শতবর্ষ প্রাচীন সাচনা চৌধুরী বাড়ি দুর্গাপূজা

বিশ্বজিত রায়
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। শারদীয় দুর্গাপূজাকে মূলত অকালবোধন বলা হয়। কালিকা পুরাণ অনুসারে রাম ও রাবণের যুদ্ধের সময় শরৎকালে দুর্গাকে পূজা করা হয়েছিল। শাস্ত্র অনুসারে শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই এ সময়টি পূজার যথাযথ সময় নয়। অকালের পূজা বলে এ পূজার নাম হয় অকালবোধন। রাম স্বয়ং দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন।
পৌরাণিক কাল থেকে শুরু করে বর্তমান অবধি অকালবোধন অর্থাৎ শারদীয় দুর্গাপূজা প্রচলিত হয়ে আসছে। কয়েক দশক আগেও দুর্গাপূজার এতটা বিস্তৃতি ছিল না। সনাতন ধর্মের ধনী পরিবারগুলোই মূলত দুর্গাপূজার আয়োজন করত। ধীরে ধীরে তা সর্বজনীন গণ্ডিতে রূপ নিয়েছে। তবে কোন কোন জায়গায় পারিবারিক সুপ্রাচীন কিছু পুজো আছে যেগুলো এখনও সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়। এর মধ্যে জামালগঞ্জের জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের সাচনা চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপূজা বেশ পুরোনো। প্রায় ২০০ বছরের অধিক সময় ধরে পরিমল কান্তি ঘোষ চৌধুরীর (দেবল) বাড়িতে এ দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বলে জানা গেছে।
খেঁাজ নিয়ে জানা যায়, চৌধুরী বাড়ির পূর্বপুরুষ মনোহর ঘোষ তথা মহামানিক্য ঘোষ সাচনা চৌধুরী বাড়ির শারদীয়া দুর্গোৎসবের সূচনা করেন। এরপর থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও প্রাকৃতিক কোন দুর্যোগ ছাড়া প্রতিবছর এ বাড়িতে পারিবারিকভাবে পূজা উদযাপিত হয়ে আসছে। একসময় এ অঞ্চলের মানুষ শত বছরের পুরোনো চৌধুরী বাড়ির আড়ম্বরপূর্ণ দুর্গোৎসবে যোগ দিতেন। এ পুজোৎসবকে ঘিরে যাত্রাপালা ও গানসহ গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী মেলার আয়োজন করা হতো।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জয়নগর গ্রামের সুকুমার আচার্য্য চৌধুরী বাড়ি দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরি করতেন। এর আগে তাঁর পূর্বপুরুষরাও এ বাড়ির প্রতিমা তৈরি করে গেছেন। পুজো শেষে প্রতিমা নিয়ে উথার নামক খোলা নৌকায় পজেশন বের হতো। চৌধুরী বাড়ি, রহিমাপুর জমিদার বাড়ি, ভরতপুর, বেহেলী মশালঘাট চৌধুরী বাড়ির প্রতিমা নিয়ে পূজারীরা পজেশনে অংশ নিতেন। স্ব—স্ব জায়গা থেকে নির্ধারিত এক স্থানে জড়ো হতো পজেশনের নৌকা। প্রতিমা রাখতে বামদিক দখলের যুদ্ধংদেহী প্রতিযোগিতা থাকতো প্রতিযোগীদের মধ্যে। বেশির ভাগ সময়ই চৌধুরী বাড়ির প্রতিমা বামদিকে স্থান পেত। আর ডানদিকে থাকতো মশালঘাট চৌধুরী বাড়ির প্রতিমা। পরে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে দুর্গোৎসবের সমাপ্তি টানা হতো।
যতটুকু জানা যায়, একদা প্রতিমা বিসর্জনের পর পানিতে ভাসমান ছালি (প্রতিমার পেছনে বিস্তৃত রঙিন পর্দা) তুলে কেউ একজন পুড়িয়ে ফেলে। পরে তার পরিবারের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে প্রতিমা নিয়ে পজেশনের প্রাচীন রেওয়াজটি ভাটা পড়ে। তবে পজেশন বন্ধ হলেও চৌধুরী বাড়ির পূজা ঠিকই সাড়ম্বরে উদযাপিত হচ্ছে। একসময় হ্যাজাক লাইটের আলোয় ঝলমলিয়ে উঠতো পুজোমণ্ডপ। এখন বিদ্যুতের আলোয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সাচনা চৌধুরী বাড়ির অর্ধেন্দু ঘোষ চৌধুরী সঞ্জু বলেন, চৌধুরী বাড়ির পূর্বপুরুষ মাধব ঘোষ ও যাদব ঘোষ গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর ঘনিষ্ঠ পার্ষদ ছিলেন। মাধব ঘোষ বেতাল পরগনার সাচনা নামক স্থানে এসে বসতি স্থাপন করেন। মাধব ঘোষের গোত্র ছিল সৌখালিন। আমাদের গোত্রও সৌখালিন। সে আমল থেকে দুর্গাপূজার প্রচলন।
তিনি আরও বলেন, আমাদের পুজো অনেক পুরোনো। এই পূজানুষ্ঠান আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। আমাদের পূর্বপুরুষ মনোহর ঘোষ এই পূজার আরম্ভ করেন। এরপর থেকে প্রায় নিয়মিতই পূজা হয়ে আসছে। বর্তমানে সার্বজনীন পূজার যেভাবে প্রসার ঘটেছে, আগে এরকম ছিল না। পারিবারিক এই পূজাতে অনেক মানুষের সমাগম ঘটতো। যাত্রাপালা, গানবাজনা চলত। বলতে গেলে চৌধুরী বাড়ির এ পুজো অনেক প্রাচীন এবং ঐতিহ্যের স্মারক বহন করে চলেছে।
উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ বলেন, ১৯৮০ সালে আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি তখন হাইস্কুল থেকে আমরা চৌধুরী বাড়ির পূজায় যেতাম। সারা জামালগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী পূজা হিসেবে চৌধুরী বাড়ি পূজার খ্যাতি ছিল। যা এখনও আছে। এ বাড়িতে পুজো উপলক্ষে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের পাশাপাশি যাত্রাপালা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মানুষকে আকৃষ্ট করত। ঐতিহ্যবাহী এই পুজোমণ্ডপ দেখতে ১৯৯৪ সালে বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিমও এসেছিলেন চৌধুরী বাড়িতে। তখন আমিও সাথে ছিলাম।
উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সমরেন্দ্র আচার্য শম্ভু বলেন, চৌধুরী বাড়ি পূজা শতর্ধ্বো বছরের প্রাচীন পূজা হিসেবে জানি। একসময় জামালগঞ্জসহ আশপাশের দর্শনার্থীদের সমাগমে মুখর থাকতো এই পুজোমণ্ডপ। অনেক জায়গা থেকেই মানুষ নৌকা করে পুজো দেখতে আসতো। ভক্তসাধারণ এই পূজায় কাক্সিক্ষত মানতও দিতেন। অনেক বলি হতো। হ্যাজাক লাইটের আলোয় ঝলময় করতো মণ্ডপ। ঐতিহ্যবাহী পূজা হিসেবে সাচনা চৌধুরী বাড়ির পূজার আলাদা সুখ্যাতি আছে।