শরৎচন্দ্র ও তাঁর পল্লীসমাজ

মুহাম্মদ শাহজাহান
স্কুল জীবনে বাংলা পাঠ্যবইয়ের একটি উল্লেখযোগ্য গল্প ছিল ‘মেজদিদি’; মূলত এই গল্পের মাধ্যমে আমার পরিচয় ঘটে বাংলা সাহিত্যের রাজাধিরাজ শরৎচন্দ্র চট্টোপধ্যায় এর সাথে। কীভাবে জানি একদিন হাতে উঠে আসে তাঁর আরেকটি উপন্যাস ‘দেবদাস’। এই উপন্যাসের নায়ক দেবদাস; পার্বতীর প্রেমে ব্যর্থ বিরহ-বেদনা ভারাক্রান্ত যার জীবন। তিলে তিলে একটি প্রস্ফুটিত যৌবনের করুণ পরিণতি। উপন্যাসের শেষ অংকে চিত্রিত হয় দেবদাসের করুণ মৃত্যু; আর মরেও বেঁচে থাকা পার্বতীর দীর্ঘশ^াস! দেবদাসের ট্রাজিক মৃত্যু নিয়ে শেষ পৃষ্ঠায় লেখকের দরদভরা স্বগতুক্তি-
‘…….মরনে ক্ষতি নাই, সে সময় যেন একটি ¯েœহ-করস্পর্শ তাহার ললাটে পৌছে, যেন একটি করুনাদ্র ¯েœহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারো এক ফোঁটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে।’
শেষ বাক্যগুলো পাঠের পূর্বেই নিজের অজান্তে ক’ফোটা তপ্তঅশ্রু গড়িয়ে পড়ে; পাঠকের নতুন করে পরিচয় ঘটে চিরসবুজ প্রেমের শিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপধ্যায় এর সাথে।
এভাবেই সেদিন শরৎসাহিত্যের সাথে আমার পরিচয়। বড়দিদি, বিলাসী, রামের সুমতি, মহেশ গল্পগুলো যেমন পড়েছি, তেমনি সেদিন- শ্রীকান্ত, দত্তা, গৃহদাহ, পন্ডিতমশাইসহ বেশ ক’টি উপন্যাসও পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। অবশ্য এক সময় তাঁর গল্প উপন্যাস নিয়ে নির্মিত কয়েকটি বাংলা-হিন্দি ছবিও দেখেছি। বিশেষ করে হিন্দিতে নির্মিত ছবি ‘সতী’র কথা তো বলতেই হয়; ছবির শুরুতে অমানবিক দৃশ্য আমরা দেখি- গ্রামবাসীরা একজন অল্প বয়স্ক বিধবা মেয়েকে সহমরনের জন্য শ্মশানে নিয়ে যাচ্ছেন। যাকে কিনা পরে জীবন্ত পুড়িয়ে দিতে তুলে দেওয়া হবে স্বামীর চিতায়। দৃশ্যটি মনে পড়লে আজও গা শিউড়ে উঠে। এই ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন ভারতের প্রখ্যাত অভিনেত্রী শাবানা আজমী। ছবিতে তাঁকে দেখা যায় গ্রামের নি¤œবর্ণের দরিদ্র পরিবারের এক বাক প্রতিবন্ধী মেয়ে সে; বয়স হয়েছে কিন্তু তাঁর বিবাহ হচ্ছিল না। লক্ষণীয় হলো ব্রাহ্মণ্যবাদী শাস্ত্র মতে একটি বট বৃক্ষের সাথে বাক প্রতিবন্ধী এই মেয়েটির বিবাহ দেয়া হয়। পরবর্তীতে উচ্চবর্ণের এক ব্রাহ্মণ দ্বারাই মেয়েটি ধর্ষিত হয়! ফলশ্রুতিতে মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়ে; প্রশ্ন হলো তার এই অনাগত সন্তানের জন্মদাতা কি তবে একটি নির্বাক বট বৃক্ষ? বস্তুত ছবিটিতে স্বার্থকভাবে তুলে ধরা হয়েছে ধর্মীয় কুসংস্কার আর অন্ধবিশ^াস; পাশাপাশি ব্রাহ্মণ্যবাদী শাস্ত্রের জটিল সব বিধি-বিধানও।
শরৎচন্দ্র জন্মে ছিলেন ব্রিটিশ ভারতে ১৫ই সেপ্টেম্বর ১৮৭৬সালে। তাই তাঁর গল্প-উপন্যাসে তৎকালীন সময়ের বৃটিশ ভারতের বাঙালি সমাজ জীবনের চিত্রই বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে ১৯১৬ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘পল্লীসমাজ’; যার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে তৎকালীন সমাজ জীবনের বাস্তবচিত্র। ইতোমধ্যে সতীদাহ প্রথা রহিত হয়ে গেছে, বিধবা বিবাহ বিধিসম্মত, জাতিভেদের কঠোরতা বেশ শিথিল। কিন্তু তখনো এসব সামজিক কুপ্রথা পুরোপুরিভাবে অপসৃত হয়নি। বিশেষ করে গ্রামে বসবাসকারী ব্রাহ্মণদের কুটিল আর জটিল আচার-আচরণ; জমিদারদের সহানুভূতি নিয়ে শ্রেণিস্বার্থ রক্ষার কুমন্ত্রণা, বাল্যবিবাহ, প্রায়শ্চিত্ত, জাতিভেদ, কৌলীন্য প্রভৃতি নানা কুসংস্কার বিরাজমান। ফলে নানা কুসংস্কার, তর্ক-বিতর্ক, দ্বন্দ্ব-বিবাদ, আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে পল্লীসমাজ সংক্ষুব্ধ, জর্জরিত। সামাজিক মানুষের সমাজচিত্র ও বাস্তবতা এ উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
‘পল্লীসমাজ’ উপন্যাসের পটভূমি- বৃটিশ ভারতের বাংলা প্রভিন্স; অন্যসব গ্রামের মত ক্রমবর্ধনশীল একটি গ্রাম কুয়াপুর। গ্রামে উচ্চবর্ণের হিন্দুরের আধিক্য; পাশাপাশি আছে নি¤œবর্ণের মালো-কৈবর্ত-জোলাদেরও বসবাস। জমিদার তারিণী ঘোষাল এবং যদু মুখুজ্যের পরিবারের বসবাস একই গ্রামে; পরস্পর আত্মীয় এবং উভয়েই উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ। তাদের মধ্যে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। তারা দুজনেই গত হয়েছেন; তাদের উত্তরসূরী বেণী ঘোষাল, রমেশ ঘোষাল ও রমা মুখুজ্যে। ব্রাহ্মণ গোবিন্দ গাঙ্গুলী, পরাণ হালদার, ধর্মদাস প্রমুখ পল্লীসমাজের কর্তাব্যক্তি। জমিদার বেণী ঘোষালকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয় তাদের যতসব কুকর্ম। ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক ভূস্বামীপ্রধান সমাজে তাদেরই প্রাধান্য; দেখা যায় সমাজে তারা আবার পরজীবীও বটে। জমিদার আর সাধারণ মানুষের দান-দক্ষিণার উপর নির্ভর করে তাদের বেঁচে থাকা। স্বার্থের কারণে তারা পদে পদে রূপ পরিবর্তন করে; সকালে তারিণী ঘোষাল পরিবারের পক্ষে তো বিকালে যদু মুখুজ্যের পরিবারের পক্ষে।
আমরা দেখি প্রতিনিয়ত গ্রামে জমিদারে জমিদারে চলে বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে কুৎসিৎ দ্বন্দ্ব। তাদের উৎপীড়ন ও অত্যাচারের শিকার হয় প্রজারা। জায়গা-জমি, গাছকাটা, মাছধরা, স্কুল প্রতিষ্ঠা, রাস্তা সংস্কার ইত্যাদি নিয়ে কথায় কথায় চলে লাঠালাঠি, হয় মামলা-মোকদ্দমা। ব্রাহ্মণ গোবিন্দ গাঙ্গুলীর মতো কুটিল চরিত্রের লোকেরা বিভিন্ন পক্ষকে বিভিন্নভাবে উত্তেজিত করে তুলে; এভাবেই এক পক্ষ অন্য পক্ষকে শায়েস্তা করতে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। দিনের পর দিন চলে একে অন্যকে জব্দ করার জন্যে নিরন্তর চেষ্টা; জাল, জুয়াচুরি, মিথ্যা সাক্ষ্য কোনো কিছুতেই তারা পিছপা হয় না। এক সময় উভয় পক্ষই আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ে; তাদের সহায় সম্পদ ঋণের দায়ে আটকা পড়ে জমিদার কিংবা গ্রামের সুদখোর মহাজনদের জালে। সমাজপতিরা যেমন নিষ্ঠুর তেমনি হীন; লোভী এবং স্বার্থপর। শরৎচন্দ্র এই বিবাদ-বিসংবাদকে পল্লীসমাজ উপন্যাসের কেন্দ্রে রেখে তুলে ধরেছেন সেই সময়কার সমাজকে। তিনি দেখিয়েছেন যে, প্রায় শত বৎসর পূর্বে বাংলাদেশের গ্রামগুলি দারিদ্র, উৎপীড়ন, পরশ্রীকাতরতা, ভন্ডামি, বঞ্চনা, হতাশা, বিরোধ, কুসংস্কার, অর্থনৈতিক শোষণের নীরন্ধ্র অন্ধকারে ডুবে ছিল।
পল্লী সমাজ উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রধান চরিত্র জমিদার তারিণী ঘোষালের একমাত্র পুত্র রমেশ; শহরে বেড়ে ওঠা শিক্ষিত মার্জিত রুচির কুসংস্কারমুক্ত এক তরুণ। পিতার শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করতে সে হঠাৎ জন্মভিটে কুয়াপুর গ্রামে আসে। রমেশ এই শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে শুধু খাওয়া-দাওয়াই নয় সাথে গ্রামের প্রত্যেককে একখন্ড কাপড় দেওয়ারও ব্যবস্থা করে। তা জানতে পেরে রমেশকে উদ্দেশ্য করে ব্রাহ্মণ গোবিন্দ গাঙ্গুলীর উপদেশ-
‘…. বাবাজি এ-কাজটা ভালো হচ্ছে না। ছোটলোকদের কাপড় দেওয়া আর ভস্মে ঘি ঢালা এক কথা। তার চেয়ে বামুনদের একজোড়া, আর ছেলেদের একখানা করে দিলেই নাম হত। আমি বলি বাবাজি, সেই যুক্তিই করুন, কি বলো ধর্মদাসদা?’
কিন্তু রমেশ সমাজকর্তাদের সে সব কথায় কর্ণপাত করেনি; সে তার মতই শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি নেয়। শুরু হয় গোবিন্দ গাঙ্গুলী, পরাণ হালদার সমাজকর্তাদের সহযোগিতায় খলনায়করূপী বেণী ঘোষালের ষড়যন্ত্র; কীভাবে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান প- করা যায়, কীভাবে তাকে শায়েস্তা করা যায় সেই ষড়যন্ত্র। রমেশ ব্যথিত হৃদয়ে সব কিছু অবলোকন করে; গ্রামের আর্থসামাজিক করুণ অবস্থা দেখে সে অবাক। যেখানে সে নিজেই পদে পদে শিকার হচ্ছে বিভিন্ন বাধা-বিপত্তির; সেখানে নি¤œবর্গের হিন্দুদের অবস্থার কথা বর্ণনা করা বাহুল্য মাত্র। একটু এদিক সেদিক হলেই জমিদার বেণী ঘোষাল আর তার সহযোগীরা তাদের করে রাখে একঘরে । এমনকি প্রায়শ্চিত্ত না করার কারণে মৃতদেহ সৎকারের মত গুরুত্বপূর্ণ কাজটাও আটকে রাখে। কথায় কথায় নি¤œবর্গের হিন্দুদের ছোট লোক কিংবা ছোট লোকের বাচ্চা বলে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। তাদের হীনমন্যতা ও ষড়যন্ত্রের কুটিল-কঠিন আঘাত রমেশ কিংবা গ্রামের সাধারণ মানুষ কাউকেই মুহূর্তের জন্যে স্বস্তি দেয় না।
পল্লীসমাজে শরৎচন্দ্র এক জমিদারের বিপক্ষে আরেক জমিদারকেই বেছে নেন; প্রজাপীড়ক বেণী ঘোষাল ও রমা মুখুজ্যের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেন তিনি প্রজাহিতৈষী শিক্ষিত রমেশ ঘোষালকে। যার অবস্থান সমাজ সংস্কারের পক্ষে; জাতিভেদ প্রথার বিপক্ষে। তিনি আশা করেন ভাল জমিদার দ্বারা সংগঠিত মানব কল্যাণমূলক কার্মকান্ডের ফলেই এক সময় পল্লীসমাজ থেকে দূর হবে অশিক্ষা আর দারিদ্র; তেমনি দূর হবে জাতপাত নিয়ে যতসব বৈষম্যমূলক সামাজিক বাধা-বিপত্তি।
জমিদার রমেশ গ্রামের মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি সমাজ সংস্কারমূলক কর্মকান্ডের ব্রত গ্রহণ করে। কিন্তু সে এক সময় আবিস্কার করে যে, সমাজের উচ্চশ্রেণী কর্তৃক শোষিত নির্যাতিত নি¤œবর্গের মানুষজনও প্রকৃতিগত ভাবে এক ধরনের শঠ কিংবা বোকা। তাদের সম্পর্কে রমেশের ব্যক্তিগত মতামত এরকম-
‘……. এদের দান করলে এরা বোকা মনে করে, ভালো করলে গরজ টাওরায়, ক্ষমা করাও মহাপাপ; ভাবে- ভয়ে পিছিয়ে গেল।’
কুয়াপুর গ্রামের রেষারেষি আর দলদলি নিয়ে হতাশ রমেশ; এসব বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রামের প্রবীণ দরিদ্র ব্রাহ্মণ দীনু ভট্টাচার্যের কথায় ওঠে আসে সেই সময়কার পল্লীসমাজের একটি বাস্তব চিত্র-
‘……হায় রে বাবাজি আমাদের কুয়াপুর তো পদে আছে। যে-কান্ড এত দিন ধরে খেঁদির মামার বাড়িতে দেখে এলুম! বিশ ঘর বামুন-কায়েতের বাস নেই, গাঁয়ের মধ্যে কিন্তু চারটে দল। হরনাথ বিশ^াস দুটো বিলিতি আমড়া পেড়ে ছিল বলে তার আপনার ভাগ্নেকে জেলে দিয়ে তবে ছাড়লে। সমস্ত গ্রামেই বাবা এই রকম- তাছাড়া মামলায় মামলায় একেবারে শতচ্ছিদ্র!’
শতবছর পূর্বে পল্লীসমাজের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের মুখ নির্গত সরল স্বীকারোক্তি; অবাক হতে হয় আজকের যুগেও তা কত প্রাসঙ্গিক ভেবে!
কুয়াপুর গ্রামের কৃষকের ক্ষেতে ফসল লাগাতে পানি নিস্কাশন জরুরী; যে বাঁধটি ক্ষেতে পানি আটকে রেখেছে সেটি আবার জমিদার বেণী, রমেশ আর রমাদের যৌথ মালিকানধীন জমিতে, যেখানে আছে একটি মাছের আধার। মাছ বিক্রয় করে প্রতি বৎসর তাদের প্রায় দুশো টাকা আয় হয়; কিন্তু সাধারণ কৃষকের প্রায় সারা বৎসরের খাদ্যের সংস্থান, টাকার হিসেবে সেটা হবে ছয়/সাত হাজার টাকা। গ্রামবাসী কৃষকের আকুতি-মিনতির পরও বেণী কিংবা রমা সে বাঁধ কাটতে দিবে না। এক পর্যায়ে বাঁধ কাটা নিয়ে তাদেরই প্রজা কৃষকের পক্ষ নিয়ে জেঠাত বড় ভাই বেণীর প্রতি রমেশের প্রশ্ন-
‘এরা সারাবছর খাবে কী?
তার উত্তরে বেণী বলে-
‘খাবে কী? দেখবে বেটারা যে যার জমি বন্ধক রেখে আমাদের কাছেই টাকা ধার করতে ছুটে আসবে। ভায়া, মাথাটা একটু ঠা-া করে চলো, কর্তারা এমনি করেই বাড়িয়ে গুছিয়ে এই যে এক আধটুকুরা উচ্ছিষ্ট ফেলে রেখে গেছেন, এই আমাদের নেড়েচেড়ে গুছিয়ে-গাছিয়ে খেয়ে দেয়ে আবার ছেলেদের জন্যে রেখে যেতে হবে! ওরা খাবে কী! ধার-কর্জ করে খাবে। নইলে আর ব্যাটাদের ছোটলোক বলেচে কেন?
উপন্যাসিক শরৎচন্দ্র পল্লীসমাজে এভাবেই চিত্রায়িত করেছেন প্রজাপীড়ক বেণী ঘোষলদের মত জমিদারদের কদর্য চেহারা। তিনি সে সমাজকে দোষারূপ করেননি। স্বরূপ উন্মোচন করেছেন এর ক্ষয়িষ্ণু বিধিব্যবস্থার, অন্যায়, অবিচার, নীচতা ও হীনতার। শুভের সঙ্গে অশুভের দ্বন্দ্ব, সংঘাত।
কুয়াপুর গ্রামের খালের ওপারের গ্রাম পিরপুর; মুসলমান সম্প্রদায়ের বসবাস। যারা আবার বেণী, রমেশ আর রমাদেরই প্রজা। মুসলমান বলে গ্রামের স্কুলে তাদের ছেলেমেয়েদের পড়তে দেওয়া হচ্ছে না। জমিদার রমেশের প্রজাহিতৈষী কার্মকান্ডের খরব শুনে তারা তার স্মরণাপন্ন হয়। রমেশ তার অন্য শরীকান ও সমাজপতিদের সাথে আর ঝগড়া-বিবাদে না জড়াতে, তার মুসলমান প্রজার সন্তানদের জন্য পৃথক একটি স্কুল তৈরি করে দেয়। এভাবেই সে দিন দিন বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরে; পিরপুরে পল্লীসমাজ নিয়ে রমেশের পর্যবেক্ষণ এরূপ-
……..ইহারা প্রতিকথায় বিবাদ করে না; করিলেও তাহারা প্রতিহাত এক নম্বর রুজু করিয়া দিবার জন্য সদরে ছুটিয়া যায় না। বরঞ্চ মুরুব্বিদের বিচারফলই, সন্তুষ্ট অসন্তুষ্ট যেভাবেই হোক, গ্রহণ করিতে চেষ্টা করে। বিশেষত বিপদের দিনে পরস্পরের সাহায্যার্থে এরূপ সর্বান্ত:করণে অগ্রসর হইয়া আসিতে রমেশ ভদ্র-অভদ্র কোনো হিন্দু গ্রামবাসীকেই দেখে নাই। ………. জাতিভেদের উপর আস্থাহীন রমেশ এসব বিষয়ে পাশাপাশি তুলনা করার পর হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি তাহার অশ্রদ্ধা শতগুণে বাড়িয়া গেল। সে স্থির করিল- হিন্দুদিগের মধ্যে ধর্ম ও সামাজিক অসমতাই এই হিংসা-দ্বেষের কারণ। অথচ মুসলমানমাত্রই ধর্ম সম্বন্ধে পরস্পর সমান, তাই একতার বন্ধন ইহাদের মতো হিন্দুদের নাই এবং হইতেও পারে না। আর জাদিভেদ নিবারণ করিবার কোনো উপায় যখন নাই, এমনকি ইহার প্রসঙ্গ উত্থাপন করাও যখন পল্লীগ্রামে একরূপ অসম্ভব, তখন কলহ-বিবাদের লাঘব করিয়া সখ্য ও প্রীতি সংস্থাপনে প্রযতœ করাও প-শ্রম।
শরৎচন্দ্র একজন জাত কথাশিল্পী সন্দেহ নেই; তার নিবিড় পর্যবেক্ষণ থেকে এড়িয়ে যেতে পারেনি শুধু হিন্দু নয়, মুসলমান সমাজও। তাই আমরা দেখি পল্লীসমাজ উপন্যাসে সমাজবদ্ধ মানুষের সামাজিক বিষয়ে তুলনামূলক পার্থক্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি যতকিঞ্চিৎ নিয়ে এসেছেন প্রতিবেশী মুসলমান সম্প্রদায়কে; আর বলা বাহুল্য সেটা তিনি করেছেন খুবই সচেতেনভাবে। পল্লীসমাজের প্রধান চরিত্র তরুণ শিক্ষিত রমেশ; যাকে শরৎচন্দ্র চিত্রায়িত করেছেন একজন সমাজ দরদী জমিদার হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে রমেশ ও রমার সাফল্য এখানে অনুল্ল্যেখযোগ্য।
কিন্তু আমাদের বিবেচনার কথা হলো শরৎচন্দ্রে পল্লীসমাজের যে সময়, সেই সময় থেকে আজকের বাংলাদেশের পল্লীসমাজচিত্র কি খুব একটা বদলে গেছে?
আজ ১৫সেপ্টেম্বর অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপধ্যায়ের ১৪২তম জন্মদিন; তাঁকে আমাদের বিনম্্র শ্রদ্ধা।
১৪.০৯.২০১৮খ্রি:
লেখক: সংস্কৃতিকর্মী।