লীলা এষ সংগ্রহ: আলো ছড়াবে নতুনের মাঝে

খলিল রহমান
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি। কারো কাছে শুধু পাবলিক লাইব্রেরি, আবার কারো কাছে জগৎজ্যোতি পাঠাগার হিসেবে পরিচিত। শহর সুনামগঞ্জের কেন্দ্রে অবস্থান। আমাদের বাতিঘর। একদা টিনের ঘরে যাত্রা শুরু হলেও এখন সেটি সুরম্য ভবনে। আলোর পরশ ছড়িয়ে এবার ৬০ বছরে পা দিল এটি। কাগজেপত্রে শুরুর দিন ১৭ জুন, ১৯৫৯ ইংরেজি। শুরুতে নাম ছিল কেবল সুনামগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি। কালে কালে এই নাম পরিবর্তন হয়েছে। এখন ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি’। জগৎজ্যোতি আমাদের বীর সন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধা। এই শহরের কিছু আলোকিত মানুষ মিলে এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই যে শহর বললাম, তখন কি এটা শহর ছিল? সেই মানুষজনের কেউ-ই আজ এই ধরায় নেই। এই মানুষগুলোর কথা চিন্তা করি। কি অসাধারণ মানুষ ছিলেন তাঁরা। তাঁরা নমস্য, পূজনীয়।
লাইব্রেরি ভবনটি এখন দু’তলা। উপরে মিলনায়তন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। নিচে পাঠকক্ষ, সাধারণ সম্পাদক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসার আলাদা কক্ষ রয়েছে। বই আছে উপরে, নিচে, সবখানে। যেন বইয়ের ভান্ডার এই পাঠাগার। কত শত বই। নতুন-পুরোনো। লাইব্রেরিতে এখন বইয়ের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। সদস্য আছেন প্রায় সাত শ’। পাঠকদের জন্য প্রতিদিন বিকেলে লাইব্রেরি খোলা থাকে। পাঠকেরা আসেন, পত্রিকা, বই পড়েন।
পাঠ কক্ষটি বিশাল। চারদিকে বইয়ের সমারোহ। সাজানো-গোছানো। এই কক্ষে ঢুকতেই বা দিকে চোখে পড়বে একটি আলাদা কর্নারের। এই কর্নারের নাম ‘লীলা এষ সংগ্রহ’। লীলা এষ এই লাইব্রেরির আজীবন সদস্য ছিলেন। নারীদের মধ্যে তিনিই নাকি লাইব্রেরির প্রথম সদস্য। ষাটের দশকের মাঝামাঝি তিনি এই শহরে আসেন বৈবাহিক সূত্রে। এরপর পাঠাগারের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আজীবন বই পড়েছেন লীলা এষ। পাঠাগারের পরম বন্ধু ছিলেন তিনি। শেষমেষ তাঁর নামটি পাঠাগারে স্থায়ী হলো ‘লীলা এষ সংগ্রহ’ কর্নার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এটি আমাদের জন্য গর্বের। ২০১৫ সালের শেষ দিকে এটি করা হয়। ‘লীলা এষ সংগ্রহ’ কর্নারে বইয়ের সংখ্যা তিন হাজার ৮০৭টি।
লীলা এষ আমাদের অতি আপনজন, শ্রদ্ধার মানুষ ছিলেন। সুনামগঞ্জের কৃতী সন্তান দেশের খ্যাতিমান প্রচ্ছদ শিল্পী ধ্রæব এষের মা তিনি। ধ্রæব এষ সুনামগঞ্জের একজন আলোকিত মানুষ। তাঁকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। মূলত ধ্রæব এষের চেষ্টা ও উদ্যোগে পাঠাগারে ‘লীলা এষ সংগ্রহ’ কর্নার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এই কর্নারে থাকা অধিকাংশ বইয়ের প্রচ্ছদ তিনি করেছেন। প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ গ্রন্থ, ভ্রমণ কাহিনী, সায়েন্স ফিকশন, মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি সব বিষয়ের বই আছে এই কর্নারে।
২০১৫ সালের কথা। আমি তখন পাঠাগারের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। একদিন শামীম ভাই (সাংবাদিক, আ. লীগ নেতা ইশতিয়াক শামীম) আমাকে জানান ধ্রæব দা’র ইচ্ছে তাঁর কাছে থাকা কয়েক হাজার বই তিনি পাঠাগারে দিতে চান। সেই বইগুলো নিয়ে তিনি তাঁর মায়ের নামে পাঠাগারে একটি কর্নার করে দেবেন। বিষয়টি নিয়ে আমি পাঠাগারের সভায় যেন আলোচনা করি। বিষয়টি পাঠাগারে কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় তুলতে সবাই অত্যন্ত আন্তরিকভাবে নেন। এরপর শামীম ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং পরে ধ্রæব দা ঢাকা থেকে বই পাঠিয়ে দেন। পাঠাগারের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ‘লীল এষ সংগ্রহ’ কর্নার স্থাপন করা হয়। পাঠাগারে এ ছাড়া আরও দু’টি বিশেষ কর্নার আছে, এর একটি হলো মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক এবং অন্যটি সুনামগঞ্জ বিষয়ক।
সুনামগঞ্জের খবর’র বর্ষপূর্তি সংখ্যার কাজ চলছে। সম্পাদক পঙ্কজ দা হঠাৎ করেই বলে বসেন, এই কর্নার নিয়ে একটা লেখা ছাপাতে। আমি সম্মতি দিই। পরে একদিন বলেন আমাকেই কিছু লিখতে হবে। ঈদের বন্ধ সামনে, প্রেসে ছাপার তাড়া আছে, তাই লেখাটি একদিনের মধ্যে দিতে হবে। বাধ্য হয়ে এক দুপুরে ধ্রæব দা’র বাসায় যাই। সেখানে চা খেতে খেতে কয়েক মিনিট কথা হয় সিদ্ধার্থ দা এবং তাঁর স্ত্রী রুপালী সোমের সঙ্গে। চার ভাইয়ের মধ্যে ধ্রæব এষ সবার বড়। এরপর সিদ্ধার্থ এষ, সুবীর এষ ও সুমিত এষ।
এই যে ধ্রæব এষ আজ দেশখ্যাত প্রচ্ছদ শিল্পী ও লেখক তাঁর পেছনে আছেন মা লীলা এষ। তাঁর সব ছেলেরাই বইয়ের পোকা। এটি মায়ের কাছ থেকেই পাওয়া। মা দিন-রাত বই পড়তেন। তা দেখে আশপাশের নারীরাও উৎসাহিত হতেন। লীলা এষের বাবার বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে। তিনি শ্রীমঙ্গল সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ১৯৬৫ সালে তাঁর বিয়ে হয় সুনামগঞ্জে। স্বামী সুনামগঞ্জের আরেক কৃতিজন ভূপতি রঞ্জন এষ। তিনি স্বদেশী আন্দোলনের কর্মী ছিলেন। রাজনীতি করতেন। সুনামগঞ্জ শহরের শহীদ মিনারের পাশে ভূপতি এষের একটি ওষুধের দোকান ছিল। সেখানে রাজনৈতিক নেতাদের আড্ডা, আলোচনা হতো নিয়মিত। ন্যাশনাল ফার্মেসির কথা এখনো মনে আছে অনেকের।
বইয়ের প্রয়োজনেই পাঠাগারের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে লীলা এষ’র। পাঠাগার থেকে বই এনে বাড়িতে পড়তেন। এক সময় ছেলেরা পাঠাগার থেকে বই এনে দিতেন। অত্যন্ত সামাজিক মানুষ ছিলেন তিনি। সুনামগঞ্জ মহিলা সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কাজ করেছেন নারী ও সমাজ উন্নয়নে। যুক্ত ছিলেন রামকৃষ্ণ আশ্রমের সঙ্গেও। বিকেলে তিনি প্রতিবেশী নারীদের নিয়ে বাসায় ধর্মীয় আলোচনা করতেন। সকালে ও রাতে পড়তেন বই। হাতের লেখা ছিল খুবই সুন্দর। বাসায় বেগম পত্রিকা আসত নিয়মিত। এটি ছিল তাঁর প্রিয়। সেলাই কাজ বেশ ভালো করতেন তিনি। বাসায় ছাত্র পড়াতেন। শিশুদের দল বেঁধে পড়াতেন। এ জন্য কোনো টাকা-পয়সা নিতেন না। আলপনা আঁকতেন। বাসায় ধ্রæব এষের বন্ধুদের আড্ডা থাকত প্রায়ই। ধ্রæব এষের বন্ধুরা লীলা এষকে মা ডাকতেন। মায়ের হাতের খানাপিনার জন্য তাদের আবদার থাকত প্রায় সময়। দরদি মানুষ ছিলেন তিনি। তাদের কয়েকটি রিকশা ছিল। চালকদের কোনো দিন রুজি-রোজগার কম হলে যখন তাঁকে বলত তখন তিনি ঘর থেকে চালÑডাল দিয়ে দিতেন। রিকশা চালকেরাও তাঁকে মা ডাকতেন। নিজের ঘরে ভালো কোনো কিছু রান্না হলে পাড়ার অন্যদের ঘরে তা পৌঁছে দিতেন তিনি। পান খেতেন বেশ আয়েশ করে। পানের সঙ্গে সাদাগুঁড়া ছিল তাঁর বেশ প্রিয়। এই সাদা গুঁড়ার জন্য প্রতিবেশি নারীরাও আসতেন পান খাওয়ার জন্য। সাধারণের মাঝে অসাধারণ এক নারী ছিলেন তিনি। লীলা এষ আমাদের ছেড়ে চলে যান ১৯৯১ সালের ১৮ অক্টোবর। তিনি নেই, তাঁর স্মৃতি শহীদ জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরিতে অমলিন থাকবে অনন্তকাল। তিনি থাকবেন আমাদের শ্রদ্ধায়। ‘লীলা এষ সংগ্রহ’ আলো ছড়াবে নতুন দিনে, নতুনের মাঝে।