শান্তি ও স্বস্তির জন্য কাজ করুন

শুক্রবার ধর্মপাশায় ছাত্রলীগের বিবদমান দুই গ্রুপের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচীকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার আশঙ্কায় প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে ১২ ঘণ্টার জন্য অকুস্থলে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। ঠিক এক দিন পর শনিবার ছাতকে আওয়ামী লীগের বিবদমান দুই গ্রুপের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচীর জন্য ১৪৪ ধারা জারি করতে হয় প্রশাসনকে। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ উভয় সংগঠনই ক্ষমতাসীন সরকার দলীয় সংগঠন। সরকারি দলের কর্মসূচীর কারণে শান্তি শৃঙ্খলা বিঘেœর আশঙ্কা তৈরি হওয়া এবং এজন্য প্রশাসনের ১৪৪ ধারা জারি করা নিতান্তই অনভিপ্রেত। সরকার দলীয় সংগঠনের অভ্যন্তরের এসব গ্রুপিং প্রশাসনকে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ঠেলে দেয়। বলাবাহুল্য আমাদের দেশে যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে সেই দলের ভিতরই উপদলীয় কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেখে আসছি আমরা বহু বছর ধরে। একটা সময় ছিল যখন দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বলতে বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধ-সহিংসতা ইত্যাদি বোঝাত। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বিদেশিদের কাছে দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয়েছে, অকার্যকার রাষ্ট্রের তকমা অর্জনের আশঙ্কা তৈরি হয়, বিদেশি বিনোয়োগ হ্রাসপ্রাপ্ত হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তর ক্ষতি হয়, জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। মোটামুটি ২০১০ সন পর্যন্ত এই ধরনের পরিস্থিতি আমরা দেখেছি। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমদিকে কথিত ‘অগ্নিসন্ত্রাস’ সফলভাবে মোকাবিলা করার পর প্রায় এক দশক ধরে দেশে বিরোধী দল অনেকটাই সংযত আচরণ করছে। বলা যেতে পারে তারা রাজপথকে সহিংস করার জায়গা থেকে সরে এসে শান্তিপূর্ণ জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। রাজপথে বিরোধী দলকে মোকাবিলা করার জটিল কাজ এই সরকারকে গত এক দশক ধরে করতে হচ্ছে না। জাতীয় পরিস্থিতি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ থাকায় সাধারণ মানুষও খুশি। দেশের ব্যবসা ও উৎপাদনেরও স্ফীতি ঘটছে এই স্থিতিশীলতার কারণে। এই শান্তিপূর্ণ অবস্থা অব্যাহত থাকার তাগিদ অনুভব করেন সকলে। কিন্তু বিরোধী দল সংযত থাকলে কী হবে, এখন অশান্তি তৈরির উপলক্ষ হয়ে সামনে চলে এসেছে স্বয়ং সরকারি দল ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলো। ধর্মপাশা ও ছাতকে প্রশাসনের ১৪৪ ধারা জারি করা এর প্রমাণ। কিন্তু এই অন্তর্কোন্দল এবং তৎফলে এলাকায় এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা যে মূলত সরকারি দলকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে সেটি অনুধাবন করতে হবে নেতৃত্বকে। নতুবা এইসব ছোটখাট কোন্দল বা গ্রুপিং শেষ পর্যন্ত বড় অশান্তির কারণ হতে পারে।
উপদলীয় কোন্দলের মূলে কাজ করে নেতৃত্ব লাভের আকাক্সক্ষা এবং ক্ষমতা ও প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা অর্জন । যত জায়গায় উপদলীয় কোন্দলের দেখা মিলে তার কারণ অনুসন্ধান করলে উপরের যেকোনো একটি কারণের উপস্থিতি দেখা যাবে। একটি বড় দলে মতবিরোধ বা নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে। সেটি প্রকাশ হওয়ার গণতন্ত্র সিদ্ধ পথ আছে। গণতান্ত্রিক সেই প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে যখন প্রত্যেকে শক্তিবলে নিজ নিজ উদ্দেশ্য সাধনে প্রয়াসী হয়ে উঠেন তখনই বাধে বিপত্তি। এই বিপত্তি জাতীয় জীবনের জন্য অশনিসংকেত। জায়গায় জায়গায় বিরাজমান এইসব উপদলীয় কোন্দলের নিরসন ঘটা আবশ্যক। আর এ জন্যই সংগঠনের সকল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক চর্চার প্রসার ঘটানো একমাত্র সমাধানসূত্র। এর বাইরে যেকোনো ধরনের প্রচেষ্টা হবে আগুনের চুলা বদলের মতই ঘটনা মাত্র।
জাতীয় উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা ঘোষিত হয়েছে। ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ফলাফল অর্জন করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন যে কর্মযজ্ঞে মনোনিবেশ করা দরকার তার প্রাথমিক শর্ত হল শান্তি ও স্বস্তি। শান্তি ও স্বস্তি ভিন্ন উন্নয়নের ধাপগুলো টপকানো কিছুতেই সম্ভব নয়। তাই সরকার দলীয় প্রতিটি ইউনিটকে সরকার প্রধানের যে অভিপ্রায় সেটি আত্মস্থ করতে হবে হৃদয় দিয়ে। নিজেদের মধ্যে মতভেদকে অশান্তির বাতাবরণে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে তাঁদেরকে। এমন অবস্থা সরকার দলীয়দেরই নিশ্চিত করে দিতে হবে যাতে প্রশাসনের কখনও ১৪৪ ধারা জারি করতে না হয়।