‘শাহ্ আব্দুল করিমের বাড়িতে হামলাকারীরাই রণেশ ঠাকুরের বাউল আসর পুড়িয়েছে’

বিশেষ প্রতিনিধি
বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিমের শিষ্য বাউল রণেশ ঠাকুরের উজান ধলের বাড়ির বাউল আসর ঘরে কারা আগুন দিয়েছে এই বিয়টিই মঙ্গলবার দিনভর ছিল উজানধলের বাউল সমাজ ও সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয়। উজান ধলের বাউলগণ এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মনে করছেন, এর আগে যারা শাহ্ আব্দুল করিমের বাড়িতে হামলা করেছিল, তারাই এই ঘটনা ঘটাতে পারে। এরা চায় না এই এলাকায় বাউলদের আসর থাকুক।

উজানধলের একাধিক মানুষের সঙ্গে মঙ্গলবার কথা বলে জানা যায়, গ্রামের একটি অংশ যারা এর আগে শাহ্ আব্দুল করিমের বাড়িতে হামলার নেপথ্যে ছিল এরাই রণেশ ঠাকুরের বাউল আসর ঘর জ¦ালানোর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।

গ্রামের প্রতিবাদী তরুণ দোলন চৌধুরী জানালেন, শাহ্ আব্দুল করিমের শিষ্য বাউল রণেশ ঠাকুর এবং প্রয়াত রুহী ঠাকুরের বাবার প্রচুর জমি-জমা ছিল। তাদের বাড়ি’র সামনের কিছু জায়গা নিয়ে গ্রামের কালাম মিয়ার সঙ্গে রণেশ ঠাকুরের বিরোধ রয়েছে। বিরোধীয় জমিতে গ্রামের ইউপি সদস্য কালাম মিয়াসহ কিছু লোকজন ইতিপূর্বে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই নিয়ে গ্রামবাসীর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়।

গ্রামের অনেকে দাবি করছেন, একদিকে রণেশ ঠাকুরের বাউল আসর ঘর। আরেক দিকে শাহ্ আব্দুল করিম সঙ্গিতালয়সহ আব্দুল করিমের বাড়ি, আরেকদিকে মেস্ত্রীদের হাটি। ওখানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান না করলেই ভাল হয়। অন্য কোন স্থানে সকলের মতামতের ভিত্তিতে করার প্রস্তাব দেন গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ। কিন্তু গ্রামের একটি পক্ষ ওখানেই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করতে চাচ্ছে। এই নিয়ে মতপার্থক্য দীর্ঘদিন ধরেই চলছে।

শাহ্ আব্দুল করিম পরিষদ’এর দিরাই উপজেলা শাখার সভাপতি আপেল মাহমুদ জানালেন, ২০১০ সালে শাহ্ আব্দুল করিমের বাড়িতে গানের আসরে এসে কিছু মানুষ বাধা দেয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন। যারা গানের আসরে বাধা দিয়েছিল, এদের একজন এসে ভ- সই দিয়ে বলে যায়, তারা আর গানের আসরে বাধা দেবে না। পরে আপোসে বিষয়টি নিস্পত্তি হয়।

কালাম মিয়ার আত্মীয় গ্রামের ইউপি সদস্য লাল মিয়ার দাবি জায়গা জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেনি। এর আগে শাহ্ আব্দুল করিমের বাড়িতে হামলার ঘটনাটিও অতি রঞ্জিত ছিলো। এই নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছিল। পনে আপোসে নিস্পত্তি হয় এই মামলা। ভ- সই দেওয়ার কথাও সত্য নয়।

স্থানীয় তাড়ল ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কদ্দুছও মনে করেন যারা শাহ্ আব্দুল করিমের বাড়িতে হামলা করেছিল, তারা কোন না কোন ভাবে এই ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। ২০১৩ সালে ধল বাজারে প্রয়াত সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত আসলে রণেশ ঠাকুর বাড়ি’র সামনের জমি বিরোধের বিষয়টি জানিয়ে ছিলেন। সকলের সামনেই ওইদিন সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বলে দেন, এই জায়গা রণেশ ঠাকুরের বাবা রবি ঠাকুরেরই। রণেশ ঠাকুরকে জায়গা দখলে রাখার কথাও বলে দেন।

এদিকে, মঙ্গলবার দুপুরে সহকারী পুলিশ সুপার বেলায়েৎ হোসেন ও দিরাই থানার ওসি কেএম নজরুল ইসলাম উজানধলে গিয়ে এই বিষয়ে গ্রামের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছেন।

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেছেন, এই ঘটনা পুলিশ নিবিরভাবে তদন্ত করছে।

উল্লেখ্য, রোববার গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা জ¦ালিয়ে দেয় শাহ্ আব্দুল করিমের শিষ্য বাউল রণেশ ঠাকুরের বাউল আসর ঘর। এই ঘটনায় ৫৫ বছর বয়সি এই বাউল ও তার শিষ্য সামন্তের সকল বাদ্য যন্ত্রই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। গ্রামের বাসিন্দারা জানান, উজান ধলের রবনী মোহন চক্রবর্তী কীর্ত্তনীয়া ছিলেন। তার ছেলে রুহী ঠাকুর ও রণেশ ঠাকুর বাউল স¤্রাট শাহ্ আব্দুল করিমের অন্যতম শিষ্য বাউল। ওস্তাদ শাহ্ আব্দুল করিম ও বড় ভাই রুহী ঠাকুর মারা যাবার পর ভাটী অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে যে কজন বাউল জনপ্রিয়, এরমধ্যে অন্যতম রণেশ ঠাকুর। বাউল স¤্রাট শাহ্ আব্দুল করিমের বাড়ি’র লাগোয়া রণেশ ঠাকুরের বাড়িতে করোনা কালের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই বাউল আসর বসতো। রণেশ ঠাকুরের বসত ঘরের উল্টোদিকে তার বাউল আসর ঘর। ওখানেই তার নিজের ও শিষ্যগণের যন্ত্রপাতি থাকতো। রোববার রাত ১১ টায় পরিবারের সকলে ঘুমোতে যান। রাত ১ টার পর রণেশ ঠাকুরের বড় ভাইয়ের স্ত্রী সকলকে চিৎকার করে ডাকতে থাকেন। অন্যরা ঘুম থেকে ওঠে দেখেন আসর ঘর পুড়ে যাচ্ছে। পরে আশপাশের লোকজন চেষ্টা করে আগুন নেভালেও পুরো ঘরই পুড়ে ছাই হয়ে যায়।