রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জাতিয়তাবোধের জাগৃতি প্রয়োজন

সম্প্রতি বিশেষ করে ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম বিশেষে রোহিঙ্গা বিষয়ক আলোচনাটি বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। কিছুদিন আগে রোহিঙ্গাদের একটি বৃহৎ সমাবেশ হওয়ার পর এই আলোচনা বেশ বড় আকারে শুরু হয়েছে। আমাদের মূল ধারার গণমাধ্যমগুলোতে এই সমাবেশ হওয়ার পিছনে কার ইন্ধন রয়েছে, কারা এতে অর্থায়ন করেছে, এতে নেতৃত্ব কারা দিচ্ছে; এইসবকিছু বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সরকারও এই সমাবেশের পর বেশ নড়েচড়ে বসেছে। কয়েকটি এনজিওকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বিতাড়ন করা হয়েছে। সার্বিকভাবে এনজিও কার্যক্রমে মনিটরিং বাড়ানো হয়েছে। এইসব আলোচনা থেকে যে বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে সেটি হলো, রোহিঙ্গা সমাবেশে তাদের নেতারা মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশ ফিরে না আসা পর্যন্ত সেখানে প্রত্যাবাসিত না হওয়ার দাবি তুলেছেন। এই দাবিটিকে বিপজ্জনক হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে ওইসব আলোচনায়। তবে মিয়ানমার প্রকৃত পক্ষে কোনো রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে আন্তরিক কিনা সে বিষয়টি এখনও একেবারেই অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে নিয়ম রক্ষার মতো মিয়ানমার কিছু রোহিঙ্গা ফেরত নেয়ার যে ধোয়াশা তৈরি করছে সেটি ¯্রফে বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে ভাওতা দেয়ার উদ্দেশ্যেই। বাংলাদেশ মানবতার মহত্ত্ব দেখাতে যেয়ে মিয়ানমারের পাতানো যে ফাঁদে আটকা পড়েছে সেখান থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো রাস্তা এখনও দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে নেতৃত্বের অভাব প্রকট। তারা স্ববাসভূমে ফিরে যাওয়ার যে সহজাত অধিকার সেটি মুখ ফুটে বলার মতো কোন নেতৃত্ব পাচ্ছে না। এই শূন্যতা পূরণ হচ্ছে কিছু আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর নানামুখী ষড়যন্ত্র ও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়েরই একটু অগ্রসর গুটিকয়েক ব্যক্তির অনাকাক্সিক্ষত আচরণে। রোহিঙ্গা জাতীয়তাভিত্তিক কোন জাগৃতি নেই ওই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীটির মাঝে। এরা বরং আন্তর্জাতিক দান-খয়রাতের উপর নির্ভর করে নিজ দেশের বাইরে থেকে যাওয়াটার মত অসম্মানজনক পন্থাটিকেই পছন্দ করছে। কথিত রোহিঙ্গা সমাবেশে উপযুক্ত পরিবেশের দোহাই দিয়ে মিয়ানমার না যাওয়ার দাবিটি ওই নেতিবাচক রোহিঙ্গা মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। ঐতিহাসিক ভাবে সত্য যে আরাকান প্রদেশটি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আদি বাসস্থান। তারা সেখানকার ভূমিপুত্র। এই জন্মগত অধিকারকে যে জাতি-গোষ্ঠী গুরুত্ব দিতে শিখতে পারেনি সেই জাতিগোষ্ঠী যে অবিকশিত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এদের মধ্যে শিক্ষার অভাব প্রকট। জীবনযাপনের ক্ষেত্রে যাবতীয় পশ্চাদপদতা। কোনোভাবে ক্ষুধা নিবারণ আর সন্তান জন্ম দেয়ার বাইরে এরা কোন গভীর জীবনবোধের সন্ধান পায়নি। ফলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর ক্রীড়নক হয়ে এদের একটি ক্ষুদ্র অংশ যে মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছে তা অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য বিপদজনক। বাংলাদেশকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রোহিঙ্গা সমস্যাটি সামলাতে হবে। নতুবা পুরো বিষয়টি লেজেগোবরে পরিণত হবে যার প্রতিফল ভোগতে হবে বাংলাদেশকেই।
আমাদের দায়িত্ব হবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা। তাদের ভিতর থেকে ব্যাপকভাবে এই আকাক্সক্ষাটি বের করে আনতে হবে যে তারা প্রকৃতপক্ষে মিয়ানমারেরই বৈধ নাগরিক এবং সেখানে ফিরে যাওয়া তাঁদের অলঙ্ঘনীয় অধিকার। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভিতর থেকে যদি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের জোর দাবি তোলা যায় তাহলে মিয়ানমার চাপে পড়বে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছাটাকে জাগিয়ে তোলা। এই জনগোষ্ঠীটি যদি সব ধরনের প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘেরা জীবনে নির্জীবভাবে বছরের পর বছর ধরে অবস্থান করতে থাকে তবে তাদের জাতিগত চেতনা ও স্বদেশের উপর অধিকারবোধ দুর্বল হবে। এদিকে দ্রুত জন্মহারের কারণে বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীটি ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সংহতির জন্য বিপদজনক হয়ে উঠবে। রোহিঙ্গাদের স্বাজাত্যবোধ যত বাড়বে তত মিয়ানমার চাপে পড়বে তাদের ফিরিয়ে নিতে। যেভাবে তাদেরকে জন্মভূমি থেকে বিতাড়ন করা হয়েছে সেইভাবেই তারা যাতে জন্মভিটায় ফিরে যেতে পারে সেই শক্তি ও চেতনা অর্জন করাই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশু লক্ষ হওয়া উচিত।