শিক্ষক নিয়োগে নারী-পুরুষ যোগ্যতার সমতা বিধান বনাম আমাদের শিক্ষা দর্শন

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে এবার নারী-পুরুষ প্রার্থীদের যোগ্যতার ক্ষেত্রে সমতা আনয়ন করে শিক্ষাগত যোগ্যতা সকলের ক্ষেত্রে ¯œাতক মান নির্ধারণ করা হলো। জারিকৃত প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা’২০১৯ এ এমন বিধান রাখা হয়েছে। এতদিন নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি পাস নির্ধারিত ছিল। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান নারী কোটায় কোন পরিবর্তন আনা হয়নি। সরাসরি নিয়োগযোগ্য পদের ৬০% নারী প্রার্থীদের দ্বারা পূরণ করার বিদ্যমান নিয়ম কার্যকর থাকছে। আমরা মনে করি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালায় নারী ও পুরুষ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে একই মানের যোগ্যতা নির্ধারণ করায় নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মান নিয়ে ভবিষ্যতে আর কোন প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ থাকবে না। দেশের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা বিদ্যমান। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনের ভিত্টি রচিত হয় তাঁদের হাত ধরেই। তাই এখানে মানসম্পন্ন ও যোগ্য শিক্ষকের প্রয়োজন সর্বাধিক। এখন দেশে উচ্চ শিক্ষার প্রসার বহুলাংশে বেড়েছে। নারীরা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষদের ডিঙিয়ে সামনে চলে এসেছে। সুতরাং নারী প্রার্থীদের জায়গায় পর্যাপ্ত ¯œাতক মানসম্পন্ন প্রার্থীর অভাব ঘটবে না। আর যেহেতু বিদ্যমান নারী কোটা বহাল থাকছে তাই নারী প্রার্থীদের অগ্রাধিকার পাওয়ার বিষয়টিও ক্ষুণœ হচ্ছে না। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর স্বার্থে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই।
এই প্রসঙ্গে ফেসবুক সহ বিভিন্ন মাধ্যমে কিছু বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ ও মতামত আমাদের দৃষ্টি কেড়েছে। অনেকেই বলছেন এইচএসসি বা ১৮ বছরের শিক্ষা সমাপনের পর সরকারের পক্ষ থেকে আর কাউকে শিক্ষা দান করার প্রয়োজন নেই। এইচএসসি পাস করার পর সবাই যার যার কর্মক্ষেত্র পছন্দ করে ফেলবেন এবং তাদেরকে সেভাবে সংশ্লিষ্ট পেশাগত শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করবে সরকার। এক্ষেত্রে তাঁরা সেনাবাহিনির কমিশন্ড পদে এইচএসসি পাস করার পর নিয়োগের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেছেন, এখানে নিয়োগপ্রাপ্তদের পরবর্তীতে সমরবিদ্যাকে প্রাধান্য দিয়ে ইন-সার্ভিস ¯œাতক বা তদুর্ধ পর্যায়ের শিক্ষা দান করা হয়। শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও বিশেষায়িত শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। তাঁরা ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন বা ব্যাচেলর ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করতে পারেন। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো, এইচএসসি পাস করার পরই শিক্ষক পদে প্রার্থী বাছাইর কাজ শেষ করে তাদেরকে প্রয়োজন মাফিক বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণের জন্য পাঠানো। বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ এবং সেখানে সন্তোষজনক ফলাফলের ভিত্তিতে তাদের চাকুরি স্থায়ী করণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। এরকম হলে ¯œাতক বা এর চাইতে বেশি শিক্ষা দানে সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ যেমন কমে আসবে তেমনি চাকুরি প্রাপ্তদের বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। সরকার বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন। পৃথিবীর বহু দেশেই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮ বছর পর্যন্ত অর্থাৎ এইচএসসি পর্যন্ত শিক্ষা দান করা হয়ে থাকে। এই পর্যায়ে অতি মেধাবীদের রাষ্ট্রই উচ্চতর শিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়ে যাবে। সকলেরই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজন নেই।
শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের রাষ্ট্রের মূল দর্শন কী সেটি স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর আজও স্পষ্ট করা সম্ভব হয়নি। আমাদের দেশে নানান ধারার এক জগাখিচুরি মার্কা শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এখানে যেমন মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীর শিক্ষা গ্রহণের নিশ্চয়তা দেয়া যাচ্ছে না তেমনি এখানে ¯œাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্তও প্রায় বিনা পয়সায় শিক্ষা দান করা হয়ে থাকে। আমরা মনে করি এইচএসসি পর্যায়ের পরবর্তী শিক্ষা গ্রহণের ধাপগুলোকে নিয়ন্ত্রিত করা হোক। এতে প্রকৃত মেধাবীরাই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে।