শহীদ জননীর গল্প

খলিল রহমান
অশ্রুভেজা চোখে ছেলেকে ডাকছেন মা, ‘আতাহার আলী, বাপ আমার। আমি তোর মা আইছি রে বাপ। ওঠ্ বাপ, আমারে মা বইলা ডাক…।’ কিন্তু ছেলের কোনো সাড়া নেই, শুয়ে আছেন গভীর ‘ঘুমে’। এই ঘুম ভাঙার নয়, এই ঘুম কারো ভাঙে না। মা আঁচলে চোখ মুছেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে আকাশে-বাতাসে।
ছেলের মুখে ‘মা’ ডাক শোনার জন্য ব্যাকুল ছিলেন বেলেজান নেছা। এ জন্য ৪৩ বছর অপেক্ষা করেছেন। শহীদ সন্তানের কবরের পাশে আজ দাঁড়িয়ে তিনি। কাঁদছেন ৯০ বছর বয়সী শহীদ জননী। আশপাশে সবার চোখে জল। এক সময় মায়ের মন কিছুটা শান্ত হয়। কাঁপা কাঁপা হাতে ছুঁয়ে দেখেন ছেলের কবরের নাম ফলক। আঁচলে মুছে দেন সেটি। যেন ছেলের গায়ে মমতাময়ী এক মায়ের কোমল পরশ।
এই মায়ের খোঁজ আমরা পেয়েছিলাম ২০১২ সালে। সুনামগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্রের আহবায়ক এবং ‘রক্তাক্ত ৭১ সুনামগঞ্জ’ গ্রন্থের লেখক মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু মার্চ মাসের কোনো এক সন্ধ্যায় ফোন করে জানান, স্বাধীনতার ৪১বছর পর এক মা তাঁর শহীদ সন্তানের সমাধির খোঁজ পেয়েছেন। শুনেই মনটা কেমন করে ওঠে। আগ্রহ নিয়ে সংবাদটি সংগ্রহ করি। এরপর প্রথম আলোতে ‘৪১ বছর পর শহীদ সন্তানের সমাধির খোঁজ পেলেন মা’ শিরোনামে সেটি ছাপা হয়। এই মায়ের সঙ্গে তারও আড়াই বছর পর দেখা হয় আমাদের।
বেলেজান নেছার বাড়ি রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার বিরাহিমপুর (মেঘনা) গ্রামে। গ্রামের কৃষক মেছেরউদ্দিন বিশ্বাস ও বেলেজান নেছার সাত ছেলে। আতাহার আলী ছিলেন দ্বিতীয়। আতাহার       
একদিন মায়ের সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি ছাড়েন। তখন তাঁর বয়স ছিল ২০। এরপর চাকরি নেন পুলিশে। তাঁর শেষ কর্মস্থল ছিল ময়মনসিংহে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কাউকে না জানিয়ে তিনি যুদ্ধে চলে যান। এক সময় দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু আতাহার আলী আর বাড়ি ফেরেননি। মায়ের সঙ্গে অভিমান মিটেনি ছেলের। মা ছেলের পথ চেয়ে থাকেন, ছেলের জন্য অঝোরে কাঁদেন। ছেলে ফিরবে এই আশা ছিল তাঁর বুকজুড়ে।
এক সময় মায়ের সেই অপেক্ষার পালা শেষ হয়। মুক্তিযুদ্ধের বছরখানেক পর চার নম্বর সেক্টরের কমান্ডার সি আর দত্তের লেখা একটি চিঠি পান তাঁরা। জানতে পারেন, আতাহার আলী সিলেট অঞ্চলে যুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু সিলেটের কোথায় তিনি শহীদ হয়েছেন, তাঁর সমাধি কোথায়-সেটি আর জানা যায়নি। মায়ের আকুতি, অন্তত ছেলের সমাধি দেখে মরতে চান। সেই চেষ্টা চালিয়ে যান তাঁর অন্য সন্তানেরা। সি আর দত্তের চিঠির সূত্র ধরে কয়েক দফা তাঁরা সিলেটে আসেন। কিন্তু কোনো খোঁজ মেলেনি। সিলেট অঞ্চলের কারো সঙ্গে দেখা হলেই তারা শহীদ ভাইয়ের কথা বলতেন। ২০১২ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় একটি হাসপাতালে সিলেটের মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহেরের সঙ্গে দেখা হয় আতাহার আলীর ভাই আসগর আলীর। আতাহার আলীর প্রসঙ্গ তুলেতেই আবু তাহের জানান, এবারের বইমেলায় সুনামগঞ্জের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু’র লেখা ‘রক্তাক্ত ৭১ সুনামগঞ্জ’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। আতাহার আলী যদি সুনামগঞ্জ অঞ্চলে শহীদ হন তাহলে বইয়ে তাঁর নাম থাকতে পারে। এরপর বইটি সংগ্রহ করেন আসগর আলী। বইয়ে সুনামগঞ্জে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় আতাহার আলী নাম পান। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী ডলুরায় অবস্থিত ৪৮জন শহীদের সমাধিতে আতাহার আলীর কবর রয়েছে। পরে বেলেজান নেছার আরেক ছেলে নিজাম উদ্দিন ছুটে আসেন সুনামগঞ্জে। বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে মাকে জানান সেই সংবাদ। এরপর থেকে ছেলের সমাধি দেখতে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন মা। কিন্তু মায়ের বার্ধক্যজনিত সমস্যার কারণে আসতে হয় আড়াই বছর পর।
২০১৪সালের ৭আগস্ট রাতে শ্রদ্ধেয় খসরু ভাই আবার জানান, সেই মা সুনামগঞ্জে আসছেন। ঢাকা থেকে তিন ছেলে, ছেলের বউ ও নাতিদের নিয়ে তিনি রওনা দিয়েছেন। আমি যেন তাঁদের সঙ্গে ডলুরা যাই। ৮ আগস্ট বেলেজান নেছার সঙ্গে প্রথম দেখা হয় সুনামগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ে। রাজবাড়ী থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন তিনি। কথা হয় তাঁর ছেলে আসগর আলীর সঙ্গেও। তিনি বাগেরহাট পুলিশ লাইনসে পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত তখন। সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে ভাঙাচোরা পথ ধরে প্রায় এক ঘন্টায় ডলুরায় পৌঁছান তাঁরা। আসগর আলী মাকে নিয়ে যান সমাধিক্ষেত্রের ভিতরে। শহীদ আতাহার আলীর কবরের পাশে দাঁড়ান সবাই। এক সময় দুই হাত তুলে মোনাজাত শুরু করেন আসগর আলী। এরপর মাকে একা কবরের পাশে রেখে আমরা খানিকটা দূরে দাঁড়াই। তিনি ছেলের সমাধির দিকে অপলক চেয়ে থাকেন। ‘আতাহার, আতাহার’ বলে ডাকেন। যে মা ৪৩ বছর অপেক্ষায় ছিলেন, সেই মা এখন শহীদ সন্তানের সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে। তিনি কাঁদছেন। কাঁদছে ডলুরার সবুজ প্রকৃতি। মায়ের সামনে যেন মাথা নিচু করে আছে উত্তরের উঁচু পাহাড়। সমাধি এলাকায় থাকা গৌরবের স্মৃতি ভাস্কর্য।
শহীদ আতাহার আলীর বাবা মেছেরউদ্দিন বিশ্বাস যুদ্ধের সময় পাকবাহিনীর হাতে মারা যান। একদিন বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে পাকিস্তানি হানাদারদের তাকে ধরে গুলি করে হত্যা করে। আসগর আলীর স্ত্রী মুর্শেদা বেগম ও নিজাম উদ্দিনের স্ত্রী জেসমিন আক্তার বেলেজান নেছাকে নিয়ে পুরো সমাধি এলাকা ঘুরে দেখান। মুর্শেদা বেগমের বিয়ে হয়েছে ৩০ বছর। শুরু থেকেই দেখছেন শাশুড়ি বেলেজান নেছা ছেলের জন্য কাঁদছেন। বিকালে কাঁদতেন বেশি। আতাহার আলী নাকি মায়ের সঙ্গে অভিমান করে একদিন বিকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন। আর পিছন পিছন মা তাঁকে ডাকছিলেন। একইভাবে আতাহার আলীকে আজও ডাকলেন তিনি। সমাধি এলাকার রেস্ট হাউসে কিছুক্ষণ কথা বলি বেলেজান নেছার সঙ্গে। ছেলের কবর দেখতে পেরেছেন, এই শান্তনা এবং দীর্ঘশ্বাস দুই-ই তাঁর চোখেমুখে। বেলা পড়ে আসছে। শহরে ফিরতে হবে। এরপর আবার বাড়ির পথে রওনা হবেন তাঁরা। ফেরার সময় বেলেজান নেছা আবার আতাহার আলীর কবরের দিকে তাকান। আবার তাঁর চোখে জল। জলভরা চোখে আবার তাঁকে বলতে শুনি,‘বাপরে এত করে ডাকলাম, কোনো সাড়া পাইলাম না। তুই কি আমার লগে এখনো অভিমান কইরা আছিস। ভালো থাকিস রে বাপ…।’
লেখক: প্রথম আলো’র সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি



আরো খবর