শিক্ষক পদে চলতি দায়িত্বে পদায়নে অনিয়ম- তাহিরপুরে অর্থ বাণিজ্য

বিন্দু তালুকদার
সুনামগঞ্জে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে চলতি দায়িত্বে পদায়নে যারা চাহিদামত টাকা দিয়েছেন তারাই সুবিধাজনক পদায়ন পেয়েছেন। যারা কোন যোগাযোগ করেননি তাদের কে দুর্গম অঞ্চলে পদায়ন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইন বা নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি।
মানা হয়নি জ্যেষ্ঠতা, নারীদের দিকও বিবেচনা নেওয়া হয়নি। তাহিরপুর উপজেলার প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষক (চলতি দায়িত্ব) পদায়ন নিয়ে গত কয়েকদিন শিক্ষকদের সাথে কথা বলে ও অনুসন্ধান করে এমন তথ্য পাওয়া যায়।
তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরী ইউনিয়নের বালিজুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোছা. ফেরদৌসী খাতুন জ্যেষ্ঠতায় উপজেলায় দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন। একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এনামুল হক আছেন জ্যেষ্ঠতায় ৪৫তম স্থানে। দু’জনই বালিজুরী গ্রামের বাসিন্দা এবং পদায়নের ক্ষেত্রে প্রথম পছন্দ বালিজুরী নয়াহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু এই বিদ্যালয়টিতে পদায়ন জুটেছে এনামুল হকের ভাগ্যে। আর ফেরদৌসী খাতুনের পদায়ন হয়েছে তার বাড়ি ও বর্তমান কর্মস্থল থেকে প্রায় পঁিচশ কিলোমিটার দূরবর্তী উত্তর বড়দল ইউনিয়নের আমতৈল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
হাওর নদী পাড়ি
দিয়ে প্রতিদিন এই বিদ্যালয়ে যাতায়াত করা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। একই ইউনিয়ন ও একই গ্রামের বাসিন্দা বড়খলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জোহরা বেগম জ্যেষ্ঠতায় আছেন ত্রিশতম স্থানে। এছাড়াও ইউনিয়নের একাধিক জ্যেষ্ঠ নারী ও পুরুষ শিক্ষকের বাড়ি বালিজুরী ইউনিয়নের বালিজুরী গ্রামে। সবারই প্রথম পছন্দ ছিল বালিজুরী নয়াহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পদায়ন নেওয়া। পার্শ্ববর্তী তাহিরপুর সদর ইউনিয়নে কোন পদ শূন্য না থাকায় সেসব ইউনিয়নের একাধিক নারী ও পুরুষ শিক্ষকদের প্রথম পছন্দ ছিল এ বিদ্যালয়টি।
একাধিক শিক্ষকদের বক্তব্য, জেলা শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের কারণেই নিয়ম লঙ্ঘন করে পদায়ন জুটেছে এনামুল হকের। একইভাবে শিক্ষিকা জোহরা বেগমকে দেওয়া হয়েছে নিজ বাড়ি ও কর্মস্থল থেকে ১০ কিলোমিটার দূরবর্তী বাদাঘাট ইউনিয়নের লোহাজুরী ছড়ারপার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
বালিজুরী ইউনিয়নের বাসিন্দা আনোয়ারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জ্যেষ্ঠতার তালিকার ৩৪ নম্বরে থাকা আছমিনা বেগমকে দেওয়া হয়েছে উত্তর বড়দল ইউনিয়নের পুরানঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। নিজ বাড়ি ও বিদ্যালয় থেকে নতুন পদায়নকৃত পুরানঘাট বিদ্যালয়টি ত্রিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। যাতায়াত দুর্গম। এ বিদ্যালয়ে যেতে হাওর নদী পারি দিতে হবে। তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের মোছা. রোখসানা আক্তার চৌধুরীকে নিজ বাড়ি ও কর্মস্থল থেকে পদায়ন দেওয়া হয়েছে ৩০ কিলোমিটার দূরবর্তী উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের ভারত সীমান্তবর্তী বড়ছড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একইভাবে বাদাঘাট ইউনিয়নের হুমায়ুন আজাদ, নজরুল ইসলাম শিকদার, লুৎফুল করিম, বাবুল হোসেন, আব্দুল হক কে দেওয়া হয়েছে নিজ বিদ্যালয় ও বাসস্থান থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরবর্তী সবচেয়ে দুর্গম হাওরবেষ্টিত বিদ্যালয় যথাক্রমে মাটিয়ান, মনভোজ, দুমাল, মন্দিয়াতা ও মানিক খিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বালিজুরী ইউনিয়নের বড়খলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মনজু রঞ্জন তালুকদার ও ইউসুফ আলী কে দেওয়া হয়েছে নিজ বাড়ি থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরবর্তী যথাক্রমে গোলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ও বিন্দারবন্দ বিদ্যালয়ে।
গত ২৪ জুন জেলা শিক্ষা অফিসার পঞ্চানন বালা কর্তৃক পদায়নের এ অফিস আদেশটি প্রকাশিত হয় ২৫ জুন।
যোগাযোগ না করার কারণে দুর্গম অঞ্চলে পদায়ন পাওয়া শিক্ষকরা পরে ডিপিও’র সাথে যোগাযোগ করেই গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পূর্বের পদায়ন আদেশ সংশোধন করিয়ে সুবিধাজনক জায়গায় বদলী আড়েশ করিয়েছেন। শিক্ষকরা জানান, মন্দের ভাল হিসাবে অফিসকে খুশি করেই তারা নতুন করে শূন্য বিদ্যালয়ে পদায়নের আদেশ করিয়েছেন। তবে অধিকাংশ শিক্ষকই এ সুযোগ পান নি।
তাহিরপুর উপজেলার আমতৈল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদে চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা মোছা. ফেরদৌসী খাতুন বলেন,‘ জ্যেষ্ঠতার তালিকা অনুযায়ী আমি দ্বিতীয়, কিন্তু আমাকে পদায়ন দেয়া হয়নি। এভাবে আমাকে পদায়ন করা হবে আশা করিনি। তালিকা অনুযায়ী জুনিয়রকে এলাকায় পদায়ন করা হয়েছে। দূরে পদায়ন করায় আমি চরম দুর্ভোগে পড়েছি।’
শিক্ষিকা মোছা. ফেরদৌসী খাতুনের স্বামী সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ল্যান্স কর্পোরাল সাইফুল ইসলাম বলেন,‘নিয়ম লঙ্গণ করে আমার স্ত্রীকে যেস্থানে পদায়ন করা হয়েছে এতে আমরা মর্মাহত ও হতাশা হয়েছি। বাড়ির কাছে বিদ্যালয় থাকার পরও ২০ কিলোমিটার দূরে পদায়ন করা হয়েছে। সকাল ৮টায় ঘর থেকে বের হলেও কয়েক প্রকার যানবাহন দিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছতে হয়। সময়মত বিদ্যালয়ে পৌঁছতে হলে ভোরে ঘর থেকে বের হতে হবে। এভাবে অনিয়ম করা হবে তা কল্পনাও করিনি। প্রতিকারের জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। ’
এ ব্যাপারে বালিজুরী নয়াহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এনামুল হকের সাথে কথা বলতে চাইলে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেও ফোন রিসিভি করেননি তিনি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পঞ্চানন বালা পদায়নের বিষয়ে তাঁর বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন,‘ আইন অনুযায়ী যতটুকু সম্ভব স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে কাজ করেছি আমরা। সবাইকে তো বিদ্যালয়ের কাছে পদায়ন করা সম্ভব নয়। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে শিক্ষকদের পদায়ন করা হয়েছে। কারণ আমার একার দ্বারা জেলার ৫০৩ জন শিক্ষককে চেনা বা জানা কোনভাবেই সম্ভব না। প্রভাবিত হয়ে বা স্বার্থ আদায় করে কোন কাজ করা হয়নি। আর্থিক সুবিধা নিয়েছি এমন কোন ঘটনা কেউ প্রমাণ করতে পারবেন না। কেউ যদি অনেক দূরে পড়ে যান এবং বিষয়টি লিখিতভাবে উপজেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে জানান খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। ’