শাল্লার শিক্ষা কর্মকর্তার দুর্নীতি কি থামবে না?

স্টাফ রিপোর্টার
শাল্লা উপজেলা শিক্ষা অফিস অনিয়ম-দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। কোনভাবেই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফেরদৌসের দুর্নীতি থামছে না। প্রাথমিক শিক্ষার নীতিমালা লঙ্ঘন করে একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতি করছেন তিনি।
ইতোপূর্বে উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ ফেরদৌসের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে তাঁকে (মোহাম্মদ ফেরদৌস) সুনামগঞ্জ থেকে অন্য জেলায় বদলী ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছিলেন সদ্য বিদায়ী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার পঞ্চানন বালা।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কার্যালয় থেকে শাল্লা উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ ফেরদৌসের বিরুদ্ধে বিভাগীয়
ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহা পরিচালককে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছিল।
এতসবেও থেমে নেই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফেরদৌসের দুর্নীতি। সর্বশেষ তিনি সহকারি শিক্ষকদের বদলী বাণিজ্য শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের ডিঙিয়ে জুনিয়র শিক্ষককে বদলী প্রস্তাব করায় জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার শাল্লা উপজেলার রুপসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক পিলু চৌধুরী এই অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, গত ৫ জানুয়ারি তিনি একই উপজেলার মেঘনাপাড়া বিদ্যালয়ে বদলীর জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে আবেদন করেন। কিন্তু তার বদলী প্রস্তাব না পাঠিয়ে একই বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক বাবুল চন্দ্র চৌধুরীর বদলী প্রস্তাব জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে প্রেরণ করা হয়েছে। বাবুল চন্দ্র চৌধুরীর শিক্ষক জেষ্ঠ্যতার ক্রমিক নং-১৪২, অথচ পিলু চৌধুরীর জেষ্ঠ্যতার ক্রমিক নং-৫২। নীতিমালা লঙ্ঘন করে উপজেলা শিক্ষা অফিসার পেছনের জুনিয়র শিক্ষকের বদলীর জন্য প্রস্তাব করেন। জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের বদলী প্রস্তাব না করে অপেক্ষাকৃত অনেক জুনিয়র শিক্ষকদের বদলীর প্রস্তাব করছেন উপজেলা শিক্ষা অফিসার।
অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে চাইলে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেও ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ ফেরদৌস ।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. জিল্লুর রহমান বলেন,‘ শাল্লার একজন সহকারি শিক্ষকের লিখিত আবেদন পেয়েছি। জেষ্ঠ্যতা লঙ্ঘন করে কোন জুনিয়র শিক্ষককে বদলী প্রস্তাব করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
প্রসঙ্গত, শাল্লা উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ ফেরদৌসের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ করেছিলেন স্থানীয় শিক্ষকরা। ঘটনার তদন্ত করেছিলেন সহকারি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ সাজ্জাদ ও গকুল দেবনাথ। তদন্তে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছিল। অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে মোহাম্মদ ফেরদৌসকে সুনামগঞ্জ থেকে অন্য জেলায় বদলী ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছিলেন সদ্য বিদায়ী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার পঞ্চানন বালা।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহা পরিচালককে পাঠানো জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তদন্তে ৭টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ ফেরদৌসকে শাল্লা উপজেলা থেকে অন্যত্র বদলী করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. জয়া সেনগুপ্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদও মৌখিকভাবে অনুরোধ করেছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নীতিমালা লঙ্ঘন করে গোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুমিতা রানী দাস রায়কে প্রতিস্থাপক ছাড়া বদলির আদেশ দেন।
আগুয়াই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারি শিক্ষক অঞ্জলী রানী দাস ২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৫ এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৫ মাস বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকলেও ৫ মাসের বেতন-ভাতার ৪২,৬৩৫ টাকা ছাড় দেন। সরকারি এই টাকা ফেরত আনা প্রয়োজন।
২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরের প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য মালামাল ক্রয় বাবদ ৫০ হাজার টাকা এবং আনুষাঙ্গিক খরচ বাবদ ১০ হাজারসহ মোট ৬০ হাজার টাকা প্রতিবন্ধী শিশুদের কোন কিছু না দিয়ে সম্পূর্ণ টাকা আত্মসাৎ করেন।
২০১৮ সালের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন সরবরাহ দিয়ে খরচ বাদে প্রায় ৬৫ হাজার টাকার আয়-ব্যয় সমান দেখানো হলেও কোন ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়েই ব্যয় করা হয় এবং নি¤œমানের কাগজে প্রশ্ন ছাপানো হয়। ছাপা খরচ অধিক দেখানো হয়।
২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে ডি.পি.এডে সুনামগঞ্জ পিটিআইয়ে উপজেলার ১২জন শিক্ষকের নামে ডেপুটেশন প্রদানে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে জুনিয়র শিক্ষকদের ডেপুটেশন প্রদান করা হয়।
এছাড়াও তদন্ত রিপোর্টের বিবিধে উল্লেখ করা হয়, বদলী, পেনশন, জিপিএফ লোনসহ বিভিন্ন বিষয়ের অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা শিক্ষা অফিসার অস্বীকার করলেও শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তুষ্টি রয়েছে।
প্রসঙ্গত, মোহাম্মদ ফেরদৌস জেলার তাহিরপুর উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তা ছিলেন। নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে তাঁকে গত বছরের ৪ জুলাই তাহিরপুর থেকে জেলার জগন্নাথপুর উপজেলায় বদলি করা হয়। কিন্তু জগন্নাথপুর উপজেলার শিক্ষকরা তাঁবে সেখানে যোগদান করতে বাধা দেন। এরপর একই জেলার শাল্লায় তাঁকে বদলী করা হয়।