শান্তা রুখে দাঁড়াতে শিখেনি তাই মরেছে

বলা হয়ে থাকে, পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ হলো দুনিয়ার সবচাইতে ভারী বস্তু। এমন ভার বহনের ক্ষমতা কোন বাবা-মার নেই। কিন্তু এই পৃথিবীতে এমন নিদারুণ বাস্তবতার সামনে পড়তে হয় বহু পিতা-মাতাকে। যেমন পড়েছেন সুনামগঞ্জের নতুনপাড়ার বাসিন্দা সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা নিপাট ভদ্রলোক ও সজ্জন ব্যক্তি হৃষিকেশ তালুকদার। তাঁর মেয়ে তরুণ চিকিৎসক ডা. প্রিয়াঙ্কা তালুকদার শান্তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে তার স্বামীর বাড়ি থেকে। শান্তার পিতা হৃষিকেশ তালুকদারের বক্তব্য মতে শ্বশুর বাড়ির লোকজন শান্তাকে দিনের পর দিন নির্যাতন করে অবশেষে হত্যা করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রেখেছে। অর্থাৎ শান্তার মৃত্যুটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকা-। গত কয়েক দিন ধরে ডা. শান্তার করুণ ও রহস্যজনক মৃত্যুর প্রতিবাদ ও দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে সুনামগঞ্জের সচেতন মহল মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করছেন বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে। শনিবারও অনুরূপ দুইটি মানববন্ধন হয়েছে শহরের আলফাত স্কয়ারে। এই মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন শান্তার বাবা হৃষিকেশ তালুকদার। তাঁর কোলে ছিল শান্তার তিন বছরের অবুঝ শিশুপুত্র কাব্য। আয়োজকদের অনুরোধে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করলে কান্নায় তাঁর গলা ভারী হয়ে উঠে। স্বাভাবিকভাবে তিনি কোন কথাই বলতে পারছিলেন না। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি প্রতিবাদকারীদের তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানিয়ে কেবল প্রার্থনা করেছেন আর কোন পিতা যেন কোনদিন এমন দুঃসহ কষ্টের মুখোমুখি না হয়। সদ্য সন্তান হারানো এক পিতার বুক ফেটে বেরিয়ে এসেছে এই মিনতি। তিনি নিজে উপলব্ধি করছেন সন্তান হারানোর বেদনা কতটুকু। তাই পৃথিবীর কোন পিতা-মাতাই যাতে সন্তান হারা না হন, চরম কষ্টের সময়েও তিনি সেই কথাটুকুই বলেছেন কেবল। এই যে এক পিতার আর্তি, আমাদের হৃদয়হীন সমাজ, ততোধিক হৃদয়হীন সমাজ-মানস সেটি কখনও গ্রাহ্য করবে না, আমরা জানি। এই পচা গলিত ও দুর্গন্ধে ভরা সমাজের পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে এমন অমানবিক কর্মকা-ের সূতিকাগার। আর নারী হলে সে তো কখনও মানুষ বলে বিবেচ্য হয় না, আধুনিক মানুষ হিসাবে দাবিদার পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে। এক শান্তা কেন, এমন হাজারটা শান্তা মরে গেলেও যে পুরুষতান্ত্রিক অহম কখনও মাথা নোয়াতে শিখেনি।
শান্তার মৃত্যুর কিছু পশ্চাৎকাহিনি ফুটে উঠেছে শনিবার তার সহপাঠীদের বক্তব্য থেকে। শ্বশুরবাড়িতে সে নিয়মিত গঞ্জনা, লাঞ্ছনা আর নির্যাতনের শিকার ছিল। এমবিএসএস পাস করা এক উচ্চ শিক্ষিত যুবতী হয়েও তাকে নিয়মিতই ঘর ঝাড়মুছ, রান্না-বান্না করতে বাধ্য করেছে শ্বশুরবাড়ির লোকজন। সহপাঠীরা বলেছে, শান্তা ছিল চাপা প্রকৃতির। সহজে নিজের কষ্টের কথা প্রকাশ করতে চাইতো না সে। তাই শ্বশুরবাড়ির সব ধরনের নির্যাতন সহ্য করেও সে মানিয়ে নিতে চেয়েছিল। সে ভেবেছিল একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। উচ্চ শিক্ষিত হলেও সে মন মানসিকতায় ছিল সনাতনী ধ্যান-ধারণারই। নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো বা প্রতিবাদ করার শিক্ষা সে পায়নি। প্রতিবাদ করে বেরিয়ে আসার সাহস দেখাতে পারেনি সে তাই। ফল হয়েছে, একেবারে জীবনটাই দিয়ে দিতে হলো। শান্তার মৃত্যুতে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নির্বিকার ও ভাবলেশহীন অতিস্বাভাবিক চালচলন সকলের চোখেই পড়েছে। মানববন্ধনেই বক্তারা বলছিলেন, শান্তার লাশ যখন ঝুলছিল তখন তার শ্বশুর সিগারেট ফুঁকছিলেন, শাশুড়ি বাটা থেকে পান বানিয়ে চিবোচ্ছিলেন আর স্বামীপ্রবরটি ফোনে একে ওকে জানাচ্ছিলেন শান্তার ঝুলে থাকার খবর। সবচাইতে আশ্চর্যের কথা এই, একে ওকে জানালেও সবার আগে জানানো দরকার যে পুলিশকে, তাদেরকেই নাকি জানানো হয়নি শান্তার মৃত্যুর খবরটি। পুলিশ খবর জেনেছে শান্তার বাবার বাড়ির লোকজনের মুখ থেকে। তাদের মুখাবয়বে ছিল না কোন অনুশোচনা অথবা কষ্টের লেশমাত্র।
শান্তার বাবার বুকফাটা আর্তনাদ বাতাসে মিলিয়ে যাবে, কিন্তু শান্তার মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিচার হবে কি?