রাষ্ট্রহীন নাগরিক থেকে বিশ্বনাগরিকে রূপান্তর কখন?

পৃথিবীকে এখন গ্লোবাল ভিলেজ বা বৈশ্বিক গ্রাম নামে ডাকা হয়। বিজ্ঞান ও ট্যাকনোলজির অভূতপূর্ব উন্নয়নের ফলে সীমানা বা দূরত্ব এখন আর মানুষকে বিন্দুমাত্র ভাবিত করে না। কোন আধিকারিকের এখন আর আটপৌরে অফিসের প্রয়োজন হয় না। একটি ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট সংযোগ তাকে সর্বগামী করে তুলেছে। সে অটোয়ায় বসে ফ্রান্সের অফিস যেমন চালনা করতে পারে তেমনি প্যারিসের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে সে মন্ট্রিল অফিসকে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দিতে পারছে। কার্ল মার্কস নামক জগদ্বিখ্যাতি সমাজবিজ্ঞানী রাষ্ট্রহীন এক ও অভিন্ন পৃথিবীর কথা বলেছেন। তিনি বলছেন রাষ্ট্র হলো শ্রেণি শোষণের হাতিয়ার। রাষ্ট্র থাকলেই একটি শ্রেণি আরেকটি শ্রেণির উপর প্রভুত্ব খাটাবে, একটি রাষ্ট্র অপর আরেকটি রাষ্ট্রের উপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করবে। যা এতদিনকার বিশ্বসভ্যতায় আমরা দেখে দেখে অভ্যস্ত। মার্কসের মতে শোষণ-যন্ত্র শ্রেণির বিলুপ্তি ঘটার সাথে সাথে সারা পৃথিবী একটি দেশ হয়ে উঠবে, তিনি এর নাম দিয়েছিলেন সাম্যবাদ। সাম্যবাদী বিশ্ব-রাষ্ট্রে থাকবে না মানুষ কর্তৃক মানুষের উপর আধিপত্য কিংবা মানুষ কখনও শোষণের উপলক্ষ হয়ে উঠবে না। সারা পৃথিবীর যত সম্ভাবনা যত ঐশ্বর্য যত সম্পদ তার সবগুলোর উপর বিশ্ব নাগরিকদের থাকবে সমান অধিকার। মার্কস কথিত সাম্যবাদ তথা রাষ্ট্রের বিলুপ্তি বিষয়ক তত্ত্বটি এখনও বাস্তব চিন্তার মধ্যে আসছে না। কিন্তু আমাদের চলমান বিশ্ব ব্যবস্থাও ক্রমশ ব্যক্তিকে সর্বদেশীয় করে তুলছে। এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা আটকানোর কারও সাধ্য নেই। এ হলো গতিময় সমাজের নিয়ম। এমন এক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আজকেও আমরা পৃথিবীরই বিভিন্ন অংশের কিছু মানুষকে রাষ্ট্রহীন করে তুলছি। অর্থাৎ একটি রাষ্ট্র ঘোষণা দিয়ে বলছে ওই মানুষগুলো আমাদের নয়। পৃথিবীর বাকি রাষ্ট্রগুলোও এই মানুষগুলোর দায়িত্ব স্বীকার করে না। ফলশ্রুতিতে এরা পরিণত হয় উন্মূল অবাঞ্ছিত পরিচয়হীন মানবসত্তায়। আমাদের দেশের দুইদিকে দুই রাষ্ট্রে এমন অবস্থা আমরা দেখছি। বার্মার রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে গত কয়েক দশক ধরে নির্মূলকরণের পাশবিক চেষ্টায় নিয়োজিত মিয়ানমার সরকার। উন্মূল রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ এখন বাংলাদেশে আশ্রিত। এরা বার্মা থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশের সমস্যা বাড়িয়ে তুলেছে। অন্যদিকে ভারতের আসাম রাজ্যে গত সপ্তাহের অন্তিম দিনে রাষ্ট্রীয় ঘোষণার মধ্য দিয়ে ১৯ লাখ লোক, যার আঠারো লাখই বাঙালি, অনাগরিক করে দেয়া হয়েছে। মিয়ানমার ও ভারতের মধ্যে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি এখন এই দুই সংকটের মধ্যে পড়ে ত্রিশঙ্কু অবস্থায় পতিত হয়েছে।
মানুষ জ্ঞানে বিজ্ঞানে উৎকর্ষতা সাধন করেছে সত্য। কিন্তু মানুষ কার্যত নিজেকে এখনও মানবিক শুভবোধ দ্বারা উজ্জ্বল করে উঠতে পারেনি। এই পৃথিবীটা যেন অল্প কিছু সংখ্যক মানুষের দ্বারা অপর বহুসংখ্যক মানুষকে নিপীড়ন করার যন্ত্র বিশেষ। এই নিপীড়নের ফলেই দেশে দেশে নানা সংকট, নানা সমস্যা। এই নিপীড়ক চেহারার কারণেই মানব জাতির জন্য যুদ্ধ ও ধ্বংসই হয়ে উঠেছে একমাত্র ভবিতব্য। এই পৃথিবীর মানুষগুলো কি কখনও মানবিক শুভ সত্তায় বিকশিত হয়ে মহালোকে আলো ছড়াবে না? এত উন্নতির পরও মানব সভ্যতার গভীর ক্রন্দনের কারণ এইটিই।
পৃথিবী ব্যাপী যে অশান্তি আর মর্মপীড়ার মহামারি, সেখান থেকে উদ্ধারে আমাদের রাষ্ট্রহীন সাম্যের পৃথিবীর পথেই হাঁটতে হবে। কিন্তু সেই কল্পলোকের স্বপ্ন তো অনেক দূরের পথ। এর মধ্যেই যুদ্ধ, দুর্যোগ, দূষণ আর শোষণ কবলিত হয়ে আবার না মানব প্রজাতিরই বিলুপ্তি ঘটে যায় সেই প্রশ্নটিও প্রাসঙ্গিকভাবে সামনে চলে আসে। রাষ্ট্রহীন, অধিকারহীন নাগরিকরা কবে বিশ্বনাগরিক হয়ে উঠবে আর জ্যোতিষ্কম-লীর মাঝে বিন্দুসম পৃথিবীর আলো জোনাকি পোকার মতো নিঃসীম আকাশে মিটিমিটি জ্বলবে?