমস্যা দেখা দিল, তা জাতিগত সমস্যায় রূপান্তরিত হওয়ার পূর্বে কোনমতে রক্ষা পাওয়া গেল। ১৮৮টি দেশের ২৫ হাজার তরুণদের এই মহামিলন ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও আনন্দের। স্বেচ্ছাসেবক ছিল প্রায় পাঁচ হাজার। তারা সেবার জন্য ছিল আপ্রাণ চেষ্টারত। কারণ এ চ্যালেঞ্জে তারা সফল হলে রাশিয়ায় আসন্ন বিশ্বকাপ ফুটবলে আবারও স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার সুযোগ পাবে।
মূলত; ১৯ অক্টোবর থেকেই বাজতে থাকে বিদায়ের করুন সুর। বিভিন্ন দেশ একে একে বিদায় নিতে থাকে। বিদায়ের আগে উৎসবে উপহার হিসেবে পাওয়া ডাইরীতে একে অন্যকে উইশ করতে থাকি। ডাইরী সবাই লিখি যার যার ভাষায়। এই ডাইরীটিই এখন এক ইতিহাস। শতাধিক দেশের ভাষা যে এটি ধারণ করে আছে! আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জালাল ভাই ও ভাবী ড. নাজিয়া চৌধুরীর প্রতি। অভিভাবক হিসেবে সারাক্ষণ আমাদের ভরসাস্থল হিসেবে ছিলেন। কৃতজ্ঞতা যুবনেতা পিনাক, অ্যাড মাসুক, সিপিবি নেতা যাদুর প্রতি। পিনাক আমার প্রথম দিকের ভিসা জটিলতায় বুক চিতিয়ে লড়েছেন। শুভ কামনা সুমনের প্রতি। তার কলেজ জীবনে শেখা ইশারা, ইংরেজী না জানা রাশানদের সাথে তথ্য আদান প্রদানের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে আমাদের সুফল দেয়ার জন্য। কৃতজ্ঞতা এম.এম আকাশ স্যার, কেন্দ্রীয় যুব ইউনিয়নের দুই কান্ডারী সোহেল ভাই ও রিয়াদ ভাইয়ের প্রতি। রিয়াদ ভাই প্রাণান্ত ছোটাছুটি করে বাংলাদেশকে বিশ্ব উৎসবে একটি ভাল অবস্থানে নেয়ার চেষ্টা করেছেন। সোহেল ভাই একাদশ শ্রেণিতে পড়া তাঁর মেয়ে প্রকৃতিকে নিয়ে উৎসবে গেছেন। আকাশ স্যারকে প্রথম প্রজন্ম ধরলে,  রাশিয়া থেকে আমরা একসঙ্গে তিন প্রজন্ম ঘুরে এলাম। ভালো ও আলোর দিক হলো আমরা সবাই সুস্থ্য শরীরে ফিরে আসতে পেরেছি। ৮৮ জনের বিশাল বহরের ক্ষেত্রে এটি খুব সহজ নয়। শেষের দিকে উৎসব কমিটি ২০ জন উদীয়মান অংশগ্রহণকারীর নাম ঘোষণা করেন। এই গৌরবের অংশীদার হন বাংলাদেশের দুজন! যুব ইউনিয়ন নেতা মু. ইব্রাহিম ও ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি জিলানী শুভ।
উৎসবে বাংলাদেশকে সার্বিক সহায়তা দিয়েছে বাঙালি বংশোদ্ভূত রুশ আনিতা ধরের নেতৃত্বে ৪ জন স্বেচ্ছাসেবক। বাকীরা হলেন ম্যাক্সিম, ভায়োলেটা ও এনেসতেশিয়া। বিদায়ের চূড়ান্ত মুহুর্তে আমাদের স্বেচ্ছাসেবক ম্যাক্সিমের চোখ ছলছল করতে থাকল! তা ঢাকার জন্য সে অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরাল। আমাদের জন্য সাদার এই আবেগ আশা করিনি। শেষ বেলায় জালাল ভাই স্যুভিনি হিসেবে তাকে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের একটি জার্সি উপহার দিলেন। আমরা সবাই রাশিয়ায় ১৫ দিন অবস্থানকালে বাংলাদেশ সম্পর্কে এদের ভাল ধারণা দেয়ার চেষ্টা করে সম্ভবত সফল হয়েছি। ম্যাক্সিমকে গুণের ভাষায় বলা যেত-

                                                                     “ নিজের জলেই টলমল করে আঁখি,
                                                                    তোমার চোখের অশ্রু কোথায় রাখি? ”
                                                                                                                                 (সমাপ্ত)



আরো খবর