লক্ষ্মীপূজার প্রচলন যেভাবে

এস ডি সুব্রত
“ওঁ বিশ্বরুপস্য ভার্যামি পদ্মে পদ্মালয়ে শুভে
সর্বতো পাহি মাং দেবী মহালক্ষ্মী নমোহস্তূতে।”
প্রায় প্রতি ঘরেই দেবী লক্ষ্মীর পুজো হয়ে থাকে। লক্ষ্মী হলেন ধন সম্পত্তির দেবী। এ পূজা কোজাগরী লক্ষীপূজা নামেও পরিচিত। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, পূর্ণিমা রাতে দেবী লক্ষী ধনধান্যে ভরিয়ে দিতে বাড়িতে পূজা গ্রহণ করতে আসেন। লক্ষী দেবী সন্তুষ্ট থাকলে সংসারে অর্থকষ্ট থাকবে না ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বাড়বে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর ‘বাংলার ব্রত’ বইতে এই লক্ষ্মী পূজা সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি জানান, দেবীর কাছে ভালো ফলনের কামনা করাই এই পূজার নৃতাত্ত্বিক কারণ।
কোজাগরী লক্ষ্মীর প্রতি আচার নিবেদনের সঙ্গেও একটি লোকবিশ্বাস জড়িত রয়েছে। পূজার সময় মোট ১৪টি পাত্রে উপাচার রাখা হয়। তারপর পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে জল দানের রীতি রয়েছে। কাঠের জলচৌকির ওপর লক্ষ্মীর সরাটিকে স্থাপন করা হয়। এরপর কলাপাতায় টাকা, স্বর্ণ মুদ্রা, ধান, পান, কড়ি, হলুদ ও হরিতকি দিয়ে সাজানো হয় পূজার স্থানটিকে। বৈদিক শাস্ত্র ও বিভিন্ন পুরাণ অনুসারে লক্ষ্মীর উদ্ভব ও পরিচিতি নিয়ে নানা রকম ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কিছু পুরাণ অনুযায়ী লক্ষ্মী দেবসেনা রূপে জন্ম নিয়ে কার্তিকেয়র পত্নী হন। আবার কিছু পুরাণ মতে তিনি গণেশপত্নী। নদীরূপিনী সরস্বতীই আদিতে উর্বরতা ও শস্যদায়িনী দেবী। পরে লক্ষ্মী-সরস্বতী একইরূপে গণ্য হওয়ার সময় থেকে শস্য ও সম্পদের দেবী হিসেবে লক্ষ¥ীকে গণ্য করা আরম্ভ হয়। আবার শস্যের দেবী হিসেবে গণ্য হওয়ার কারণে লক্ষ্মীকে ধরিত্রী বা বসুমতী হিসেবেও ভাবা শুরু হয়। বৈদিক লক্ষ্মী কিন্তু শস্য-সম্পদের দেবী ছিলেন না। বরং নদীরূপিনী সরস্বতী শস্যদাত্রী হিসেবে গণ্য হতেন। কেন? নদী পলি মাটি ভরাট করে উর্বর করত ভূ-তট। এর পরে তো বৈদিক আর্যরা চাষাবাদ শিখল ‘নিম্নবগ’-এর কাছে। সম্পদ এলো আর্যদের হাতে। শাসক বা শোষক হলেন তারা। আবার লক্ষ্মীর স্বামী একটা কাঁচা কাজ করে ফেললেন। দুর্বাসা মুনি, যিনি শুধু অভিশাপ দেওয়ার জন্যই বিখ্যাত। তিনি এক দিন একটা পারিজাত ফুলের মালা উপহার দিলেন ইন্দ্রকে। এরপর ইন্দ্র যখন রম্ভা-সম্ভোগে মত্ত, ওই মালা নিজের বাহন ঐরাবতের গলায় ছুড়ে দেন। হাতি তো মালার কদর বোঝে না। মাথা ঝাঁকিয়ে সেটা সে ফেলে দিল মাটিতে। তারপর পা দিয়ে চেপ্টে দিল। ব্যস! রগচটা স্বভাবের ঋষি অমনি জ্বলে উঠে উচ্চারণ করলেন অভিশাপ। আমার দেওয়া মালা মাটিতে ফেলে দিলে, তাই তোমার ত্রিলোক এখন লক্ষ্মীছাড়া হবে। অর্থাৎ, লক্ষ্মীর নির্বাসন। দোষ করলেন ইন্দ্র, শাস্তি পেতে হবে লক্ষ্মীকে! অভিশাপে ইন্দ্রের ইন্দ্রপুরী হলো শ্রীহীন, লক্ষ্মীছাড়া দশা। স্ত্রী লক্ষ্মী, ইন্দ্রের অনুমতি নিয়ে পাতালে, মানে সমুদ্রে প্রবেশ করলেন। পরে দেবতাদের ব্যাকুল প্রার্থনায় বিষ্ণু পরামর্শ দিলেন সমুদ্র মন্থনের। মন্থনের পর যিনি রত্নাকর থেকে উত্থিতা হলেন, তিনি কিন্তু লক্ষ্মী নন। সেই দেবীর নাম শ্রী। এই শ্রী ও লক্ষ্মী দুই পৃথক দেবী ছিলেন। বেশ কিছু কাল পরে দুজনে মিলেমিশে এক হয়ে যান। লক্ষ্মী দেবী ছিলেন ভৃগুর কন্যা, মায়ের নাম খ্যাতি। তার এক হাতে পদ্ম, আরেক হাতে অমৃতের কলস। তার রূপে-গুণে আকৃষ্ট হয়ে দেব-দানবের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যায়। শেষ পর্যন্ত ছলে বলে বিষ্ণু তাকে পত্নীরূপে গ্রহণ করেন। লক্ষ্মী ও শ্রী একাকার হয়ে বিষ্ণুর পত্নী হন। তিনি পদ্মাসনা আর বাহন শ্বেত পেঁচা। লক্ষ্মী দেবী বাংলার ঘরে ঘরে পূজিত হয়ে আসছেন ধনের দেবী হিসেবে।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।