লর্ডসের মাঠে বাংলাদেশি বংশদ্ভুত তরুণ/ উল্লসিত সুনামগঞ্জের ক্রিকেটাঙ্গন

বিশেষ প্রতিনিধি
লর্ডসে নিউজিল্যান্ড বনাম ইংল্যান্ডের প্রথম টেস্টে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের বংশদ্ভুত তরুণকে দেখে উল্লসিত হয়েছেন সুনামগঞ্জের ক্রিকেটমোদীরা। অনেকে নিজের ফেসবুক আইডিতেও গর্ববোধ করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। লিখেছেন, ‘আমরা গর্বিত ছেলেটির বাবা (মৃদুল দাস) সুনামগঞ্জের মাঠের ক্রিকেটার ছিলেন।’
রবিনকে নিয়ে বৃহস্পতিবার কলকাতার দৈনিক আনন্দ বাজারের অনলাইনেও প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। আনন্দ বাজারের ওই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে,‘তিনি (রবিন) নিকষ্যি বাঙালি। পদবি ‘দাস’। কিন্তু ক্রিকেট খেলেন ইংল্যান্ডের হয়ে! বৃহস্পতিবারের লর্ডস মাঠ দেখেও নিল তাঁকে।
চমকিত হওয়ার মতো ঘটনাই বটে। একদা ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন এক বাঙালি। ঘটনাচক্রে, তিনিই এখন ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বোচ্চ প্রশাসক। কিন্তু ভারতীয় দলে এখন কোনও বাঙালি ক্রিকেটার নেই! কিন্তু বাঙালি ক্রিকেটার আছেন ইংল্যান্ড দলে। চমক!
ভারতীয় দলে শেষ বাঙালি ক্রিকেটার ছিলেন ঋদ্ধিমান সাহা। কিছুদিন আগেই টিম ম্যানেজমেন্ট এবং কোচ রাহুল দ্রাবিড় ঋদ্ধিমানকে জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর ‘সার্ভিস’ টিমের আর প্রয়োজন নেই। ফলে আইপিএল চ্যাম্পিয়ন টিমের সদস্য হয়েও ঋদ্ধিমানের সামনে ভারতীয় দলের দরজা বন্ধ।
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ভারতীয় দলের অধিনায়ক থাকাকালীন বাঙালি তার শ্রেষ্ঠ মর্যাদা পেয়েছে। দলের হস্তক্ষেপে (অনেকে বলেন, অবিমৃশ্যকারিতায়) জ্যোতি বসুকে ১৯৯৬ সালে ভারতের প্রথম বাঙালি প্রধানমন্ত্রী দেখতে চেয়েও হতাশ হয়েছিল বাঙালি। ঘটনাচক্রে, সেই ১৯৯৬ সালেই লর্ডসে সৌরভের টেস্ট অভিষেক হয়েছিল। কিন্তু তিনি যে ভারতীয় ক্রিকেটের রাজ সিংহাসনে বসবেন, তা বাঙালি তাদের অতিবড় ‘ফ্যান্টাসি’-তেও ভাবেনি।
সৌরভের পর ‘বাঙালি’ বলে টেস্ট দলে ঋদ্ধিমান। তাঁরও সময় শেষ হয়ে গেল। সেই আবহেই লর্ডসে ইংল্যান্ডের হয়ে মাঠে নামতে দেখা গেল এক বাঙালিকে রবিন দাস।
বৃহস্পতিবার লর্ডসে শুরু হয়েছে নিউজিল্যান্ড বনাম ইংল্যান্ডের প্রথম টেস্ট। ৩৮ তম ওভারে ফিল্ডিং করতে নামলেন এক তরুণ। কিন্তু তাঁর জার্সিতে না আছে কোনও নাম, না আছে নম্বর। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তাঁর নাম ‘রবিন জেমস দাস’। নিখাদ বাঙালি। পশ্চিম নয়, পূর্ব বাংলার। কিন্তু বাঙালি তো বটেই।
রবিন অতিরিক্ত ফিল্ডার হিসাবে মাঠে নেমেছিলেন বৃহস্পতিবার। যদিও মাত্র চারটি ডেলিভারির সময় মাঠে ছিলেন তিনি। রবিন যখন মাঠে নামেন, তখন লর্ডস টেস্টে প্রথম একদশে সুযোগ না-পাওয়া হ্যারি ব্রুক এবং ক্রেগ ওভারটন অতিরিক্ত ফিল্ডার হিসাবে মাঠে ছিলেন। বাইরে গিয়েছিলেন স্টুয়ার্ট ব্রড। তার পরেও ম্যাটি পট্স চোট পাওয়ায় তৃতীয় একজন ক্রিকেটার দরকার ছিল। তাঁর জায়গাতেই ফিল্ডিং করেন রবিন। পটসের অসমাপ্ত ওভার শেষ করেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক বেন স্টোকস। সেই ওভার শেষ হতেই মূল দলের ব্রড মাঠে ফেরেন এবং রবিন উঠে যান। ঘটনাচক্রে, ইংল্যান্ডের ১৩ জনের যে দল ঘোষণা করা হয়েছিল নিউজিল্যান্ড সিরিজের জন্য, সেই দলে রবিনের নাম নেই! কিন্তু আপৎকালীন পরিস্থিতিতে তাঁকে মাঠে নামতে বলে টিম ম্যানেজমেন্ট।
রবিনের জন্ম ইংল্যান্ডের লেটনস্টোনে। কিন্তু তাঁর শিকড় বাংলাদেশে। বাবার জন্ম বাংলাদেশের সুনামগঞ্জে। ব্রেন্টউড স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। রবিনের বয়স ২০ বছর। ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে খেলেন এসেক্সের হয়ে। এখনও পর্যন্ত মাত্র একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন রবিন। ২০২০ সালের সেই ম্যাচে তিনি করেছিলেন ৭ রান। তবে ২০১৮ সালে এসেক্সের অনূর্ধ্ব-১৬ দলের হয়ে দ্বিশতরান করেছিলেন এই বাঙালি। এসেক্স দ্বিতীয় একাদশের হয়েও খেলেছেন তিনি।
বস্তুত, তিনি লর্ডসে ফিল্ডিং করতে নামার পর এসেক্স কাউন্টি টুইটারে রবিনকে শুভেচ্ছাও জানিয়েছে। কাউন্টির তরফে ইংল্যান্ডের হয়ে ‘টুয়েলফ্থ ম্যান ডিউটি’ করার জন্য রবিন এবং তাঁর সতীর্থ নিখিল গোরান্টলাকে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। যা থেকে স্পষ্ট যে, ইংল্যান্ডের হয়ে এই বাঙালির মাঠে নামাকে গুরুত্ব দিয়েই দেখছে তাঁর কাউন্টি।
প্রসঙ্গত, এসেক্সের দ্বিতীয় একাদশের হয়ে খেলেন রবিনের দাদা জোনাথন দাস জনি। তিনি উইকেটরক্ষক। এসেক্সের ক্রিকেট বোর্ডের ডিরেক্টর জাওয়ার আলি বলেছেন, “ভাল লাগছে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে দেখে। আশা করব ভবিষ্যতে রবিন ইংল্যান্ডের হয়েও খেলবে।’
এদিকে, রবিনের এই সাফল্য সুনামগঞ্জের ক্রিকেটাঙ্গনকে অনুপ্রাণিত করেছে।
সুনামগঞ্জের প্যারামাউন্ট ক্রিকেট ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ বললেন, আমরা খুশি, তার বাবার বাড়ি মেঘপাহাড়ের জেলা শহর সুনামগঞ্জে। আমরা মূল একাদশে তাঁকে দেখার প্রত্যাশা নিয়ে থাকবো।’
সুনামগঞ্জ আম্পায়ার্স এসোসিয়েশনের সদস্য মাহবুবুল হাসান শাহীন বললেন, ক্রিকেটের যে উচ্চতায় রবিন পৌঁছেছে, সেটি অনেক গর্বের, রবিনের বাবাকে এই শহরেরই মনে করেন সুনামগঞ্জবাসী, এজন্য বিষয়টি সুনামগঞ্জবাসীর গর্বের।’
জেলা ক্রীড়া সংস্থার ক্রিকেট বোর্ডের সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাউন্সিলর রেজওয়ানুল হক রাজা বললেন, রবিনের বাবা মৃদুল দাসও একজন ভালো ক্রিকেটার ছিলেন। তিনি সুনামগঞ্জ ফ্যান্টম গ্রুপের সংগঠক ছিলেন। রবিনের বড় ভাই জোনাথন দাস জনিও সুনামগঞ্জ মাঠে টুর্নামেন্টে কয়েক বছর আগেও এসে খেলেছে। আমরা বাংলাদেশের প্রান্তিক শহর সুনামগঞ্জের মানুষ রবিনকে ইংল্যান্ডের মূল একাদশে দেখার প্রত্যাশায় থাকবো।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান ইমদাদ রেজা চৌধুরী বললেন, রবিনের নামের সঙ্গে বাংলাদেশ এসেছে, এসেছে সুনামগঞ্জের নামও আমরা তার সাফল্য কামনা করছি।’
রবিনের জেঠু মিলন দাস বললেন, আমরা খুশি, আমরা একসময় মনে করতাম রবিনের বড় ভাই জোনাথন পেশাদার ক্রিকেটার হবে, এখন সে বড় চাকুরি করছে, রবিন তার স্থান নিয়েছে, আমাদের পরিবারের সকলেরই ক্রিকেটের প্রতি আলাদা ভালোবাসা রয়েছে।
উল্লেখ্য, সুনামগঞ্জ শহরের উকিলপাড়ার বাসিন্দা জিতেন্দ্র কুমার দাসের ছেলে মৃদুল দাস রবিনের বাবা। তার মায়ের নাম জর্জিনা দাস (মৃদুল দাসের স্ত্রী) তিনি লন্ডন সিটির বাসিন্দা। এই পরিবারের অনেকেই এখন সিলেট শহরে (৮৯/৪ মৃত্তিকা, কাজল শাহ) বসবাস করছেন।