শারদীয় শুভেচ্ছা, মহামারী ও নারী-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হোক ধরণী

দুর্গা পূজার আজ মহানবমী। আগামীকাল দেবী বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজা। আবহাওয়া ও করোনা মহামারীর কারণে এ বছর ধর্মীয় বিধি বিধান মেনে মণ্ডপে মণ্ডপে পুজোর আয়োজন করা হলেও পুজোর ভিতরে যে উৎসব; সেটি উপভোগ করা যায়নি সেইভাবে। তবুও শরতের শ্বেতশুভ্র পবিত্রতা ও সাদা কাশ আর ঘন নীল আকাশের অনিন্দ্য রূপময়তার মাঝে দুর্গা পূজা এক সুনির্মল আনন্দের উপলক্ষ। উৎসব হোক চাই না হোক, মণ্ডপে মানুষের ভিড় থাকুক চাই না থাকুক; ব্যক্তি মানুষের অন্তকরণে পুজোর পাঁচ দিনই ছিল আনন্দের অবিশ্রান্ত উপস্থিতি। মানুষ সকলের সাথে না হলেও নিজেদের মতো করে এই পুজোৎসবে ভক্তি নিবেদন ও আনন্দ লাভ করেছেন। মহামারীর দুযোর্গকালে দেবী দুর্গা কয়েকটি দিনের জন্য মানুষকে দুশ্চিন্তা আর উদ্বেগ থেকে মুক্তি দিয়ে রেখেছিলেন।
পুরান মতে দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশকারীনি। শুভ শক্তিকে সংহত করতে অসুর নিধনে দুর্গারূপ ধারণ করেছিলেন মহাশক্তি। একজন নারীর পরিচয়ে দেবীর এই উণে¥ষ আমাদের প্রাচীন সমাজে নারীর সম্মানজনক সুদৃঢ় অবস্থার কথা মনে করিয়ে দেয়। নারী শক্তি যে বর্বরতা আর অনায় অত্যাচারে অতীষ্ট পৃথিবীতে শান্তির অমেয় ধারা বইয়ে দিতে সক্ষম দেবী দুর্গাসহ হিন্দু পুরানের অপরাপর নারী দেবীরা তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। আজ যখন জায়গায় জায়গায় নারীর লাঞ্ছনার আর্তনাদ বাতাস ভারী করে তুলে তখন আমাদের সেই প্রাচীন সংস্কৃতি ও ইতিহাসের কথা বেশি করে মনে হয়। প্রাচীন সমাজের পর পুরুষতান্ত্রিকতা যখন থেকে জেঁকে বসতে শুরু করল তখন থেকে নারীর কালবেলা শুরু হলো। সময়, বিধি-বিধান, সংস্কার, প্রথা ও মানসিকতার হাত ধরে কালবেলার ঘন কালো আঁধার কেবল বাড়তেই লাগল। আধুনিক যুগের প্রারম্ভ থেকে নারীর এই অধস্থন অবস্থানকে বাতিল করে নারী-পুরুষ সমতা বিধানে বহু মহামানব-মানবী চেষ্টা শুরু করেছেন। এতে অবস্থার গুণগত ও পরিমাণগত পরিবর্তন ঘটেছে সত্য কিন্তু আমাদের মগজের কোষে কোষে এখনও নারীকে অন্তপুরবাসিনী ও পুরুষের চাইতে হীন ভাবার জায়গাটুকু একই রয়ে গেছে। তাই নারীকে চরিত্রবান হওয়ার উপদেশ খয়রাত করা হয়, কোনো পুরুষকে এই উপদেশ বিলোনো হয় না। নারী বিদ্বেষের এই কালবেলা কাটাতে আমরা অনেকেই নানাভাবে চেষ্টা করে থাকি। কিন্তু এই চেষ্টা সমাজের প্রধান ধারার অন্তর্ভূক্ত হতে পারেনি আজও। সমাজের প্রধান ধারাটি আজও নারীকে পুরুষের সেবাদাসী মনে করার জায়গাটিরই প্রতিনিধিত্ব করে চলেছে। আমরা জানি এই অবস্থার পরিবর্তন হবে, হতে বাধ্য। সমাজ প্রগতির নিয়মই বলে কোনো কুপ্রথাই চিরন্তন হতে পারে না। প্রতিদিনই ইতিবাচকভাবে এক তিল হলেও নারীর অবস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিবর্তনই একদিন পুরুষ-নারীর সমতা বিধান করবে। পরিবর্তনের জন্য এই নিরন্তর প্রয়াসটুকু আরও সংকল্পে বলীয়ান হয় একজন নারীরূপী দেবী দুর্গার অশুভ নাশ করার কাহিনি থেকে।
দুর্গা পূজা বহু আগেই নিজের ধর্মীয় গন্ডি পেরিয়ে সর্বজনীন উৎসবের মর্যাদা পেয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দে শামিল হন। একটি ধর্মীয় উৎসবের এমন সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য ধারণ এককথায় অনন্য। আমরা মনে করি ধর্ম যার যার উৎসব সবার। ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ ভেদে মানুষে মানুষে অসাম্য ও বৈষম্য তৈরি করা সমীচীন নয়, একটি ধর্মীয় উৎসবের সর্বজনীনতা অর্জন থেকে সেই শিক্ষা গ্রহণ করা অপরিহার্য। এমন সর্বজনীনতার জয় হোক।
সকলকে শারদীয় প্রীতি ও শুভেচ্ছা।