রোজায় জুমআর বিশেষ ফজিলত

সু.খবর ডেস্ক
সাধারণত সপ্তাহের অন্যদিনগুলির চেয়ে পবিত্র জুমআর দিনের গুরুত্ব অনেক বেশি। জুমআর এ দিনটিকে মুসলমানদের জন্য এবাদতের দিন বলা হয়। বলা হয় মুসলমানদের সাপ্তাহিক ঈদের দিন। মাহে রমজানে জুমআর দিন হলে এর গুরুত্ব ও মহাত্ম্য কতটুকু বেশি হবে তা সহজে অনুমেয়। রমজানে জুমআর দিনে মুসল্লীদের দোয়া কবুল হয়। বিশেষ করে মাহে রমজানে জুমআর রাতে ও দিনে প্রত্যেক মুহূর্তে দশলাখ গুনাহগারকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় বলে হাদিস শরীফে বর্ণিত রয়েছে। এমন গুনাহগারকে মুক্তি দেওয়া হয় যাদের শাস্তি অনিবার্য্য ছিল।
গুনাহ মাফের দিন :
জুমআর নামাজ মুসলমানদের জন্য সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ এবাদত এবং এই এবাদতে আমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত। মহান আল্লাহ কোরআনুল করীমে এরশাদ করেন, হে ঈমানদারগণ! জুমআর দিনে যখন নামাজের আজান দেয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর ইবাদতের জন্য দ্রুত যাও এবং বেচাকেনা বন্ধ কর। এটা তোমাদের জন্যে উত্তম, যদি তোমরা বুঝতে পারো।’ (সূরা জুমআ : আয়াত ৯)
মাহে রমজানে জুমআর বিশেষ মাহাত্ম্য বর্ণনা করে সাহাবি সৈয়্যদুনা আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, মহানবী রাহমাতুল্লিল আলামীন (সা.) এরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা মাহে রমজানে প্রতিদিন ইফতারের সময় এমন দশলাখ গুনাহগারকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন যাদের গুনাহের কারণে জাহান্নাম অনিবার্য্য (ওয়াজিব হয়েছিল)। একইভাবে মাহে রমজানের জুমআর রাতে ও জুমআর দিনে প্রতিটি মুহূর্তে (বৃহস্পতিবার সূর্যাস্ত থেকে আরম্ভ করে শুক্রবার-জুমআর সূর্যাস্ত পর্যন্ত) এমন দশলাখ গুনাহগারকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন, যারা শাস্তির উপযোগী বলে সাব্যস্ত হয়েছিল। (কানযুল উম্মাল, ৮ম খন্ড ৩ পৃষ্ঠা, হাদিস ২২২৩৭১৬)
জুমআর দিনের ফজিলত বর্ণণা করে বিশুদ্ধ হাদিসগ্রন্থ বুখারী শরীফে অসংখ্য হাদিস বর্ণিত আছে। সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমআর দিন জানাবাত গোসলের ন্যায় গোসল করে, নামাজের জন্য আগমন করে সে যেন, একটি উট কোরবানী করল। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় পর্যায়ে আগমন করে সে যেন একটি গাভী কোরবানী করল। যে তৃতীয় পর্যায়ে আগমন করে সে যেন একটি শিং বিশিষ্ট দুম্বা কোরবানী করল। চতুর্থ পর্যায়ে যে আসল সে যেন একটি মুরগী কোরবানী করল, পঞ্চম পর্যায়ে যে আসল সে যেন একটি ডিম কোরবানী করল। পরে ইমাম যখন খুতবা দেওয়ার জন্য বের হন তখন ফিরিশতাগণ যিকর শোনার জন্য হাজির হয়ে থাকেন। (বুখারী ২য় খন্ড ৮৩৮)
আরেকটি হাদিসে রয়েছে, হযরত সালমান ফার্সী (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি জুমআর দিনে গোসল করে, যথাসাধ্য ভালরূপে পবিত্রতা অর্জন করে, নিজের তেল ব্যবহার করে, নিজের ঘরের সুগন্ধি ব্যবহার করে এরপর বের হয় এবং দুজন লোকের মাঝে ফাঁক না করে তারপর তার নির্ধারিত নামাজ আদায় করে এবং ইমামের খুতবা দেওয়ার সময় চুপ থাকে তাহলে তার জুমআ থেকে আরেক জুমআ পর্যন্ত সময়ের যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। (বুখারী ২য় খন্ড ৮৩৯)
দোয়া কবুলের দিন :
জুমআর দিনকে মুসলমানদের জন্য এবাদতের দিন ও দোয়া কবুল হওয়ার দিন বলা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি মহান দিন। এ দিনটির সম্মান ও মর্যাদার জন্য ইহুদি-নাসারাদের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা দিনটিকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। পরবর্তীতে ইহুদিরা শনিবারকে আর খ্রিস্টানরা রবিবারকে তাদের উপাসনার দিন নির্ধারণ করলেও আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের জন্য শুক্রবারকে ইবাদতের দিন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।
আমিরুল মুমিনিন হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, এক ইয়াহুদি তাঁকে বলল হে আমিরুল মুমিনিন ! আপনাদের কিতাবে একটি আয়াত আছে, যা আপনারা পাঠ করে থাকেন, তা যদি আমাদের ইয়াহুদি জাতির উপর অবতীর্ণ হতো, তবে অবশ্যই আমরা সেই দিনকে ঈদ হিসাবে পালন করতাম, তিনি বললেন, ‘কোন আয়াত’? সে বলল আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।’ (সূরা মায়েদা : আয়াত ৩) হজরত ওমর বললেন, ‘এটি যে দিনে এবং যে স্থানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল তা আমরা জানি। তিনি সেদিন আরাফায় দাঁড়িয়েছিলেন আর সেটা ছিল জুমুআ’র দিন।’ (বুখারি)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মুমিনের জন্য জুমআর দিন হল সাপ্তাহিক ঈদের দিন। তিনি আরও বলেন, “মহান আল্লাহ পাকের নিকট জুমআর দিনটি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনের মত শ্রেষ্ঠ দিন। এ দিনটি আল্লাহর কাছে অতি মর্যাদা সম্পন্ন। (ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমাদ)
হাদিসে আছে, হে মুসলমানগণ! জুমআর দিনকে আল্লাহ্ তাআলা তোমাদের জন্য (সাপ্তাহিক) ঈদের দিন হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। তোমরা এদিন মিসওয়াক কর, গোসল কর ও সুগন্ধি লাগাও।’ (মুয়াত্তা, ইবনু মাজাহ, মিশকাত)
হাদিস শরীফে আরো বলা হয়েছে, জান্নাতে প্রতি জুমআর দিনে জান্নাতিদের হাট বসবে। জান্নাতি লোকেরা সেখানে একত্রিত হবেন। সেখানে এমন মনমুগ্ধকর হাওয়া বইবে, যে হাওয়ায় জান্নাতিদের সৌন্দর্য অনেক গুণে বেড়ে যাবে এবং তাদের স্ত্রীরা তা দেখে অভিভূত হবে। অনুরূপ সৌন্দর্য বৃদ্ধি স্ত্রীদের বেলায়ও হবে। (মুসলিম)
জুমআর রাতে বা দিনে যে ব্যক্তি ঈমান নিয়ে মারা যান; আল্লাহ তাআলা তাকে কবরের আজাব থেকে মুক্তি দেন।’ (তিরমিজি)
জুমআর ফজিলত যদি বলতে হয় তা বলে শেষ করা যাবে না। তারপরও সংক্ষেপে এর কিছু বর্ণনা দেওয়া হলো-
এই পবিত্র জুমআর দিনে হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয়েছিল; এই দিনে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছিল (আবু দাউদ) এবং এই দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল (মুসলিম)
এই দিনে তাঁকে দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছিল, এই দিনেই তাঁর তওবা কবুল করা হযে ছিল এবং এই দিনেই তাঁর রূহ কবজ করা হয়েছিল (আবু দাউদ)
পবিত্র জুমআর দিনেই শিঙ্গায় ফুঁক দেওয া হবে, এই দিনেই কিয়ামত হবে, এই দিনেই সকলেই বেহুঁশ হয়ে যাবে (আবু দাউদ)
জুমআর দিন নিকটবর্তী ফেরেশতাগণ, আকাশ, পৃথিবী, বায়ুু, পাহাড়, সমুদ্র সবই ক্বিয়ামত হবার ভয়ে ভীত থাকে।’ (মুয়াত্তা, ইবনু মাজাহ, মিশকাত)
জুমআর দিন মুসলমানদের এবাদতের দিন, গুনাহ মাফের দিন, দোয়া কবুল হওয়ার দিন। তাই আসুন! মাহে রমজানে সিয়াম সাধণার মাধ্যমে সঠিকভাবে পবিত্র জুমআর নামাজ আদায় করে দিনরাত আল্লাহর দরবারে নিজের পবিরার, মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন ও বিশ্ব মুসলিমের অতীত গুনাহের জন্য ক্ষমা চাই। নিজেদের বিশুদ্ধ ও পরিপূর্ণ করে তুলি।