শহীদমিনার হোক জাতি গঠনের পবিত্র স্থাপনা

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সহায়তায় সদর উপজেলার ৬টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদমিনার নির্মাণের উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। এমন উদ্যোগ অনুকরণীয়ও বটে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, শহীদমিনার নির্মাণের মূল অর্থ সহায়তা দিয়েছে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ। ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দের মধ্যে এসব শহীদমিনার নির্মিত হয়। সরকারী নির্মাণ কাজের পদ্ধতিগত জটিলতা, যা ব্যয়াধিক্যও ঘটানোর অনুঘটক, সেই জটিল পদ্ধতি পরিহার করে নিজেরাই নির্মাণ কাজ শেষ করেছেন। পত্রিকায় শহরতলির মাসতুরা-মবশ্বির সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্মিত শহীদমিনারের যে ছবি প্রকাশিত হয়েছে সেটি দেখে অল্প টাকায়ও যে কত সুন্দর কাজ করা যায় তা বুঝা যায়। ওই বিদ্যালয়ের শহীদমিনারটি অবিকল ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদমিনারের আদলে তৈরি। দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে। অপরাপর বিদ্যালয়গুলোর নকশা ও কাজের মান কেমন তা আমরা জানি না। তবে খুব যে খারাপ হবে তাও মনে হয় না। এমন একটি ভাল কাজ করার জন্য আমরা ৬টি বিদ্যালয় এলাকার ইউপি চেয়ারম্যানসহ বিদ্যালয়গুলোর পরিচালনা কমিটি ও প্রধান শিক্ষকদের অভিনন্দন জানাচ্ছি। এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে অন্যান্য বিদ্যালয়েও দৃষ্টিনন্দন শহীদমিনার গড়ে তোলা যেতে পারে। আমরা আশা করব প্রতিবছর প্রত্যেকটি ইউনিয়ন পরিষদ তাদের অর্থায়নে অন্তত একটি বিদ্যালয়ে এই ধরনের শহীদমিনার নির্মাণ করে দিবেন।
শহীদমিনার জাতিগত চেতনা, অস্তিত্ব, অহংকার ও ইতিহাসের ধারক। ইতিহাসের নানা কালপর্বে জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠায়, সর্বশেষ মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন দেশের অভ্যুদয় ঘটানো পর্যন্ত; অগণিত বীর প্রাণ বিসর্জন করেছেন। শুধু দেশকে ভালোবেসে একটি সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গঠনের প্রত্যয়ে এই দামাল সন্তানরা প্রাণোৎসর্গ করেন। এই বীর শহীদানদের প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের অমর বীরত্বগাঁথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেয়াই শহীদমিনার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য। শহীদমিনারে আসলে সকলের মনে সেই আত্মদানের ইতিহাস জাগরূক হয়। দেশের জন্য মমত্ববোধ বাড়ে। শহীদদের কথা স্মরণ করে দেশের জন্য কিছু করার অন্তর্গত তাগিদ তৈরি হয়। এজন্যই বিশ্বের সকল জাতি সকল সময় নিজেদের বীর সন্তানদের স্মারকগুলোকে অত্যন্ত সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে সংরক্ষণ করে।
ইতিহাসের পাঠ গ্রহণ তথা দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হওয়া শিশুকাল থেকেই শেখাতে হয়। এই বিবেচনায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শহীদমিনার নির্মাণ অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকদের এই শহীদমিনারে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়মিত আগমন ঘটাতে হবে। একই সাথে সপ্তাহের অন্তত একটি দিনের একটি ঘণ্টা এই শহীদমিনারে শিক্ষার্থীদের সমবেত করে দেশের কথা, শহীদদের কথা, ইতিহাসের কথা বলতে হবে। শিশু বয়স থেকেই যদি শিক্ষার্থীরা জাতীয় ইতিহাসের পাঠ নেয়া শুরু করে তাহলে বড় হয়ে আরও বিস্তারিত জানতে তাদের আগ্রহ তৈরি হবে। এইভাবে একটি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ জাতি গঠনের দিকে আমরা এগিয়ে যেতে পারি। আজ সর্বত্র যে সাংঘাতিক নৈতিক স্খলন, স্বার্থবাদীতা, অনুদারতা, তুচ্ছতা দেখি তা মূলত দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ জাতি গঠনে ব্যর্থতার ফল। অথচ আমাদের বীর সন্তানরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়েই প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন হাসিমুখে। আমরা বীরের এই রক্ত¯্রােতকে ব্যর্থ হতে দিতে পারি না। বিভ্রান্তি ও নিচুতার যে বিশাল অন্ধকার গ্রাস করে আছে সেই ঘন অন্ধকার দূর করে আলোর বাংলাদেশ গঠনের লক্ষে আমাদের অবশ্যই এই কালো অধ্যায় পেরিয়ে আসতে হবে। আর এই কাজ শুরু করতে হবে শিশুবয়স থেকেই। নির্মিত শহীদমিনারগুলো সেই প্রত্যাশিত জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখুক এই আমাদের কামনা।
পরিশেষে বিদ্যালয়গুলোতে নির্মিত শহীদমিনারগুলো যাতে অনাদরে অবহেলায় আবর্জনার স্তুপে পরিণত না হয় সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখার জন্য আমরা শিক্ষকম-লীর সবিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করি।