শারদীয় দুর্গোৎসব হোক শঙ্কামুক্ত পরিবেশে

বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজা আজ মহাষষ্ঠী তিথিতে দেবী বোধনের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পুরো বৎসর অপেক্ষা করে থাকেন এই দুর্গোৎসবের জন্য। পুজোর পাঁচটি দিন তাঁরা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের সাথে প্রাণ ও হৃদয়ের মেলবন্ধন ঘটিয়ে একে উৎসবের রঙে রাঙিয়ে তুলেন। দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির নাশক। মহিষাসুর নামক পরাক্রমমত্ত অসুররাজকে নিধন করে দেবতাদের রক্ষা করেছিলেন মহাবিপর্যয় থেকে। এর প্রতীকী ব্যঞ্জনা হলোÑ শুভ শক্তির সাথে অশুভ শক্তির চিরন্তন যে বিরোধ সেখানে দেবী দুর্গা আদ্যাশক্তি মহামায়া রূপে শুভশক্তিকে রক্ষা করেন। এটা বিশেষ কোনো যুগের নয় বরং হিন্দুরা বিশ্বাস করেন পৃথিবীতে প্রাণ অস্তিত্ব যতদিন রিবাজিত থাকবে এবং শুভ-অশুভ দ্বন্দ্ব যতদিন বজায় থাকবে ততদিনই মা দুর্গা ত্রাতা রূপে তাঁর শুভ সন্তানদের রক্ষা করবেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এই প্রধান ধর্মীয় উৎসবের শুরুর দিনে আমরা তাঁদের জানাই শারদীয় শুভেচ্ছা।
দুর্গা পূজা আসার বেশ আগে থেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের মনে বেশ শঙ্কাবোধ তৈরি হয়, এবার নির্বিঘেœ পূজা পালন করা যাবে তো? বছর বছর এমন কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে যা সত্যিকার অর্থেই পূজার আন্দোৎসবকে বেশ ম্লান করে দেয়। এবারও পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে শঙ্কার কথা উড়িয়ে দেয়া হয়নি। তবে সব ক্ষেত্রেই তাঁরা প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন। পূজায় রাষ্ট্র সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে সত্য কথা হলো, নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে কোনো উৎসবই পূর্ণতা পায় না। প্রাণ খুলে নির্ভয়ে নিঃশঙ্ক চিত্তে দেবী আরাধানার পাশাপাশি সামাজিক আনন্দোৎসবে অংশগ্রহণের জন্য মুক্ত পরিবেশ চাই। কিন্তু কোথায় সেই মুক্ত পরিবেশ? নিরাপত্তা আর বিধি-বিধানের ঘেরাটোপে বন্দি থেকে প্রাণ খুলে সেই আনন্দ করার পরিবেশ কই? একাত্তরে আমরা দেশটি যেসব মহান উদ্দেশ্য নিয়ে স্বাধীন করেছিলাম তার অন্যতম ছিলো সকল ধর্মাবলম্বীর জন্য একটি নিরুদ্বিগ্ন সমাজ কাঠামো তৈরি করা। সেই মহান লক্ষ অর্জন করা যায়নি। বরং দিন দিনই যেন মুক্ত সমাজ গঠনের জায়গাটি কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। আমাদের উদ্বেগের জায়গা এখানে।
জাতীয় পূজা উদযাপন পরিষদ এবার পূজায় সাত্ত্বিক পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের এই আহ্বান যথার্থ। পূজা উপলক্ষে কিছু উশৃঙ্খল ব্যক্তি এমন সব আচরণে লিপ্ত হন যা ধর্মের অনুষঙ্গ তো নয়ই বরং ধর্মকে সমালোচনার পাত্রে পরিণত করে। ম-পে ম-পে এবং পাড়া-মহল্লায় এবার আমরা একটা শালীন, ¯িœগ্ধ, পবিত্র ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যমূলক পরিবেশ দেখতে আগ্রহী। এক্ষেত্রে পূজাম-পগুলোর কর্মকর্তাদের দায়িত্ব সর্বাধিক। তাঁদের সচেতন থাকতে হবে কোনো বখাটে ব্যক্তি যাতে পূজার সাত্ত্বিক ভাবগাম্ভির্যের সাথে বেমানান কর্মকা-ে লিপ্ত না হয়।
বাংলাদেশ ও সারা বিশ্ব এখন একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। অর্থনৈতিক মহামান্দার অভিঘাত, বৈশ্বিক প্রভাববলয় নিয়ন্ত্রণের অভিপ্রায়ে যুদ্ধের উন্মাদনা, আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের সা¤্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা, করোনা মহামারী; প্রভৃতি আজ বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এসব প্রপঞ্চের পাশাপাশি ধর্মীয় জঙ্গীবাদী সমস্যাও চলমান আছে। বিশ্ববাসী আজ এসব অশুভ তৎপরতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার লড়াইয়ে নিয়োজিত। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ইতিহাস সাক্ষী দেয় মানুষের ভিতর যে অদম্য প্রাণশক্তি রয়েছে তা দিয়ে বারবার এমন অবস্থাকে জয় করা গেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটেও মানুষই কেবল পারবে বৈশ্বিক এই মহাদুর্যোগ মোকাবিলা করে শান্তি ও সমতার পৃথিবী প্রতিষ্ঠা করতে। আর দেবী দুর্গা হলেন মানুষের প্রাণের ভিতর অধিষ্ঠিত শক্তিরূপের প্রতীক মাত্র। তাই আসুন বাংলাদেশ ও গোটা বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় দেবী দুর্গার কৃপা কামনা করি। সকলকে আবারও শারদীয় শুভেচ্ছা।