শহরে টেলিভিশনের আগমন ও লঞ্চে ফাইনাল দেখা

কুমার সৌরভ
বেতবুনিয়া ভূ উপগ্রহ কেন্দ্র। নামটি জানা হয়েছিল ১৯৮২ সনে। বাইরের দেশের কোন ইভেন্ট বিটিভি প্রচার করত এই আকাশ গেটওয়ে দিয়ে। ইংল্যান্ডের যুবরাজ চার্লস-ডায়েনার বিয়ের অনুষ্ঠান, হজ্বব্রত, আততায়ীর হাতে নিহত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, ওস্কার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান, মোহাম্মদ আলী ক্লে’র চ্যালেঞ্জ মুষ্টিযুদ্ধ প্রতিযোগিতাসহ বহু আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে বিটিভি তখন থেকেই দর্শকনন্দিত মিডিয়ায় পরিণত হয়েছিল। বিটিভির অনুষ্ঠানমালা এখনকার টিভি অনুষ্ঠানের মতো ম্যাড়ম্যাড়ে প্রাণহীন ছিল না। বিটিভির নাটকগুলো পশ্চিমবঙ্গে ছিল তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়। টিভি অ্যান্টেনার সাথে এলোমনিয়ামের বাটি-সরা বেঁধে বিটিভি দেখার সেকি কসরত তখন পশ্চিমবঙ্গবাসীর। সেই সুদিন গেছে। এখন আমরা ভারতীয় বাংলা-হিন্দি চ্যানেলে মজে আছি বুঁদ হয়ে।
বিটিভি সম্প্রচার নেটওয়ার্ক বাড়ানোর ফলে আশির দশকের আগে (১৯৭৬-৭৭) সুনামগঞ্জে টিভি দেখার সুযোগ তৈরি হয়। আমাদেরও টিভি আসক্তি ঘটে ঠিক এই সময়টিতেই। ১৯৮২ বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ কিছু খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করে বিটিভি। টিভিতে সেই খেলা দেখে আমরা অবাক বিস্ময়ে বিশ্ব ফুটবলের তারকা খেলোয়াড়দের জাদুকরি ক্যারিসমা দেখে মুখ হা করে ফেলি। ভাবি, একদিন সালাউদ্দিন, জাকারিয়া পিন্টু, বাদল দে দের তারকাখ্যাতি কমতে শুরু করবে এই মহাতারকাদের আগ্রাসনে। ফুটবলে আমরা ও ওরা যে কত তফাত, টিভি সম্প্রচার না আসলে আমরা বুঝতেই পারতাম না।
আশির দশকের আগে শহরে টিভিওয়ালা বড়লোকের সংখ্যা নেহায়েৎই হাতের কড়ে আঙুলে গোনা যেত। পুরো নতুন পাড়ায় নূরুল হুদা মুকুটের বাসায় টিভি। তখনকার শহরে অট্টালিকাসম এই বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে ভয়ে ভয়ে আমাদের টিভি দর্শকাভিষিক্তি মোটমাট বাল্যাবস্থায়। ভয় এই কারণে মুকুট ভাই’র আব্বা আবার কখন জানি হাঁক ছেড়ে তেড়ে আসেন। কিন্তু না, এরকম অবস্থ্ াকখনও আসেনি।
১৯৮২ সনে শহরে মোটামুটি বেশ টেলিভিশন। স্বচ্ছল ব্যক্তিদের আভিজাত্যের প্রকাশরূপ ড্রয়িংরুমের সুশোভিত বাক্সে মহামহিম টিভির অবস্থান। মোটামুটি সিনেমাহলের মতো ভিড় জমত সেখানে টিভি নেইওয়ালাদের। টিভিওয়ালা গৃহস্থ মহাজন নিজের বাসায় জনসমাগম দেখে মুখে তৃপ্তির এক চিলতে হাসি টেনে সকলকেই খাতির আদর করতেন। বলা যেতে পারে মধ্যবিত্ত স্বভাবে এ আরেক পরিবর্তনের সূচনা। সকলেই রাত সাড়ে আটটার আগে কাজকর্ম শেষ করে টিভির সামনে বসে যেতেন। বাইরের যারা আসতেন তাদের জন্যও থাকতো সাধ্যানুরূপ আপ্যায়নের ব্যবস্থা। মধ্যবিত্তের টানাটানির বাজেটে টিভি বেশ চাপই তৈরি করেছিল বটে।
সেই সময়ে শহরের তরুণদের টিভি দেখার প্রধান জায়গা ছিল শিল্পকলায় (বর্তমান পুরাতন শিল্পকলা একাডেমি বা আব্দুল হাই মিলনায়তন)। শাহ আবু তাহের শিল্পকলার সাধারণ সম্পাদক। জাঁদরেল অভিনেতা, আন্তরিক ও সদয় ব্যক্তি তিনি। শহরের তরুণদের প্রিয়। শিল্পকলায় হলরুমের মতোই টিভি প্রদর্শনের ব্যবস্থা। উঁচু চৌকুণো কাঠের বাক্সে ২৪ ইঞ্চি সাদা-কালো টিভি। বাক্সটি থাকতো তালাবদ্ধ। তাহের ভাই সন্ধ্যার পর এসে তালা খুলে টিভি চালু করতেন। তাকে তখন আকাশ থেকে নেমে আসা রাজপুত্তুরের মতো মনে হতো। কারণ তারই হাতে যে আকাশের তারাগুলোকে চোখের সামনে মেলে ধরার চাবি। তাহের ভাই মুখে পান ঢুকিয়ে রসিয়ে রসিয়ে চিবুতেন আর বিশেষ এক ধরনের হাসি নিয়ে সকলের দিকে তাকাতেন। তার চোখের ভাষা বলতÑ বসো হে বাপুরা, আনন্দ করো আর তৃপ্তি নিয়ে বাড়ি যাও। তখন জনপ্রিয় সিরিয়ালগুলো শুরু হতো রাত আটটার বাংলা সংবাদের পর। সকাল-সন্ধা সিরিয়ালটি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। এরপরের বহুব্রীহি, সংশপ্তক, আজ রবিবার, কোথাও কেউ নেই, নক্ষত্রের রাত প্রভৃতি ধারাবাহিকসহ এ সপ্তাহের নাটক এবং বেশ কিছু ইংরেজি সিরিয়াল ছিল সকলের প্রিয়। বাংলা ডাবিং করা ভারতীয় আলিফ লায়লা এক সময়ে দর্শকপছন্দের শীর্ষে উঠে গিয়েছিল। তেমনি বাংলা ডাবিংকৃত ইংরেজি সিরিয়াল ইনক্রিডেবল হালক বা ম্যাকগাইভারের কথাও সমান প্রিয়তা। বিশেষ প্রিয় ছিল এ মাসের নাটক হিসাবে দেড়ঘণ্টার বিশেষ নাটক। দেশের নামকরা নাট্যৗকরাররা লিখতেন সেইসব নাটক। ওইসব নাটকের মৌলিকত্ব ও অভিনয় শিল্পীদের বিশেষত্ব এতোটাই উন্নত মানের ছিল যে আজকালের নাটক আর দেখতে পারেন না বয়সী দর্শকরা। শাহ আব্দুল করিম সেই যে বলেছিলেন, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম…, তেমনই আরকি। ফজলে লোহানীর যদি কিছু মনে না করেন নামক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানকে তো বলা যেতে পারে এখন অব্ধি এর মানকে অতিক্রম সম্ভব হয়নি। অসাধারণ মেধাবী ও প্রতিভাবান ফজলে লোহানী তাঁর এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ টিভি সাংবাদিকতার দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। আব্দুল্লাহ আবু সাঈদের সপ্তবর্ণা ধাঁধাঁর অনুষ্ঠানটি ছিলো চৌকষ ও বৃদ্ধিদীপ্ত। বাংলাদেশের এখনকার বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখে ভাবি আমাদের সেইসব প্রযোজক, নির্মাতা পরিচালকরা কি এই দেশে নিজেদের কোনো উত্তরসূরী রেখে যেতে পারেননি। বলা ভাল তখন ইন্টারনেট কী জিনিস তা কেউই জানতেন না তখন। হাতে হাতে ছিল না মোবাইল। বিনোদনের উপকরণ ছিল একেবারেই সীমিত। তাই শিল্পকলায় রাতে টিভি দেখা ছিল অনেকের প্রিয় শখ। পুরো শিল্পকলার হলরুমে বিছানো থাকতো চেয়ার। তাতেও জায়গায় কুলোতো না। অনেকেই দাঁড়িয়ে দেখতেন। তখন অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে যে বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতো সেগুলো ছিল দীর্ঘ সময়ের। এই বিজ্ঞাপন বিরতিতে শিল্পকলার প্রাঙ্গণে মকই ভাইর চা খাওয়া ছিল আরেক বিনোদন। তো শিল্পকলার সামনের চেয়ারগুলোতে বসতেন বিশিষ্টজনরা, যারা ক্রীড়াসংস্থা বা শিল্পকলার সাথে সম্পর্কিত তারা। সকলে মিলে টিভি দেখার সেই যে অনির্বচনীয় আনন্দ তার যথার্থ রূপ ভাষায় প্রকাশ করে বুঝানোর নয়। শিল্পকলায় টিভি দেখতে আসা অনেকের বাসায়ই টিভি ছিল। কিন্তু সকলের সাথে বসে দেখার যৌথ আনন্দ পেতে তারা বাসার বদলে শিল্পকলাকেই পছন্দ করতেন। শিল্পকলায় টিভি দেখানোর সেই চল্ বেশ আগেই চুকেছে। তবে মনের ভিতর সেই যে আনন্দের রেশ তা আমাদের আজও আন্দোলিত করে।
১৯৮২ সনে চালাক পাওলো রসির বদৌলতে ইতালি চ্যাম্পিয়ন হয়। এর পরের বার ম্যারাডোনার জাদুতে আর্জেন্টিনা। ওই বছরে ম্যারাডোনার অতিমানবিক ফুটবল কৌশল মানুষকে এতোটাই উদ্বেল করেছিল যে সেই থেকে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ আর্জেন্টিনার ভক্ত বনে যায়। এই আর্জেন্টিনাপ্রীতি এখনও সমান প্রবহমাণ। ১৯৯০ সনে ম্যারাডোনা ও আর্জেন্টিনা যেন গ্রীক উপখ্যানের ট্র্যাজিক হিরো। বিশ্ব ফুটবল রাজনীতির শিকার হয়ে ম্যারাডোনা ফাইনালে দল থেকে বাইরে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তারপরেও সেবার আর্জেন্টিনা ফাইনালে। প্রতিপক্ষ জামানি। ১৯৯০ এর ফাইনাল খেলাটি এখন পর্যন্ত অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের জন্ম দিয়ে শেষ হয়েছিল। আর্জেন্টিনার দুই খেলোয়াড় লালকার্ড পেয়ে সাইডলাইনে। মাঠে ৯ সদস্যের দুর্দান্ত আর্জেন্টাইনরা ১১ জনের জার্মানিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল প্রায়। কিন্তু ১১ জনের খেলা কি আর ৯ জনে হয়? ফলাফল ফুটবল রাজনীতির প্রত্যাশামতেই আর্জেন্টিনার হার আর জার্মানির জয়।
১৯৮৬ বিশ্বকাপের এক মজার স্মৃতি এখনও মনে পড়ে। বিশ্বকাপ যখন চলছিল তখন আমাদের দেশে সম্ভবত কালবৈশাখির মৌসুম। বিদ্যুতের এন্তার ঝামেলা। এখন যেমন একটু বাতাস আর বিদ্যুৎ চমকালে পিডিবি’র মেশিনগুলি ভয়ে বেহুঁশ হয়ে পড়ে ফেলে তখনও এমনই ছিল। ঘটনাক্রমে ফাইনালের আগের দিন থেকেই শহর বিদ্যুৎহীন। একে তো বিশ্বকাপ ফাইনাল বলে কথা। তার উপর বয়সে তরুণ, উন্মাদনা সহজাত। শেষ পর্যন্ত আমাদের বন্ধুমহল লঞ্চঘাটে নোঙর করা এক লঞ্চে খেলা দেখার ব্যবস্থা করল। লঞ্চের সহৃদয় সারেঙ মহোদয় কৃপাপরবশ হয়ে আমাদের লঞ্চের ব্যাটারির শক্তিতে চালু টিভিতে খেলা দেখার সুযোগ করে দিলেন। এ যেনো বেহেশতের টিকেট হাতে পাওয়ার শামিল। সারেঙ মহোদয়ের প্রতি আমাদের সেই কৃতজ্ঞতাবোধ আজও একইরকমভাবে সজীব, সম্ভবত বাকি জীবনও তাই থাকবে। বাসায় রাতের খাবার সেরেই সকলে লঞ্চঘাটে। খেলা শুরু হবে গভীর রাতে। এর আগে ঘণ্টা চারেক লঞ্চঘাটের খাবারের দোকানগুলোতে পরটা, ডিম, চা খাওয়া, রাস্তায় তুমুল আড্ডা দিয়ে সময় পার করে সেই মাহেন্দ্রক্ষণে মহা হৈচৈ করে ম্যারাডোনাময় ফাইনাল উপভোগ ও ভোরবেলা ঢুলঢুলে চোখে বাসায় ফেরার কথা জীবনে কখনও ভুলার নয়। লঞ্চে খেলা দেখা সেই প্রথম আর সেই শেষ।
এখনও যখন বাসায় রঙিন টিভিতে বিশ্বকাপের খেলা দেখি আরাম করে, গিন্নির চা ও বিবিধ আপ্যায়নসহযোগে, তখনও ১৯৮২ কিংবা ১৯৮৬ এর সেই আনন্দ খুঁজে পাই না। এ কি বয়সের কারণে ?