শাল্লায় উন্নয়ন কাজে হাওর চুরি

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দুইটি বড় ধরনের বিচ্যুতি নিয়ে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে দুইটি পৃথক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। দুই ঘটনাই জেলার শাল্লা উপজেলার। শাল্লা উপজেলাটি দুর্গম হওয়ার কারণে কিনা এখানে উন্নয়ন কর্মকাÐের তদারকি দুর্বল হয়, ফলত কাজে নানা ধরনের বিচ্যুতি থেকে যায়, এটি ভাববার বিষয় বটে। প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে দাড়াইন নদীর ২০ কিলোমিটার নদী খনন কাজ নামমাত্র করে কিংবা না করেই ঠিকাদার ৫০ কোটি টাকার বিল তুলে নিয়েছেন। যে নদী খনন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয় সেখানে এখনও নৌকা আটকে পড়ে, নদীর কোনো কোনো জায়গা দিয়ে পায়ে হেঁটে পারাপার করা যায়। সঠিক খনন হলে নাব্যতা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। পাউবো’র দায়িত্বশীলরা দায়িত্ব এড়াতে বলছেন, ‘দেখতে হবে নদী ভরাট হয়েছে কিনা’। কী নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি! যেখানে ভরাট নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতেই খনন কাজ সেখানে কাজ শেষ করার অব্যবহিত পরপরই নদী ভরাট হয়ে পড়ার এক অবাস্তব ও অবান্তর অজুহাত দাঁড় করিয়েছেন পাউবো প্রকৌশলী। দায়িত্ব এড়ানোর এমন অবিবেচক বক্তব্য আমাদের মর্মাহত করেছে। পাঠক, ভেবে দেখুনÑ টাকার অংক যেখানে ৫০ কোটি সেখানে এই ধরনের দুর্নীতিকে হাওর চুরি বললে অত্যুক্তি হবে কি?
অন্য সংবাদটি আরও চমকপ্রদ তবে টাকার সংশ্লেষ এখানে অনেক কম। শাল্লা উপজেলা গণমিলনায়তনটি নির্মাণ করা হয় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে। প্রকৌশল ডিজাইন অনুসারে এই ভবনের স্থায়িত্বকাল ১০০ বছর নির্ধারিত ছিল। গণমিলনায়তনটি নির্মাণ শেষ হয় ২০১৭ সনে। কাজ শেষ হওয়ার পর দুই বছর কেটেছে মাত্র। এরই মাঝে ভবনটি দেবে যাওয়া শুরু করেছে। সংবাদের সাথে প্রতিবেদনে প্রকাশিত দুইটি ছবির একটিতে দেখা যাচ্ছে ভবনের বারান্দার পিলারগুলো মেঝে থেকে কয়েক ফুট উপরে ঝুলে আছে। আরেকটি ছবিতে দেয়ালের ফাটলগুলো স্পষ্ট হয়ে আছে। মিলনায়তনের মঞ্চটিও দেবে গেছে। এখানে কোনো অনুষ্ঠান করতে রীতিমত ভয় পান আয়োজকরা। এখানেও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীন বক্তব্য পাওয়া গেছে। শাল্লার উপজেলা প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা দিরাই উপজেলার উপজেলা প্রকৌশলী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভবন দেবে যাওয়ার বিষয়টি নাকি তাকে কেউ জানাননি। কী আশ্চর্য নির্লিপ্ততা এখানেও। এই এক জায়গায় পাউবো ও এলজিইডি কর্তৃপক্ষের মনোভাব এক জায়গায় এসে মিলিত হয়ে গেছে। দুইজনই নির্মাণ কাজে কথিত দুর্নীতির বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে দুর্নীতিবাজদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করেছেন। সরকারি কাজের মান বজায় রাখার দায়িত্ব যাদের উপর ন্যস্ত তারা কেন কাজের অনিয়ম নিয়ে মুখ খুলতে চান না? কারণটি সকলের জানা। কারণ সকলেই কথিত দুর্নীতির ভাগীদার। এক হাতে যেমন তালি বাজে না তেমনি ঠিকাদার একা দুর্নীতি করতে পারে না। ঠিকাদার-কর্মকর্তাদের হরিহর আত্মা হয়ে মিশে যাওয়া ছাড়া দুর্নীতি সংঘটন কখনও সম্ভব নয়।
সরকার এখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। কিছু দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণের খবরও পাওয়া যায়। কিন্তু দেশে দুর্নীতির বিস্তার যে ভয়ানক অবস্থায় দাঁড়িয়েছে সেখানে মামুলি এইসব ব্যবস্থা পরিস্থিতির বিন্দুমাত্র গুণ বা পরিমাণগত পরিবর্তন ঘটাতে পারছে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দরকার দীর্ঘমেয়াদী সংগ্রাম। সেই ধরনের ইচ্ছার কোনো বহিঃপ্রকাশও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। আর এই সুযোগেই অভ্যাসগ্রস্ত দুর্নীতিবাজরা কখনও নিজেদের সংশোধন করার জায়গায় নিয়ে যেতে চাচ্ছেন না।
শাল্লার নদী খনন ও গণমিলনায়তনের কাজে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগটি খতিয়ে দেখতে আমরা দুদকের প্রতি আহŸান জানাই। এলাকা কিংবা জনগণের উন্নয়নের নামে আসা সরকারি বরাদ্দ যদি ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের স্বার্থ হাসিলে ব্যবহৃত হতে থাকে তাহলে আমরা কখনও একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন পূরণ করতে পারব না।