শাল্লায় দুর্যোগ সহনীয় ঘর বরাদ্দ অভিযোগমুক্ত হোক

‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায়/ আছে যার ভুরি ভুরি/ রাজার হস্ত করে সমস্ত/ কাঙালের ধন চুরি’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার এই লাইনের বাস্তবতা যেমন সেকালে ছিল একালেও রয়েছে একেবারে বহাল তবিয়তে। এর মাঝে জাতির রাষ্ট্র দর্শন হয়েছে তিন তিনটির। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মানুষ অহিংস-সহিংস প্রতিবাদ করেছে, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে রক্ষক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রাম শেষে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে। কিন্তু ন্যায় ও সমতাভিত্তিক সমাজ কায়েমের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে। তাই প্রতি পদে পদে কাঙালরা বঞ্চিত হয় ন্যায্য অধিকার থেকে। তাদের নামে আসা বরাদ্দ চলে যায় সম্পন্নদের হাতে। কিন্তু থেমে নেই সেই অনাদি আকাক্সক্ষা, যেখানে সর্বাবস্থায় ন্যায়নিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠার আকুলতা ফুটে উঠে। এই আকাক্সক্ষা আছে বলেই সমাজে যেমন অধিকার কেড়ে নেয়ার কুৎসিত বাস্তবতা রয়েছে তেমনি রয়েছে এইসব অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্ফুরণ। প্রতিবাদ আছে বলেই সর্বাংশে না হোক, খন্ডিত হলেও অধিকার হারাদের কথা উঠে আসে সংবাদ মাধ্যমে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে সেরকমই এক খবর প্রকাশিত হয়েছে।
সরকার বাসগৃহ নির্মাণের মত জমি আছে কিন্তু ঘর বানানোর সামর্থ্য নেই এমন অস্বচ্ছল ব্যক্তিদের জন্য দুর্যোগ সহনীয় ঘর নির্মাণের একটি গণমুখী প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। জেলার শাল্লা উপজেলায় এই দফায় ৩০টি এরকম ঘরের বরাদ্দ আসে, প্রতিটি ঘর তিন লাখ টাকা ব্যয়ে সরকার নির্মাণ করে দিবে। ৩০টি ঘরের উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে এবারও। অর্থাৎ আগের দফায়ও এরকম অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু সেই দফায় উঠা অভিযোগকে থুরাই কেয়ার করা হয়েছে। এবারও সেরকমই অবস্থা। ৩০ উপকারভোগীর মধ্যে ১০ জনই নাকি অপেক্ষাকৃত ধনি। শাল্লা উপজেলার ভোটে নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানও এই অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা দৃঢ়কণ্ঠে উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রকৃত ভূমিহীনরাই ঘর পেয়েছেন’। এই ধরনের পরস্পরবিরোধী অবস্থানে প্রকৃত সত্যটি সম্ভবত কখনও আলো দেখবে না। আগের মতই শাল্লা উপজেলায় আবারও অধিকার বঞ্চিত হবেন কিছু গরিব মানুষ।
উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। নীতিমালা অনুসরণ ও সকল শর্ত পূরণ করে একটি এলাকায় সমযোগ্যতাসম্পন্ন অনেক উপকারভোগী পাওয়া যাবে। কারণ আমাদের গ্রামীণ জনপদের আর্থ-সামাজিক কাঠামোটিই এমন। এখানে দরিদ্র লোকের সংখ্যা বেশি। কিন্তু হাতে যখন বরাদ্দ কম তখন শর্ত পূরণ করাদের মধ্য থেকে অধিকতর অস্বচ্ছল ব্যক্তিদের বাছাই করাই হল সবচাইতে ন্যায়ানুগ ও আদর্শ পদ্ধতি। শাল্লা উপজেলায় নিশ্চয়ই এই আদর্শ পদ্ধতি অনুসৃত হয়নি। অনুসৃত হয়নি বলেই ব্যাপকভাবে অভিযোগ উঠেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে এই বিষয়টি খতিয়ে দেখা। নতুবা সরকারের জনহিতকর প্রকল্পগুলো সম্পর্কে জনমনে ভুল বার্তা পৌঁছাবে।
২০২০ সনের ১৭ মার্চ থেকে জাতি মুজিববর্ষ পালন করা শুরু করবে। সরকার ঘোষণা করেছেন মুজিববর্ষ নিছক আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব হবে না। পুরো বছর জুরে জনগণের জন্য কল্যাণধর্মী কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। মহান বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনা সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিয়ে একটি আলোকিত বাংলাদেশ গঠনই মুজিববর্ষ উদযাপনের মূল উদ্দেশ্য। এই বছরে কোথাও কোনো অনিয়ম কিংবা ন্যায় থেকে বিচ্ছুতি ঘটুক তা কারও কাম্য নয়। সকলেই চাইবেন, এরকম একটি স্পর্শকাতর বছরে শাল্লা উপজেলায় দুর্যোগ সহনীয় ঘর প্রাপ্তির উপকারভোগী নির্বাচনের কাজটি সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকুক। এই আকাক্সক্ষা থেকেই শাল্লায় উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো বিচ্যুতি ঘটেছে কিনা তা যাচাই করার জন্য আমরা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।