রাসূলুল্লাহর (সা.) নেতৃত্বে মুসলমানদের ঐতিহাসিক বিজয়

সু.খবর ডেস্ক
দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রোজায় মদিনা শরীফের ৮০ মাইল দূরে বদর প্রান্তের রাসূলুল্লাহর (সা.) এর নেতৃত্বে মক্কার কাফির তথা কুরাইশদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ। যা ছিল কাফিরদের বিরুদ্ধে মুখোমুখি মুসলমানদের প্রথম যুদ্ধ। মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি নিয়ে মহানবী (সা.) সশস্ত্র সহস্রাধিক কাফিরের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য লড়াই করে শেষ পর্যন্ত ইসলামের বিজয় নিশানা ছিনিয়ে আনেন। এই যুদ্ধে আল্লাহর তাআলা তার প্রিয় হাবিবকে ফেরেশতা পাঠিয়ে সরাসরি সাহায্য করেন। এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার মধ্যদিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের উত্থান শুরু হয় এবং এটি শেষ হয় মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে। আর রাসূল (সা.) পরিণত হন বিশ্বের সর্বকালের একজন বিচক্ষণ, উদার ও পরাক্রমশালী সেনানায়ক, রাজনীতিবিদ ও সুবিবেচক শাসক হিসেবে। তাই মাহে রমজানের এই দিনের গুরুত্ব মুসলমানদের কাছে অপরিসীম। মুসলমানরা যদি পরাজিত হতো তাহলে ইসলামের হয়তো নাম নিশানা মুছে যেতো। এ যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার মধ্যদিয়ে মুসলমানদের যাত্রা শুরু হয়।
মুসলমানদের কাছে সত্য, ন্যয় নিষ্ঠার শক্তি সাহস ও প্রেরণা বৃদ্ধি পায় এবং অন্য ধর্মাবলম্বীগণও ইসলাম যে একটি সত্য ধর্ম ও এই ধর্মের আধ্যাত্মিক শক্তি সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন।
বদর য্দ্ধু প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তার কোরআনে পাকে এরশাদ করেন, স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছিলে, তিনি তা কবুল করেছিলেন এবং বলেছিলেন, আমি তোমাদের সাহায্য করব এক হাজার ফেরেশতা দিয়ে, যারা একের পর এক আসবে।
আল্লাহ তা করেন, কেবল সুসংবাদ দেওয়ার জন্য এবং এ উদ্দেশ্যে, যাতে তোমাদের চিত্ত প্রশান্তি লাভ করে এবং সাহায্য তো শুধু আল্লাহর নিকট থেকেই আসে, আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় —(সূরা আনফাল আয়াত ৯-১০)
প্রকৃতপক্ষে ইসলামের প্রথম যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের আত্মরক্ষামূলক। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম ধর্ম কাউকে আজকের মতো জিহাদের নামে বিনা কারণে মানুষ মারার বৈধতা দেয়নি। বদরের যুদ্ধই এর সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত। অহেতুক অজুহাত সৃষ্টি করে মক্কার কাফিররা চেয়েছিল রাসূলুল্লাহ ও তার সাহাবিদের হঠাৎ আক্রমন করে নিশ্চিহ্ন করে দিতে।
কাফিরদের আক্রমণের খবর পেয়ে প্রতিরোধ করতে গিয়ে আত্মরক্ষার্থে এই যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন আল্লাহর রাসূল (সা.) ও তার সাহাবিগণ। ১৭ রমজান বদর যুদ্ধে আল্লাহ পাকের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)।
এ প্রসঙ্গে হাদিসে পাকে আছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বদরের দিন নবী (সা.) আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে বলছিলেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গিকার পূরণ করার জন্য প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! আপনি যদি চান (কাফিররা আমাদের উপর জয়লাভ করুক) আপনার ইবাদত করার লোক আর থাকবে না।
এমতাবস্থায় আবু বকর (রা.) তার (রাসূলের) হাত চেপে বললেন, আপনার জন্য এ যথেষ্ট। তখন তিনি (রাসূল) এ আয়াত পড়তে পড়তে বের হলেন -‘শত্রুদল শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে।’ (বুখারী, ৬ষ্ঠ খন্ড)
ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মান মর্যাদা অনেক বেশি। এই যুদ্ধে ১৪ জন সাহাবি শহীদ হন। তার মধ্যে রাসূলে পাকের প্রয় চাচা আমীরে হামজা শাহাদত বরণ করেন। অন্যদিকে মক্কার কাফিরদের ৭০ জন সৈন্য নিহত এবং বন্দি হন আরো ৭০ জন। তার মধ্যে তাদের দলনেতা আবু জেহেল ইবনে হিশামও ছিল। মূলত বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারি সাহাবিগণের মান মর্যাদা অনেক বেশি। এই যুদ্ধে যারা শাহাদত বরণ করেছিলেন তাদের জন্য প্রিয়নবী জান্নাতুল ফেরদৌস লাভের ঘোষণা দিয়েছেন।
হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হারিসা (রা.) একজন নওজওয়ান লোক ছিলেন। বদরযুদ্ধে তিনি শাহাদত বরণ করার পর তার মাতা রাসূলে পাক (সা.) এর কাছে এসে বললেন, এয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)! হারিসা আমার কত আদরের আপনি তো অবশ্যই জানেন। সে যদি জান্নাতি হয় তাহলে আমি ধৈয্য ধারণ করবো এবং আল্লাহর নিকট সওয়াবের আশা পোষণ করবো। আর যদি না হয় তাহলে আপনি তো দেখতেই পাচ্ছেন আমি (তার) জন্য যা করছি।
তখন তিনি (রাসূল) বললেন, তোমার কি হলো, তুমি কি জ্ঞানশূন্য হয়ে গেলে? বেহেশত কি একটি? (নাৃ.না) বেহেশত অনেকগুলি, সে তো জান্নাতুল ফেরদৌসে অবস্থান করছে। (বুখারী, ৬ষ্ঠ খন্ড)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণ্তি তিনি বলেন, মুমিনদের মধ্যে যারা অক্ষম নন অথচ ঘরে বসে থাকেন তারা সমান নন। অর্থাৎ বদরের যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী এবং যারা বদরের যুদ্ধে বিরত রয়েছেন তারা সমান নন। (বুখারী, ৬ষ্ঠ খন্ড)
বদরযুদ্ধের বিজয়কে মহানবী (সা.) আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে মুসলমানদের জন্য কল্যাণ ও উত্তম প্রতিদান অভিহিত করেছেন। হযরত আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি স্বপ্নে যে কল্যাণ দেখতে পেয়েছিলাম সে তো ঐ কল্যাণ যা পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তাআলা আমাদের দান করেছেন। আর উত্তম প্রতিদান সম্বন্ধে যা দেখেছিলাম তা তো আল্লাহ আমাদের দান করেছেন বদরযুদ্ধের পর। (বুখারী, ৬ষ্ঠ খন্ড)
মাহে রমজানের এই বদর যুদ্ধের দিনে অন্তত নফসে আম্মারার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হই। বেশি করে ইবাদত বন্দেগী করি। বদরযুদ্ধের এই দিনে আল্লাহপাক আমাদের মুসলমানদের বিভেদ দূর করে রাসূলে পাকের আত্মরক্ষামূলক কৌশল এবং বিচক্ষণ নেতৃত্ব অনুসরণের তওফিক দিন।