শান্তিগঞ্জে নদী ভাঙনে বিলীন সড়ক/ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছয় গ্রামের মানুষ

ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ
শান্তিগঞ্জ উপজেলার মৌগাঁও-সলফ সড়ক দরগাপাশা ও পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নকে সংযুক্ত করেছে। সাত কিলোমিটার দূরত্বের এই সড়কটি উপজেলার দরগাপাশা ইউনিয়নের ছয়হারা-মৌগাঁও পয়েন্ট থেকে বাঘেরকোনা-লালপুর হয়ে পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নের সলফ ও ধরমপুরের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেছে। দুই ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামের দশ হাজারেরও বেশি মানুষ এই সড়কটি ব্যবহার করেন। কয়েকশ শিক্ষার্থী, রোগী, বয়োবৃদ্ধ মানুষের চলাচলের অন্যতম যোগাযোগ সড়ক এটি। কয়েকবছর আগেও বীরগাঁও বাজার থেকে ছয়হারা পর্যন্ত নদীপথে যোগাযোগ চালু থাকলেও এখন নৌ- যোগাযোগ নেই বললেই চলে। ট্রলারের ধীরগতি ও ইঞ্জিনের উচ্চ আওয়াজের কারণে ক্রমশ নৌ-পথের গুরুত্ব কমতে থাকায় সর্বাধিক গুরুত্ব পায় মৌঁগাও-সলফের এই সড়কটি। সড়কটি ব্যবহার করে সিলেট, সুনামগঞ্জ, জগন্নাথপুর হয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করে থাকেন উপজেলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষ। মহাসিং নদীর ভাঙনের কবলে পড়ে আড়াই বছর আগে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এই যোগাযোগ সড়ক। এতে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষদের। ভাঙনের কারণে বাঘেরকোনা গ্রামের পশ্চিমাংশে চলাচল করতে পারছে না কোনো ধরণের যানবাহন। নৌকায় পারাপার শেষে পাকা অংশে কোনো রকমে চলছে দু’তিনটি সিএনজি অটোরিকশা। যা বিশাল সংখ্যক এলাকাবাসীর জন্য একেবারেই অপ্রতুল ও সীমাহীন কষ্ট সহিষ্ণু।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, সলফ-মৌগাঁও সড়কটি মহাসিং নদীর দক্ষিণ পাড়ে মৌগাঁও থেকে বাঘেরকোনা পর্যন্ত অংশটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত একটি বেরীবাঁধ। বাঁধটিই এলাকাবাসীর চলাচলের একমাত্র সড়ক পথ। এ সড়ক দিয়ে বাঘেরকোনা, লালপুর, সলফ, ধরমপুর, উমেদনগরের (লাউগাঙ) একাংশ, খেয়া পার হয়ে বীরগাঁও বাজার ও বাবনগাঁও গ্রামের ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের চলাচল পথ।
এ সড়ক দিয়ে জেলা শহর সুনামগঞ্জ, বিভাগীয় শহর সিলেটসহ জগন্নাথপুর-রাণীগঞ্জ হয়ে রাজধানী ঢাকার সাথে যোগাযোগ এই অঞ্চলের মানুষের। গ্রামগুলোর অসংখ্য শিক্ষার্থী সলফ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সলফ পশ্চিমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসাসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করেন এই পথেই। যাতায়াত করেন প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকবৃন্দও। তাঁদের দুর্ভোগের উপাখ্যান লিখে বুঝবার মতো নয়। রোগী হলেতো উপায়ই নেই। নৌকা ছাড়া এখন বিকল্প কোনো ব্যবস্থাই নেই তাদের। সলফ (পূর্বপাড়া) বড় জামে মসজিদ থেকে ধরমপুর গ্রাম পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটারের মাটির পথের চিহৃই নেই, বলতে হয় ওই দিকে একসময় সড়ক ছিল।
হেমন্তে তো যেমন তেমন অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয় বর্ষাকালে। তখন চলাচলের একমাত্র ভরসাই নৌকা।
শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের মৌগাঁও অংশ থেকে বাঘেরকোনা পর্যন্ত ৩শ মিটারেরও বেশি সড়ক নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ওই সড়কে থাকা গাছগাছালি গেছে নদীগর্ভে। সড়কের কোনো অস্তিত্বই নেই এখন। এ অংশটুকু অন্যের বাড়ি ও আবাদি জমির আলপথ দিয়ে হেঁটে আসতে হয় হাজার হাজার মানুষকে। অনেকটা পথ ঘুরিয়ে জমির উপর দিয়ে মোটরসাইকেল আনতে পারলেও অন্য কোনো যানবাহন এই পথে চলাচল করতে পারে না।
এতে যেমন ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন ছয়হারা-মৌগাঁও সিএনজি স্টেশনের চালকরা তেমনি চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এলাকাবাসী। ভাঙা অংশ ছাড়াও সড়কের বেশ কিছু পাকা অংশের নিচ থেকে মাটি সরে গেছে। পশ্চিমদিকে, সলফ পূর্বপাড়া বড় জামে মসজিদ থেকে ধরমপুর গ্রাম পর্যন্ত প্রায় ৩/৪ কিলোমিটার সড়কের মাটি বন্যায় ধুয়ে গেছে। এরপর থেকে সামান্য মাটি ভরাট করা হলেও বর্ষায় ‘আফালে’ মাটি ধুয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে সড়কের এ অংশের দক্ষিণ দিকে (হাওরের দিকে) গাইড ওয়াল করার দাবি থাকলেও পুরো সড়কের কোথাও গাইড ওয়াল চোখে পড়েনি।
যেহেতু পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক নির্মাণকৃত বেরিবাঁধ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে তাই বিকল্প পথে, নদী থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাস্তা নেওয়া যায় কি না সে বিষয়ে ভাবছেন সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডি। স্থানীয় লোকজন জমি দিয়ে সহযোগিতা করার কথা বলেছে সুনামগঞ্জ এলজিইডিকে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুব আলম বললেন, সড়কটির কথা আমাদের মাথায় আছে। আমরা ইতোমধ্যে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দলকে জায়গাটি দেখিয়েছি। তারা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর, এলজিইডি, পাউবো এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ঋণ দেবে। আমরা চাচ্ছি, পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি তাদের কাজটা করে দেন, তাহলে আমরা সহজে সড়কটি করে দেবো। তাছাড়া স্থানীয়রা যদি জায়গা দেন তাহলে বিকল্প পথে আমরা রাস্তা করে দেবো। এখন জমির মালিকরা যদি জায়গা দেন তাহলে আমরা একভাবে চিন্তা করবে, না হলে পাউবোর করানো কাজের উপর আমরা সড়ক করে দেবো।
শান্তিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারি প্রকৌশলী মাহবুব আলম বললেন, জমির মালিকরা যদি জমি দান করেন তাহলে আমরা সড়কের এলাইনমেন্ট পরিবর্তন করে বিকল্পভাবে বাঁধ নির্মাণ করে দেবো। তা না হলে বোর্ড বসে অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো। হাওরে তো আর পানি ঢুকতে দেওয়া যাবে না। সবার সাথে বসে সিদ্ধান্ত নেবো।
সলফ পূর্বপাড়া প্রামের মুরব্বি আবদুল গফফার বলেন, জমির মালিকদের গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে, তারা আমাদেরকে ইতিবাচকভাবে সাড়া দিয়েছেন। অনেকে প্রবাসে আছেন। আগামী মাসে প্রবাসীরা দেশে আসবেন। তাদের নিয়ে পুনরায় আলোচনায় বসবো, অনুরোধ করবো। আশা করছি তাদের সম্মতি আমরা পাবো।
সলফ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) রাজ বল্লভ বৈদ্য বলেন, বর্তমানে সড়কটিই এলাকার মানুষের সবচেয়ে দুঃখের নাম। নদী ভাঙনে সরকারি জায়গাসহ সড়কটি বিলীন হয়েছে। এখন যা আছে তা মালিকানা। আমরা অনুরোধ করবো বিত্তবান জমির মালিকরা যেনো সড়কের জন্য জমি দান করে এলাকাবাসীকে কৃতার্থ করেন এবং যেসব জমির মালিকরা একেবারে গরিব, সহায় সম্বল বলতে এ জমিই, তাদের বিষয়টি চিন্তা করতে হবে। যেকোনভাবে হোক আমাদের সড়ক যেনো হয়। সড়ক না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়ছে।
সলফ পশ্চিমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক হাফিজ মাও. তাজুল ইসলাম ও সলফ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক কলসুমা আক্তার বললেন, আমরা অনেক কষ্ট করে স্কুলে আসি। সেটা যদি বাদও দেই শিক্ষার্থীদের কথা তো বাদ দিতে পারি না। হেমন্তে কিছু শিক্ষার্থী আসলেও বর্ষায় একেবারেই শিক্ষার্থীরা আসেন না। এতে ঝড়ে পড়ার সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
ছয়হারা পূর্বপাড়ের সিএনজি স্ট্যান্ডের পরিবহন শ্রমিক লিমন মিয়া বলেন, প্রায় আড়াই বছর ধরে আমরা সলফ পর্যন্ত সিএনজি চালাতে পারি না। এতে আমাদের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। যাত্রীরাও কষ্ট পাচ্ছেন।